


নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া: ফাগুনের দুপুরে গঙ্গার দুই তীর যেন এক অলৌকিক আবেশে ঢেকে গেল। দোলের প্রাক্কালে রবিবার হাওড়া থেকে কলকাতায় ফিরতি যাত্রা করলেন নারায়ণ-লক্ষ্মী। ঐতিহ্যের ভিনটেজ গাড়ি রোলস রয়েস সিলভার ঘোস্টে আরোহী হয়ে। সঙ্গী আবিরে রাঙা আকাশ, শঙ্খধ্বনি, কীর্তনের সুর আর হাওড়া ব্রিজে উচ্ছ্বাসে ভরা জনসমুদ্র।
প্রতি বছরের নিয়ম ও ঐতিহ্য মেনে ফাগুন মাসের দশমী তিথিতে কলকাতার বড়বাজারের সত্যনারায়ণ মন্দির থেকে শোভাযাত্রা করে নারায়ণ-লক্ষ্মী এসেছিলেন হাওড়ার মন্দিরে। চারদিন সেখানে অবস্থানের পর এদিন প্রত্যাবর্তন। নির্দিষ্ট পথ মেনেই এগল বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। পথের দু’ধারে অগণিত মানুষের ভিড়। কারও হাতে গুলাল, কারও কণ্ঠে ভজন, কারও চোখে ভক্তির অশ্রু। পাশাপাশি রঙের বন্ধনেই বাঁধা পড়েছে হাওড়া ও কলকাতা। কেউ বা মোবাইল ও ক্যামেরায় বন্দি করলেন সেই মুহূর্ত। শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এই উৎসব সম্প্রীতিরও বার্তা বহন করে। নানা সম্প্রদায়, বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ এদিন শোভাযাত্রায় শামিল হয়ে ঐক্যের ছবি গড়ে তুলেছিলেন। আবিরের রঙে মিশে গিয়েছিল ভক্তি আর আনন্দ। নারায়ণ-লক্ষ্মীকে রাধা-কৃষ্ণের রূপে সজ্জিত দেখে ভক্তদের আবেগ উথলে ওঠে। অনেকের বিশ্বাস, এই শোভাযাত্রার মধ্য দিয়েই দোল ও হোলির আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। তাই রঙের উল্লাসে গঙ্গাপাড় যেন সত্যিই হয়ে উঠেছিল এক টুকরো বৃন্দাবন।
প্রায় ১৪০ বছরের প্রাচীন এই প্রথা বাগলা পরিবারের উত্তরাধিকার। তাঁদের গৃহমন্দিরের অষ্টধাতুর বিগ্রহ প্রতিবছরই ফাগুনে এই পথে বেরিয়ে পড়েন। পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, তিন জোড়া সত্যনারায়ণ-লক্ষ্মী মূর্তির একটি কলকাতায়, একটি মায়ানমারে এবং অপরটি বারাণসীতে রক্ষিত। কলকাতার বিগ্রহটিকেই শোভাযাত্রায় আনা-নেওয়া করা হয়। ঐতিহাসিক গাড়িটিরও রয়েছে আলাদা কাহিনি। ১৯২১ সালে নির্মিত এই গাড়ি এক সময়ে নোবেলজয়ী সাহিত্যিক রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর মালিকানায় ছিল। ১৯২৭ সালে কলকাতার বিখ্যাত ব্যবসায়ী কুমার গঙ্গাধর বাগলা সেটি সংগ্রহ করার পর থেকেই দেবদ্বয়ের হোলি-যাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে এই রোলস রয়েস। আজও সেই ঐতিহ্য অটুট। রঙ, ভক্তি ও ইতিহাসের মেলবন্ধনে রবিবারের শোভাযাত্রা যেন আবার প্রমাণ করল- উৎসব মানে কেবল আচার নয়, হৃদয়ের সংযোগ। হাওড়া ও কলকাতা এদিন সত্যিই এক রঙের সুতোয় বাঁধা পড়েছিল।