লখনউ: পূর্ণকুম্ভে প্রাণ কেড়েছে ‘সরকারি অব্যবস্থা’। প্রয়াগরাজে পদপিষ্টের ঘটনার পর সেই ব্যর্থতা ঢাকতে ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়েছিল যোগী প্রশাসন। কিন্তু গালভরা ঘোষণাই সার! চারমাস কেটে গিয়েছে। কিন্তু, ক্ষতিপূরণ ক’জন পেয়েছেন? কতজন মৃতকে পদপিষ্টের ঘটনায় তালিকাভুক্ত করা হয়েছে? কতজনের দেহের ময়নাতদন্ত হয়েছে? এই সব প্রশ্নই ধোঁয়াশায় ঘেরা। কেউ ঘুরেছেন প্রশাসনের দরজায়। কেউ আবার হাল ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু আর্থিক সাহায্য না পাওয়া বিহারের এক স্বজনহারা পরিবার মামলা করতেই ফের বেআব্রু হয়ে গেল যোগী সরকারের প্রতিশ্রুতির প্রলেপ। রীতিমতো তুলোধোনা করে এলাহাবাদ হাইকোর্ট সাফ জানিয়ে দিল, সময়ের মধ্যে মৃতের পরিবারের হাতে ক্ষতিপূরণের টাকা তুলে দিতে সরকার বাধ্য।
গত শুক্রবার বিচারপতি সৌমিত্র দয়াল সিং ও বিচারপতি সন্দীপ জৈনের বেঞ্চে এই মামলার শুনানি ছিল। বিচারপতিরা জানিয়েছেন, মৃত ওই মহিলার পরিচয় রাজ্যের কাছে অজানা নয়। তাছাড়া, বিপর্যয়ের জন্য তাঁকেও কোনওভাবে দায়ী করা যায় না। এমন অপূরণীয় ক্ষতির পর স্বজনহারা পরিবার কি সরকারের কাছে ভিক্ষা চাইবে? তাই সরকার যদি দাবি করে, মৃতের পরিজনরা ক্ষতিপূরণের আবেদন জানায়নি— তা অজুহাত ছাড়া কিছুই নয়।
উত্তরপ্রদেশে প্রয়াগরাজে বসেছিল পূর্ণকুম্ভের আসর। মৌনী অমাবস্যার অমৃতস্নানে যোগ দিতে প্রয়াগরাজের ত্রিবেণীতে হাজির হয়েছিলেন লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী। কিন্তু ওই বিপুল ভিড় সামলানোর মতো প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোই ছিল না! অব্যবস্থার জেরে পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারান ৩০ জন (সরকারি হিসেব)। কিন্তু বেসরকারি হিসেবে সংখ্যাটা অনেক বেশি। সেই সময়ই যোগী সরকারের বিরুদ্ধে মহাবিপর্যয় ধামাচাপা দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছিল। ময়নাতদন্ত না করেই দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া, সামান্য নগদ ধরানো, রাজ্যে ফেরার জন্য অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা না করার মতো ভূরি ভূরি অভিযোগ তুলেছিলেন স্বজনহারারা। ড্যামেজ কন্ট্রোলে মৃতদের পরিজনকে ২৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করে যোগী আদিত্যনাথের সরকার। কিন্তু তাতেও অনিয়ম। চারমাস পরও ক্ষতিপূরণ না পেয়ে এলাহাবাদ হাইকোর্টে মামলা করেন উদয়প্রতাপ সিং। ক্ষতিপূরণ দূরঅস্ত, তাঁর স্ত্রীর দেহেরও ময়নাতদন্ত হয়নি। শুনানিতে বিষয়টি উঠতেই ফুঁসে ওঠেন বিচারপতিরা। তাঁরা তীব্র ভর্ৎসনা করেন সরকার পক্ষকে। সরকারি আইনজীবী বলতে চান, বিহারের ওই মহিলার পরিবার ক্ষতিপূরণের আর্জিই জানায়নি। সেই যুক্তিকে ‘অজুহাত’ বলে উড়িয়ে দেয় হাইকোর্ট। সাফ জানায়, সরকার কোনও ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করলে, সময়ের মধ্যে যথাযথ সম্মানের সঙ্গে তা স্বজনহারা পরিবারের হাতে তুলে দিতে সরকার বাধ্য। এরপরই নাগরিকদের প্রতি সরকারের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়েছে দুই বিচারপতির বেঞ্চ। জানিয়েছে, ‘কুম্ভমেলা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার দায়িত্ব ছিল রাজ্য প্রশাসনেরই।’ প্রশ্ন উঠছে, মৃতের সংখ্যার মতো ক্ষতিপূরণ প্রাপকদের প্রকৃত তালিকাতেও কি গরমিল করেছে যোগী প্রশাসন? নাড়াচাড়া পড়লে সেটিও প্রকাশ্যে আসবে? আগামী ১৮ জুলাই এই মামলার শুনানি রয়েছে। সেদিন মৃতের সংখ্যা, কতজনের পরিবার ক্ষতিপূরণের আবেদন জানিয়েছে, আহত বা জখমদের কী চিকিৎসা হয়েছে, কতজন আর্থিক সাহায্য পেয়েছে— সব তথ্য হলফনামা আকারে জমা দিতে বলেছে হাইকোর্ট।