Bartaman Logo
১৫ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

শুনশান! ভোটের কলকাতায় যেন অঘোষিত কার্ফু

শেষ কবে সম্পূর্ণ কার্ফু দেখেছে কলকাতা? ১৯৯২, বাবরি মসজিদ ধংসের পর। সে ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা। বিজেপি। তার ৩৪ বছর পর বিধানসভা নির্বাচন উপলক্ষ্যে ফের অঘোষিত কার্ফু দেখল বাংলা। সৌজন্যে নির্বাচন কমিশন। বকলমে সেই বিজেপি।

শুনশান! ভোটের কলকাতায় যেন অঘোষিত কার্ফু
  • ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: শেষ কবে সম্পূর্ণ কার্ফু দেখেছে কলকাতা? ১৯৯২, বাবরি মসজিদ ধংসের পর। সে ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা। বিজেপি। তার ৩৪ বছর পর বিধানসভা নির্বাচন উপলক্ষ্যে ফের অঘোষিত কার্ফু দেখল বাংলা। সৌজন্যে নির্বাচন কমিশন। বকলমে সেই বিজেপি।

Advertisement

বুধবার শেষ দফার ভোটে কার্যত স্তব্ধ শহর, শহরতলি, গ্রাম। নির্বাচন কমিশনের সীমাহীন কড়াকড়ি পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে দেয় ১৪২ বিধানসভা কেন্দ্রের স্বাভাবিক জনজীবন। চিকিৎসার প্রয়োজনেও বাইরে বেরোতে পারেনি কেউ। আত্মীয়ের মৃত্যুতে পর্যন্ত যোগ দিতে পারেননি কয়েকজন। যাঁদের কর্মস্থল খোলা ছিল, তাঁদের নাকের জলে চোখের জলে হতে হয়েছে। সবমিলিয়ে সর্বত্র ‘কার্ফু পরিস্থিতি’। নিরুপায় মানুষ নাজেহাল, নাস্তানাবুদ হয়ে নির্বাচন কমিশনের অবিমৃষ্যকারিতার মাশুল গুনলেন দিনভর। ভোটের এমন করুণ দিন বাংলা আগে কখনো দেখেনি।   
হাওড়া থেকে সল্টলেক, বাইপাস থেকে হাসনাবাদ, চৌরঙ্গী থেকে কামারহাটি, সোনারপুর থেকে বারাসত, কিংবা বেহালা থেকে বসিরহাট—সর্বত্র অঘোষিত কার্ফু। হাওড়া স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে শয়ে শয়ে মানুষ। কোনো গা‌ড়ি ঩নেই। বেহালায় ভোটকেন্দ্রে লম্বা লাইন। একটা খাবারের দোকান, চায়ের দোকান পর্যন্ত খোলা নেই। আইসক্রিমের একটি গাড়ি এল। অভুক্ত মানুষদের কাড়াকাড়িতে লহমায় গাড়ি ফাঁকা। উত্তর কলকাতার নিমতলা স্ট্রিটে ভূতনাথ মন্দির সংলগ্ন পুজোর জিনিস কেনার সমস্ত দোকানপাট বন্ধ। অভিযোগ, পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা এসে সব বন্ধ রাখতে বলেছে।
যাদবপুরে রাস্তার দু’ধারজুড়ে থাকা ঝাঁ-চকচকে দোকান কিংবা শপিং মল সব বন্ধ। এককাপ চায়ের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতে হয়েছে মানুষকে। কয়েকজন তরুণ রসিকতা করে বললেন, ‘মদের দোকান বন্ধ করতে বলেছিল। এ তো দেখছি চায়ের দোকানও বন্ধ।’ যাদবপুর ছাড়িয়ে সোনারপুরের দিকেও চিত্রটা এক। কোনো দোকানই খোলা নেই। রাস্তায় বাস নেই। অটো নেই। বাড়ি থেকে ভোটকেন্দ্র যেতে হাঁটা ছাড়া উপায় নেই। সল্টলেকে যেন বাংলা বন্‌ধ। শুনশান রাস্তা। মিষ্টির দোকানেও শাটার টানা। সবথেকে করুণ অবস্থায় পড়তে হয়েছে সল্টলেক, নিউটাউন, বাঙ্গুর, বরানগর, বারাসত এলাকার আবাসনের বাসিন্দাদের। ভোটকেন্দ্র হয়েছে বলে বাইরের কারও ঢোকা ছিল নিষিদ্ধ। ফলে প্রবীণদের রান্না করে দেওয়ার পরিচারিকা পর্যন্ত আসতে পারেননি। মুড়ি-পাউরুটি খেয়ে কাটাতে হয়েছে অসহায় বয়স্ক মানুষদের। তাঁরা হতাশ। নির্বাচন কমিশনের এই বাড়াবাড়িতে বিরক্ত। নিউটাউনের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত এক আইপিএস বলেন, ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কমিশনের দায়িত্ব। জনজীবন স্তব্ধ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অর্থ, নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা।’ ভাঙড়ের বাসন্তী হাইওয়ে ধু ধু করছে। এমনটা দেখা যায় না। দু’পাশের সমস্ত দোকান বন্ধ। ভোটকর্মীরা পর্যন্ত পর্যাপ্ত খাবার পাননি এদিন।
এ রাজ্য স্বাধীনতার আগে ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে দেখেছে। তখন কার্ফু দেখেছে। এ রাজ্য কলকাতার দাঙ্গা দেখেছে ’৬৪ সালে। তখনও কার্ফু দেখেছে। কিন্তু নির্বাচনের নামে এমন বাড়াবাড়ি রকমের কড়াকড়ি কোনোদিন দেখেনি। ভাবেওনি, এরকম দেখতে হবে একদিন।
এ বাংলার কাছে ভোট মানে উৎসব, নির্বাচন মানে গণতান্ত্রিক অধিকার উদযাপনের পবিত্র দিন। এবার সে দিনটি দস্তুরমতো কলঙ্কিত হল। সৌজন্যে নির্বাচন কমিশন। বকলমে বিজেপি। মানুষ এর প্রতিবাদে জবাব দিয়ে দিয়েছেন। রেজাল্ট ৪ তারিখ।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ