নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ধর্ষণ, নির্যাতন, খুন। বারুইপুরে সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া নৃশংসতায় এই তিন অভিযোগেই সিলমোহর দিল ময়নাতদন্তের রিপোর্ট। মৃত্যুর কারণ হিসাবে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভারী জিনিস দিয়ে সজোরে আঘাত, কিংবা আছড়ে মারা হয়েছে বালিকাকে। তাতে মাথা গুরুতর জখম হয়েছিল তার। ওই আঘাতের পরই জলে ফেলে দেওয়া হয় নির্যাতিতাকে। এই দু’টি কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হল, আশঙ্কাজনক অবস্থায় থাকলেও জলে ফেলার সময় ১২ বছরের মেয়েটির দেহে প্রাণ ছিল। কফিনে শেষ পেরেকটি মেরেছে জলে ডুবিয়ে দেওয়া।
ফুঁসছে বারুইপুর। প্রশ্ন একটাই—কেন? সারা শরীরে ছোটো-বড়ো ৩৫টি আঘাতের চিহ্ন। মুখ, ঠোঁট, বুক, মাথা... সর্বত্র। অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে যৌনাঙ্গেও। তাই যৌন নির্যাতন যে হয়েছে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত বিশেষজ্ঞরা। ধর্ষণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসার জন্য অবশ্য ইতিমধ্যেই নমুনা সংগ্রহ করে রাজ্যের ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে। যদিও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলায় ধর্ষণ, গণধর্ষণ, খুন, তথ্য-প্রমাণ লোপাট, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, অপহরণ সহ পকসো আইনের ধারা যুক্ত করেছে পুলিশ। এরইমধ্যে মূল অভিযুক্ত আনন্দ সরদার সহ দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফলে সব মিলিয়ে ধৃতের সংখ্যা বেড়ে হল তিন। প্রভাস সরদার ও দিবাকর সরদারকে সোমবার বারুইপুর কোর্টে তোলা হয়েছিল। তাদের পক্ষে কোনো আইনজীবী দাঁড়াননি। অভিযুক্তদের ১৪ দিনের পুলিশ হেপাজতের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। তাতে কিন্তু এলাকার উত্তাপ কমেনি। সোমবারও বিক্ষোভ হয়েছে সূর্যপুরহাট এলাকায়। পুলিশের দাবি, রবিবার জালে ধরা পড়া প্রভাস বারবার বয়ান বদলে তদন্তকারীদের দিকভ্রষ্ট করার চেষ্টা চালাচ্ছে। আগে সে বলেছিল, ‘আমি এই ঘটনায় যুক্ত নই।’ এদিন আবার জানিয়েছে, ‘আমাকে ১০ হাজার টাকা দিয়েছিল... অটো করে ওকে নিয়ে আসার জন্য। বলেছিল, পাচার করে দেবে। তার ভাগও দেবে।’ উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, অপহরণ করে মুক্তিপণ চাওয়ার যে দাবি রবিবার প্রভাস করেছিল, তা এদিন সে অস্বীকার করেছে। অভিযুক্ত দিবাকর এবং আনন্দ দু’জনই দাবি করেছে, ওরা ঘটনার দিন নাকি এলাকাতেই ছিল না। দিবাকরের পরিবারও মানতে চাইছে না, মাছের ব্যবসা ছেড়ে এসে এমন ঘটনা সে ঘটাতে পারে। আনন্দর বাড়ি তালাবন্ধ। প্রতিবেশীরাও মুখে কুলুপ এঁটেছেন। তবে, আনন্দর বিরুদ্ধে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। তার স্ত্রী অবশ্য থানায় এসে দাবি করে গিয়েছেন, আনন্দ নির্দোষ। শনিবার এলাকায় ছিল না। রাত ৮টায় ফিরেছে।
পুলিশ এই বয়ানে যদিও এতটুকু প্রভাবিত হচ্ছে না। তারা চাইছে এর শিকড় পর্যন্ত পৌঁছাতে। কারণ দু’টি। প্রথমত, মোটিভ। এবং দ্বিতীয়ত, নির্যাতনের মাত্রা। সূত্রের খবর, ধর্ষণের সময় প্রাণপণ চিৎকার করছিল সে। তীব্র প্রতিরোধও করছিল। তাই গলায় পা চেপে ‘স্তব্ধ’ করে দেওয়া হয়। ভয়াবহ নির্যাতনের অভিযোগে সারবত্তা জুগিয়েছে ময়নাতদন্তের রিপোর্টও। সেখানে বলা হয়েছে, নাবালিকার গায়ে নখের আঁচড়, কামড়, ছড়ে যাওয়ার দাগ রয়েছে। রবিবার সন্ধ্যা ছ’টায় ময়নাতদন্ত শুরু করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। ম্যাজিস্ট্রেটের বিশেষ অনুমতিতে, ভিডিওগ্রাফি সহ। তাঁদের দাবি, ময়নাতদন্ত শুরুর আনুমানিক ২২ থেকে ৩৫ ঘণ্টা আগে নাবালিকার মৃত্যু হয়েছে।
তবে বারুইপুরের ঘটনা যে প্রশাসনের অন্দরেও তোলপাড় ফেলে দিয়েছে, তার প্রমাণ মিলেছে এদিন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যে। তিনি সাফ বলেছেন, ‘অপরাধীদের কাউকে ছাড়া হবে না। মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। আমি কালই ওর বাবার সঙ্গে কথা বলেছি। জঘন্যতম ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চেয়েছেন তিনি। তদন্তের মাঝপথে বিস্তারিত কিছু বলব না, তবে পরিবার জাস্টিস পাবেন।’ যদিও গণপিটুনির নেপথ্যে সাম্প্রদায়িক অশান্তির ছক রয়েছে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি। বলেছেন, ‘রেললাইন যেভাবে তুলে ফেলা হয়েছে, তা অতীতকে মনে করাচ্ছে। ২০১৯ সালে সিএএ বিরোধী আন্দোলন কিংবা ওয়াকফ বিরোধী আন্দোলনের সময় এমনটা দেখা গিয়েছিল। হিংসায় যারা যুক্ত, আসলে তারা অতৃপ্ত আত্মা। ভোটে হেরে এতদিন ঘরে ঢুকে গিয়েছিল এবং এখনও ঢুকেই আছে—সেই তিন প্রধান শক্তি মিলে এই কাণ্ডগুলো ঘটিয়েছে। এদেরও এর ফল ভুগতে হবে।’ আজ, মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী ঘটনাস্থলে যাবেন।