সুবর্ণরেখার তীরে ৫০০ বছরের দুর্গাপুজো, লক্ষ্মণনাথ রাজগড়ে বাংলা-ওড়িশার মেলবন্ধন
  • ১০ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সৌম্য কান্তি ত্রিপাঠী: এক দিকে সুবর্ণরেখার শান্ত স্রোত, অন্য দিকে শতাব্দীপ্রাচীন মন্দির ও রাজবাড়ির স্থাপত্য। বাংলা-ওড়িশা সীমান্তের লক্ষ্মণনাথে দাঁড়ালেই যেন ইতিহাসের গন্ধ পাওয়া যায়। এই জনপদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এখানকার পাঁচশো বছরের পুরনো দুর্গাপুজো। জমিদারি প্রথা আজ বিলুপ্ত হলেও, লক্ষ্মণনাথ রাজগড়ের দুর্গামণ্ডপে আজও নিয়ম করে বেজে ওঠে পুজোর ঢাক।

Advertisement

এই পুজোর শিকড় লুকিয়ে আছে বহু শতকের পুরনো ইতিহাসে। জানা যায়, মুঘল সম্রাট হোসেন শাহের আমলে ১৫০৮ খ্রিস্টাব্দে জলেশ্বরের সদর কানুনগোর দায়িত্ব পান রামচন্দ্র ঘোষ। তাঁর হাত ধরেই জলেশ্বরে প্রথম দুর্গাপুজো শুরু হয়। কথিত আছে, নীলাচল যাওয়ার পথে তাঁর আমন্ত্রণে জলেশ্বরে অবস্থান করেছিলেন স্বয়ং শ্রীচৈতন্যদেব। পরবর্তীকালে এই পরিবারেরই উত্তরসূরি লক্ষ্মীনারায়ণ রায় মহাশয় ১৭২০ খ্রিস্টাব্দের আগে লক্ষ্মণনাথে দু’একর জমির উপর গড়ে তোলেন সুবিশাল 'মহাশয়গড়'। রাজবাড়ির ভিতরে থাকা কুলদেবী শ্যামাসুন্দরীর মন্দির ও সুবিশাল দুর্গামণ্ডপেই বংশপরম্পরায় পূজিতা হয়ে আসছেন দেবী দশভুজা। বাইরে রয়েছে সারিবদ্ধ আটটি শিব মন্দির ও অন্নপূর্ণা মন্দির।
এক সময় নবমীতে মহিষ বলির প্রচলন থাকলেও কালের নিয়মে তা বর্তমানে বন্ধ। ঠাকুর দালানে রয়েছে নির্দিষ্ট ব্যালকনি, যেখান থেকে একসময় অন্দরমহলের মহিলারা পুজো দেখতেন। বিশাল আকারের দেবীপ্রতিমা নিরঞ্জনের সুবিধার্থে কাঠামোর নীচে কাঠের চাকা লাগানো থাকে। পরিবারের বর্তমান উত্তরসূরিরা এখন কলকাতার লেকটাউনে বসবাস করলেও পুজোর টানে তাঁরা ফিরে আসেন নিজেদের রাজগড়ে। ওড়িশায় অবস্থিত হলেও, এই পুজো আজও সম্পূর্ণ বাংলা পঞ্জিকা ও বাঙালির আচার মেনেই সম্পন্ন হয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পুজো আজ পারিবারিক গণ্ডি পেরিয়ে এক সর্বজনীন রূপ পেয়েছে। রাজবাড়ি নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা ক্ষেত্রমোহন সিনহা জানান, 'ওড়িশা রাজ্যে অবস্থিত হলেও বাঙালিদের রীতিনীতি মেনে আমাদের এখানে দুর্গাপূজা প্রাচীন প্রথা মতে চলে আসছে। তবে জমিদার বাড়ির পুজো হলেও এখন সে পুজো সর্বজনীনের রূপ নিয়েছে। দুই রাজ্যের মিলনে মুখর হয়ে ওঠে এই উৎসবের দিনগুলি। এই দিনগুলিতে আমরা রাজগড়ের একাংশ খুলে দিই সাধারণ মানুষের জন্য।'
পুজো কমিটির অন্যতম কর্মকর্তা গোপাল চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, 'পুজোর এই দিনগুলিতে আমাদের এখানে রাজ্যের কোনও সীমানা থাকে না, সবই এক হয়ে যায়। এই কয়েকদিনে প্রতিবেশী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ থেকে কয়েক লক্ষাধিক মানুষ এসে ভিড় করে। এই কটা দিন আমরা সবাই একসঙ্গে ভাইচারা অর্থাৎ ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকি।'
ইতিহাস, পুজো, মেলা আর মানুষের ভিড়ে লক্ষ্মণনাথ তাই কেবল একটি সীমান্ত-জনপদ নয়, শরতের কয়েকটা দিন এটি হয়ে ওঠে দুই রাজ্যের এক জীবন্ত মিলনক্ষেত্র।