


অনির্বাণ রক্ষিত: আদিম মানুষ বনে-জঙ্গলে বসবাস করত। ধীরে ধীরে সভ্য হয়েছে এই মানবজাতি। যুগে যুগে এসেছে বিভিন্ন সভ্যতা, সভ্যতার পরিবর্তন। সিন্ধু সভ্যতা, রোমান সভ্যতার মতোই আর একটি প্রাচীন সভ্যতা ইনকা সভ্যতা। এই সভ্যতার সূচনা হয় দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালার দক্ষিণে কুজকো অঞ্চলে। আজ জানাব প্রাচীন ইনকা সভ্যতার ইতিহাস ও রহস্যের কথা।
মাচুপিচু
ইনকা সভ্যতার কথা আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই আসে মাচুপিচু শহরের নাম। পাহাড়ের মাথায় মেঘ ভেদ করে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে এই শহর। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা, পাথর দিয়ে সাজানো উন্নত এই শহরে রয়েছে ঝুলন্ত সেতুও। এই শহর তৈরি করতে যে প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়েছিল তা সত্যিই বিস্ময়কর। এত ভারী ভারী পাথর কীভাবে পাহাড়ের মাথায় তোলা হয়েছিল আজকের দিনে দাঁড়িয়েও তা অবাক করে বিশেষজ্ঞদের। পেরুর ৫০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত আন্দিজ পর্বতমালার কুজকো অঞ্চলে রয়েছে প্রাচীন ইনকা সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ। মাচুপিচু ইনকা সভ্যতার সবথেকে পরিচিত নিদর্শন। ‘মাচুপিচু’ শব্দটির অর্থ হল— ‘পুরনো চূড়া’। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই শহরটির উচ্চতা ৭ হাজার ৮৭৫ ফুট। ইউনেস্কো ১৯৮৩ সালে মাচুপিচুকে বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। বর্তমানে এটি বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের মধ্যে একটি।
লুকানো ছিল ৪০০ বছর
ষোড়শ শতাব্দীতে ইনকা শাসক যখন পরাজিত হন, তখন পেরু দখল করে নেয় স্প্যানিশরা। সে সময় ইনকাদের রাজধানী ছিল কুজকো। কিন্তু পেরু দখল করা হলেও এই মাচুপিচুর কথা তারা জানত না। এত ওপরের এই শহরের হদিশ তারা কোনওভাবেই পায়নি। কিন্তু হঠাৎ করে মাচুপিচু শহরের মানুষ কীভাবে উধাও গেল, সেটিও আরেক রহস্য। এটি নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় যে মতবাদ, সেটি হল গুটিবসন্তের আক্রমণে এখানকার সব মানুষ মারা যায়। আর শহরটি জনমানবহীন থাকায় ঘন জঙ্গলে ঢাকা পড়ে। স্পেনের আক্রমণের পর কেটে যায় আরও ৪০০ বছর। আর তত দিন এই শহরটি লুকিয়ে ছিল বাইরের মানুষের চোখের আড়ালে। অবশেষে ১৯১১ সালে মার্কিন প্রত্নতত্ত্ববিদ হিরাম বিংহাম শহরটিকে দুনিয়ার সামনে নিয়ে আসেন। তারপর থেকে মাচুপিচু পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় ও দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠেছে।
সোনায় মোড়া ইনকা সাম্রাজ্য
গয়না থেকে মন্দির, কিংবা প্রাসাদ— সব কিছুই সোনা, রুপো, হীরে, পান্না দিয়ে তৈরি। পঞ্চদশ শতাব্দীর আগে থেকেই সারা বিশ্বে ধনরত্নের ভাণ্ডার হিসেবে নজির গড়েছিল ইনকা সভ্যতা। গুপ্তধনের সন্ধানে বহু অভিযাত্রী পাড়ি দিলেও তাঁরা ধনরত্নের ছিটেফোঁটাও খুঁজে পাননি। অনেকে আবার নিরুদ্দেশ হয়েছেন। অনেকের দাবি, ইনকা সভ্যতার হারিয়ে যাওয়া গুপ্তধনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অভিশাপ। তবে ইনকা সভ্যতার প্রচুর ধনসম্পত্তির লুটের পিছনে একটি ইতিহাসও রয়েছে। সালটা ১৫৩২। সেই সময় ইনকা সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন আতাহুয়ালপা। ইনকা সভ্যতার ধনসম্পত্তির খবর পেয়ে সেখানে আক্রমণ করেন স্পেনীয় অভিযাত্রী ফ্রান্সিসকো পিজারো। কাহামার্কার যুদ্ধে আতাহুয়ালপাকে পরাজিত করেন পিজারো। নিজের প্রাণ বাঁচাতে পিজারোকে ঘরভর্তি সোনা ও রুপো দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আতাহুয়ালপা। চুক্তি অনুযায়ী ফ্রান্সিসকোকে ঘর ভর্তি ধনরত্ন দান করেছিলেন আতাহুয়ালপা। কিন্তু লোভের বশবর্তী হয়েছিলেন পিজারো। ইনকা সভ্যতার সমস্ত সম্পত্তি অধিকার করতে চেয়েছিলেন তিনি। সেই লোভে ১৫৩৩ সালে আতাহুয়ালপাকে হত্যা করেন পিজারো। আর লুটপাট করা প্রচুর সম্পত্তি নিয়ে চলে যান স্পেনে। ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, ফ্রান্সিসকো লুটপাট চালালেও ইনকা সভ্যতার সমস্ত ধনরত্ন নিয়ে স্পেনে ফিরে যেতে পারেননি পিজারো। ইনকা বাসিন্দারা নাকি তাঁদের ধনরত্নের অধিকাংশই লুকিয়ে রেখেছিলেন। আদতে কোথায় সেই অমূল্য ধনসম্পদ লুকনো রয়েছে, তার সন্ধান কেউ জানে না। বছরের পর বছর ধরে চেষ্টা চালালেও সেই গুপ্তধনের সন্ধান পাননি কেউ। তবে ইনকা সভ্যতার সম্পদের কিছু অংশ এখনও সংরক্ষিত আছে পেরুর রাজধানী লিমার একটি জাদুঘরে।
ইনকাবাসীর ঘর-বাড়ি
এই সভ্যতার বাসিন্দারা মূলত দেওয়াল তৈরি করত পাথর দিয়ে। কিছু কিছু ভবনের দেওয়াল তৈরিতে কোনও ধরনের চুন-সুরকির মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়নি। একটি পাথরের সঙ্গে আরেকটি জোড়া দিয়ে নির্মিত। আর এই পদ্ধতিতে নির্মাণ কৌশলে ইনকা সভ্যতার মানুষরা ছিল খুবই দক্ষ। পাথরের খণ্ড এমন নিখুঁতভাবে কাটা হতো, যাতে কোনও ধরনের সংযোগকারী মিশ্রণ ছাড়াই পাথরগুলো খাঁজে খাঁজে শক্তভাবে একটার ওপর আরেকটা বসে যায়। পাথরের এই নির্মাণ পদ্ধতিতে পৃথিবী সেরা এই সভ্যতা। শুধু খাঁজে খাঁজে পাথর বসিয়ে তৈরি স্থাপত্য অনেক বেশি ভূমিকম্প প্রতিরোধ করতে পারে। আর সে কারণেই ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হওয়া সত্ত্বেও মাচুপিচুর দেওয়ালগুলো এখনও টিকে আছে। তাছাড়া এর দরজা ও জানলাগুলো অসম চতুর্ভুজ আকৃতির।
নীচ থেকে ওপরে ক্রমে ভেতরের দিকে হেলানো। মাচুপিচুর দেওয়ালগুলো ওপর থেকে নীচে একদম সোজা নয়, বরং একসারি থেকে অন্যসারি কিছুটা হেলানো এবং এভাবে দেওয়ালগুলোর ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে। ইনকা সভ্যতায় চাকার ব্যবহার দেখা যায় না। তাই কীভাবে এত বিশাল পাথরের খণ্ডগুলো পাহাড়ের চূড়ায় তোলা হয়েছে, সেটাও এক রহস্য।
লেখার ব্যবহার ছিল না
ইনকার বাসিন্দারা নিজেদের মধ্যে যে ভাষায় কথা বলত, তা হরফে প্রকাশ করতে পারত না। ইনকা সভ্যতার মানুষ তাদের মনের ভাব প্রকাশ করত দড়ির গিঁটের মাধ্যমে। কী রঙের সুতো, কতগুলো গিঁট কিংবা দু’টি গিঁটের দূরত্ব কত— এসব দেখেই তারা অন্যের ভাব ও ভাষা বুঝত। এগুলোকে ‘খিপু’ বলা হয়। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, খিপুগুলিকে আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে ইনকা সভ্যতা সম্বন্ধে আরও অনেক অজানা তথ্যের সন্ধান মিলবে। তাঁদের জীবনযাত্রার অনেক দিক উন্মোচিত হবে।