নিজস্ব প্রতিনিধি, বরানগর: কাপড় অপছন্দের হলে পুজোর আগে স্বপ্নে আসেন দুর্গা। হঠাৎ হঠাৎ সুগন্ধে ভরে যায় বাড়ি। দুর্গামণ্ডপ থেকে সাদা ধোঁয়া বেরিয়ে ধেয়ে যায় শিবের মণ্ডপের দিকে। মাঝে মধ্যে মন্দিরে ১২ ফুটের সাপ আসে। অসময়ে আম পাকে। নিমতার দুর্গাবাড়ির দুর্গাপুজো ঘিরে এমন হাজারো মিথ। আরও আছে, দুর্গার জন্য আজও হয় নরবলি। তবে মানুষ নয়, কলাগাছকে দেওয়া হয় মানুষের রূপ। তা বলি দেওয়া হয়।
পরিবারের পক্ষ থেকে ধীরাজ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘মানিকগঞ্জের পুজোয় নরবলি হতো। ছোটবেলায় আমরা মহিষ ও ছাগবলিও হতে দেখেছি। বর্তমানে সব বন্ধ। এখন চালকুমড়ো বলি হয়। আর ছোট কলাগাছকে মানুষের রূপ দেওয়া হয় চাল, ময়দা, হলুদ গুঁড়ো ও ধুনুচির কালি দিয়ে। এরপর কলাপাতার উপর শুইয়ে হলুদ কাপড় চাপা দিয়ে বলি দেওয়া হয়।’ তিনি জানান, মা খুব জাগ্রত। তাঁর লীলাখেলার শেষ নেই। পুজোর আগে ১২ ফুটের সাপ কোথা থেকে এসে দরজায় ধাক্কা দেয়। তারপর গায়েব হয়ে যায় আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ধীরাজবাবুর স্ত্রী কাকলিদেবী বলেন, ‘নিজেদের বাড়ি বা আশপাশের বাড়ির কোথাও ধূপ জ্বালানো হয়নি। অথচ দেখেছি, অদ্ভুত সুগন্ধে ভরে গিয়েছে সারা ঘর। একদিন বিকেলে দেখি, সাদা ধোঁয়া দুর্গা মণ্ডপ থেকে শিবের মন্দিরে গিয়ে মিলিয়ে গেল। শাড়ি কিংবা অন্য কোনও সামগ্রী পছন্দ না হলে মা নিজেই স্বপ্নে এসে আপত্তি জানিয়ে যান। ২০২৩ সালে দেখি অসময়ে মন্দিরের গাছে আম হল। পাকলো ঠিক পুজোর সময়।’
নিমতার বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের পুজোর সূচনা ঢাকার মানিকগঞ্জে। ১৫২৬ খ্রীষ্টাব্দে পুজো শুরু। সে হিসেব ধরলে পুজো এবার ৪৯৯ বছরে পা দিয়েছে। দেশভাগের পর এই পরিবার জমিদারি নিয়ে মানিকগঞ্জেই থেকে যান। কিন্তু ১৯৭০ সালে অস্থির পরিস্থিতিতে ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পর আসেন নিমতা। সে বছরই পুজো শুরু নিমতায়। এই পরিবারের ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির পণ্ডিত ছিলেন। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র কৃষ্ণনগরের মুড়াগাছায় টোল তৈরি করে দিয়েছিলেন। পরিবারের আর এক সদস্য রানি বন্দ্যোপাধ্যায় সন্ন্যাসী হিসেবে রানি মা নামে খ্যাত। এই বাড়ির দুর্গা নিয়ে নানা ধরনের বিশ্বাস স্থানীয়দের। দুর্গা দালানের পাশে আছে শিবের মন্দির। শিব এসেছিলেন স্বপ্ন দিয়ে। প্রতিপদ থেকে ঘট তুলে শুরু হয় মায়ের আরাধনা। ষষ্ঠীর দিন বেলতলায় পুজো হয়। সপ্তমী থেকে মূল মণ্ডপে মায়ের আরাধনা শুরু। সপ্তমীর ভোগে থাকে খিচুড়ি, পাঁচরকম ভাজা ও তরকারি, ইলিশ মাছ ভাজা, চাটনি, পায়েস, গন্ধরাজ লেবু। সন্ধ্যায় লুচি, হালুয়া ও ছোলার ডাল। অষ্টমীতে মাছ ভাজা, খিচুড়ি সহ নানা পদ। অষ্টমীর সন্ধিপুজোয় বিশেষ ভোগ। থাকে কাঁচকলা, আলুসিদ্ধ, ভাত ও কাঁঠালি কলা। সন্ধ্যায় খই, মুড়কি, নাড়ু, মালপোয়া। নবমীতে খিচুড়ি, পাঁচরকম ভাজা ও তরকারি এবং ফ্রায়েড রাইস, ধোকার ডালনা, ইলিশ ও রুই মাছ ভাজা। দশমীতে দেবী খান পান্তা ভোগ। গন্ধরাজ লেবু দিতেই হয় পান্তায়। -নিজস্ব চিত্র