


নিজস্ব প্রতিনিধি, বরানগর: যিশুখ্রিস্টের জন্মাতে তখনও অনেক দিন বাকি। অনেক মানে প্রায় ১০০০ বছর বাকি। তখন কলকাতা বা এই ভূখণ্ড বেশ জমজমাট। লোকজন বসবাস করছেন। নদীপথে রীতিমতো চলছে ব্যবসা বাণিজ্য। শিল্প সামগ্রী তৈরি করছে শিল্পীরা। চমক লাগলেও সত্যি আজ থেকে প্রায় ৩০০০ হাজার বছর আগে বৃহত্তর কলকাতা ছিল দস্তুরমতো ব্যস্ত জনপদ। ছিল এখনকার বড়বাজারের মতোই নামকরা বাণিজ্যকেন্দ্র। দমদমে এখন যেখানে ক্লাইভ হাউস সেখানে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলছে দু’দশক ধরে। সে সব বিশ্লেষণের পর আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (এএসআই)জানিয়েছে, ৩০০০ হাজার বছর পূর্বে দমদমের ওই অংশ ছিল প্রাচীন সভ্যতার অংশ। এবং চন্দ্রকেতুগড়ের সঙ্গে সরাসরি এবং নিয়মিত বাণিজ্যসংযোগ চালাত এই জনপদের বাসিন্দারা।
কলকাতার বয়স ৩৩৫ নাকি বেশি-কম তা নিয়ে তর্কবিতর্ক কম হয়নি। তবে সে বিতর্ক ফু দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে ভারতীয় সর্বেক্ষণ বিভাগ জানিয়েছে, এই জনপদের বয়স কমকরে ৩০০০ বছর। অর্থাৎ হরপ্পা সভ্যতার ঠিক পরপরই জন্ম নিয়েছিল কলকাতার জনপদ।
অর্থাৎ তিন সহস্রাব্দ আগেও দমদমের ক্লাইভ হাউস সংলগ্ন অঞ্চল ছিল সবথেকে সমৃদ্ধশালী। ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। ভূপ্রকৃতিগত সুবিধার জন্য সেখানে তৈরি হয়েছিল ‘বিজনেস ওয়্যারহাউস’ বা গুদাম। এই অঞ্চল থেকে জলপথে সরাসরি যোগাযোগ চন্দ্রকেতুগড়ের সঙ্গে। এই এলাকার সামগ্রী বহির্বিশ্বে পাঠানো কিংবা বাইরে থেকে আসা সামগ্রী রাখার জন্য ব্যবহার হতো গুদাম।
২০০১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত এএসআই এখানে খনন কাজ চালায়। তাতে উঠে আসে কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার নির্দশন। এখনও সেগুলির সঠিক সময়কাল ও তৎকালীন সংস্কৃতির পরিচয় নিরূপণ সম্ভব হয়নি। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের বরোদা অঞ্চলের অধিকর্তা এবং কলকাতা সার্কেলের প্রাক্তন অধিকর্তা শুভ মজুমদারের আদি বাড়ি বনগাঁয়। এ রাজ্যে থাকার সময় বিস্তর খুঁজেছেন বাঙালির শিকড়। তাঁরই তাগিদে ২০২২ সালে আরও একবার ক্লাইভ হাউস চত্বর খোঁড়াখুঁড়ি হয়। উদ্ধার হয় একাধিক পোড়ামাটির পাত্র, কচ্ছপের খোলা, পশু-পাখির ও মাছের হাড় ইত্যাদি সামগ্রী। তা পাঠানো হয়েছিল ‘মিনিস্ট্রি অব আর্থ সায়েন্স’-এ। সেখানে কার্বন ডেটিং ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত, কলকাতা ভূখণ্ডের মানবসভ্যতার ইতিহাস তিন হাজারেরও বেশি প্রাচীন।
সম্প্রতি দমদমের সরোজিনী নাইডু কলেজে ‘ক্লাইভ হাউস-ইতিহাসের নীরব সাক্ষী’ শীর্ষক আলোচনাসভা হয়। উপস্থিত ছিলেন শুভবাবু, কলেজের অধ্যক্ষ স্বাগতা দাস মোহান্ত, গ্রেটার দমদম হেরিটেজ প্রিজারভেশন সোসাইটির সভাপতি অলক গুহ, গবেষক মৌমিতা সাহা, ইতিহাসবিদ শ্যামল ঘোষ প্রমুখ। শুভবাবু উদ্ধার করা প্রত্নসামগ্রী শ্রুতি-দৃশ্য মাধ্যমে তুলে ধরেন। বলেন, ‘ক্লাইভ হাউস অনেকটা টেবল টপের মতো জায়গা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে চার মিটার উঁচু। এই জায়গায় এই কারণেই ওয়্যার হাউস করা হয়েছিল। গঙ্গারিডি সভ্যতা বলুন বা অন্য কোনও নাম-এখানকার সঙ্গে সরাসরি জলপথে যোগাযোগ ছিল চন্দ্রকেতুগড়ের। এখানে দু’টি হাতির লড়াইয়ের মডেল মিলেছে। একই জিনিস মিলেছে চন্দ্রকেতুগড়েও। ফুলদানির মতো দেখতে তরল দ্রব্য রাখার মাটির সামগ্রী বাংলার আর কোথাও মেলেনি। এখান থেকেই যোগাযোগ হতো বহির্বিশ্বে।’