Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬

আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধের ‘সদর দপ্তর’ থেকে মুক্ত ৫৪০ ভারতীয় বন্দি

আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধের ‘সদর দপ্তর’ থেকে মুক্ত ৫৪০ ভারতীয় বন্দি
  • ১২ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: মায়ানমার ও থাইল্যান্ডের একেবারে সীমান্ত। একই ধাঁচে তৈরি দুই শহর। থাউং ইন নদীর পারে শোয়ে-কোককো এবং  লাউকায়িং। ঝাঁ চকচকে। বিলাসবহুল অফিস, গগনচুম্বী বহুতল, তার মধ্যেই সুইমিং পুল, জিম, ক্যাসিনো, পানশালা, মাল্টিপ্লেক্স। সেখানেই মোটা চাকরির বিজ্ঞাপন ভাইরাল সোশ্যাল মিডিয়ায়। ডলারে মোটা আয়ের শর্ত একটাই, দ্রুত থাইল্যান্ড হয়ে পৌঁছতে হবে মায়ামারে। প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে সেখানে গেলেই ব্যস! টেক স্যাবি শিক্ষিত বেকার যুবক, যুবতী পরিণত হবেন ‘বন্ডেড লেবারে’। ১৬-১৮ ঘণ্টা ঠায় বসে থাকতে হবে কম্পিউটারের সামনে। কাজ একটাই। সাবলম্বী ভাষায় বিশ্বজুড়ে মানুষের সঙ্গে অনলাইন প্রতারণা। ডিজিটাল অ্যারেস্ট, ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগ, রোম্যান্স চ্যাট, অনলাইন লটারি, সেক্সটরশন সহ আরও অনেক কিছু। সবই চলছে রমরমিয়ে। যুক্ত খোদ মায়ানমারের জুন্টা সরকার। অনলাইন অপরাধের সেই আঁতুড়ঘর থেকে সোমবার ও মঙ্গলবার দু’ফায় ৫৪০ জন দেশবাসীকে উদ্ধার করল ভারত সরকারের বিদেশ মন্ত্রক। ভারতীয় বায়ুসেনার সি-১৭ বিমানে চাপিয়ে উত্তর থাইল্যান্ডের মায় সট বিমানবন্দর থেকে তাদের দিল্লি উড়িয়ে আনা হয়েছে। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে রয়েছে এ রাজ্যের বাসিন্দারাও। সাইবার অপরাধের এহেন চক্রে মোটা বেতনের চাকরির ফাঁদে পা না দেওয়ার জন্য এদিনই সতর্কবার্তা জারি করেছে ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক। ইতিমধ্যেই সতর্কতা জারি করেছেন ইয়াঙ্গনের ভারতীয় দূতাবাসও। 

Advertisement

বছর দশেক ধরে এদেশে দেদার বেড়েছে সাইবার অপরাধ। ফ্রডস্টারদের   নিত্য নতুন ফন্দিতে ‘কাহিল’ প্রতারিতরা। এই মুহূর্তে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ ও এটিএম প্রতারণা ট্রেন্ডিং। বিশ্বজুড়ে সেই সমস্ত প্রতারণা চলছে থাইল্যান্ড-মায়ানমার সীমান্তের দুর্গম মায়াওডি জেলা থেকে। কীভাবে প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কমবয়সি যুবক, যুবতীদের? বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, চেন্নাই, নয়ডা, গুরুগ্রামের কিছু ভারতীয় ‘এজেন্ট’এর মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি সেক্টরে মোটা চাকরির বিজ্ঞাপনে সাড়া দিলেই, থাইল্যান্ড হয়ে সোজা মায়ানমারের শোয়ে-কোককো এবং লাউকায়িং শহরে। থাইল্যান্ড-মায়ানমার সীমান্তের দুর্গম জায়গায় অবস্থিত এই শহরগুলির কোনও অস্তিত্বই ছিল না বছর দশেক আগে। ২০১৭ সাল থেকে শুধুমাত্র সাইবার প্রতারণার ‘হেডকোয়ার্টার’ তৈরির জন্য এই শহর গড়তে শুরু করে চাইনিজ মাফিয়া সি ঝিজিয়াং। ২০২২ সাল থেকেই থাইল্যান্ডের জেলবন্দি সে। কিন্তু, প্রভাবশালী মাফিয়া হওয়ার জেরে মায়ানমারের জুন্টা সরকারের যোগসাজশ করে এই ‘ক্রাইম-সিটি’ গড়ে তোলে সি ঝিজিয়াং। বদলে প্রতিবছর মায়ানমারের জুন্টা সরকারের কাছে যেত প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার। ২০১৮ সাল থেকে তাঁর সঙ্গী হয় আরেক চাইনিজ মাফিয়া মিন আউং হালাইং। শোয়ে-কোক-কো শহরের আরও উত্তরে মায়ানমারের দ্বিতীয় ‘ক্রাইম সিটি’, লাউকাইং শহরের দায়িত্ব নেয় মিন আউং। 
একাধিক দেশের অভিযোগের ভিত্তিতে ‘বন্দিদশা’ থেকে যুবক, যুবতীদের মুক্ত করার জন্য সম্প্রতি বৈঠকে বসে ভারত ও মায়ানমারের বিদেশমন্ত্রক এবং মায়ানমার ও থাইল্যান্ডের ভারতীয় দূতাবাসের কর্তারা। এরপরেই সেখান উদ্ধারকার্যে নামে ‘ডেমোক্রেটিক কারেন বেনেভলেন্ট আর্মি’। বিদেশমন্ত্রক সূত্রে খবর, বিশেষ অপারেশনে সোমবার ২৮৩ জন ভারতীয় নাগরিক উদ্ধার করা হয়েছে। তার মধ্যে ২৬৬ জন পুরুষ ও ১৭ জন মহিলা। পশ্চিমবঙ্গ, অন্ধ্রপ্রদেশ, গুজরাত, পাঞ্জাব, তেলেঙ্গানা, উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা বন্দি ছিলেন মায়ানমারে। বাংলা থেকেই রয়েছেন ২০ জন। মঙ্গলবার রাতে মায়ানমারের মায়ে সট বিমানবন্দর থেকে আরও ২৫৭ জন দেশবাসীকে উদ্ধার করা হয়।  সূত্রের খবর, সাইবার অপরাধ জগতের এই আঁতুড়ঘরে এখনও আটকে নানা দেশের কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষ।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ