অর্পণ সেনগুপ্ত, কলকাতা: স্কটিশ চার্চ কলেজে স্ত্রী ছিলেন সহপাঠিনী। সেখান থেকেই বন্ধুত্ব, প্রেম এবং বিয়ে। তারপর কেটে গিয়েছে বহু বসন্ত। দু’জনেই সেটল করেছেন মার্কিন মুলুকে। সুখ-সমৃদ্ধির জীবনে হঠাৎই ছেদ পড়ল স্ত্রী কোলন ক্যান্সারে ভুগে গত হওয়ায়। তবে শোক কাটিয়ে স্ত্রী কথাকলিকে স্মরণীয় করে রাখতে নিজেদের কলেজেই ফিরলেন বহুজাতিক সংস্থা ইনটেলের প্রযুক্তিবিদ গৌতম দেবনাথ। কলেজ কর্তৃপক্ষ যখন বহু বছরের ছাত্রীনিবাস অগিলভিকে অ্যাকাডেমিক বিল্ডিংয়ে রূপান্তরের পরিকল্পনা করছে, তখন তাতে শামিল হলেন গৌতমবাবু। একইসঙ্গে বদলে দিলেন কলেজের বিজ্ঞান শাখার ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যতের দিশা।
স্কটিশ সন্ত সেন্ট জন অগিলভির নামে বিডন স্ট্রিটের হরতকিবাগান লেনে ১৯১৪ সালে এই হস্টেলটি স্থাপিত হয়। তারপর এই প্রাচীন কলেজের ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে গিয়েছিল অগিলভি। এখানকার ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে ঘড়ি মেলাতেন এলাকার মানুষ। তবে, গত কয়েক বছর ধরে স্নাতকস্তরের মেয়াদ বেড়ে হয়েছে চার বছর। বাড়তি এক বছরের পড়ুয়াদের স্থান সংকুলানে সমস্যা হওয়ায় কর্তৃপক্ষকে বিকল্প ভাবতে হয়। তখনই মাথায় আসে এই হস্টেলের কথা। ঠিক হয়, এটিকে অ্যাকাডেমিক বিল্ডিং হিসেবে গড়ে তোলা হবে। প্রাক্তনী এবং বিভিন্ন সংস্থার উদ্দেশে অনুদানের বার্তাও দেওয়া হয় ওয়েবসাইটে। অধ্যক্ষ মধুমঞ্জরী মণ্ডল বলেন, একদিন নিজের কলেজের ওয়েবসাইট ঘাঁটতে ঘাঁটতে বিষয়টি নজরে আসে গৌতমবাবুর। তিনি নিজের উদ্যোগেই কলেজে ফোন করে কর্তৃপক্ষের নম্বর নিয়ে যোগাযোগ করেন।
গৌতমবাবুর প্রস্তাব ছিল, তিনি স্ত্রী কথাকলি দেবনাথের নামে কলেজে একটি স্টেম (সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যাথামেটিক্স) ইনোভেশন অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারেন। শুধু প্রস্তাব দেওয়াই নয়, উপাধ্যক্ষ সুপ্রতীম দাসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবরও নিয়েছেন। অবশেষে অগিলভিতেই উদ্বোধন হয়েছে কেন্দ্রটির। বিভিন্ন উদ্ভাবনী এবং সৃজনশীল ভাবনার সফল রূপায়ণের জন্য এরকম ইনকিউবেশন সেন্টার প্রাইভেট বা কর্পোরেট কলেজগুলি ছাড়া আর কারও নেই বলেই দাবি স্কটিশ চার্চ কলেজ কর্তৃপক্ষের।
কেন্দ্রটির দায়িত্বে থাকা অধ্যাপিকা তামান্না সুলতানা জানান, এই কেন্দ্রে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি, ম্যাথামেটিক্সের ছাত্রছাত্রীদের প্রস্তাবিত প্রকল্প নিয়ে একটি প্রতিযোগিতা হবে। গৌতমবাবুই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি মূল্যায়ন কমিটি করে দিচ্ছেন। প্রথম স্থানাধিকারী দলকে এক লক্ষ টাকা এবং তাঁদের মেন্টরকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হবে। ওই টাকা প্রকল্পের অগ্রগতির সঙ্গে ধাপে ধাপে ছাড়া হবে। এভাবেই গতানুগতিক পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে বেশ কয়েক ধাপ এগিয়ে বাস্তব সমস্যার সমাধানের দিশা খুঁজে নেবেন ছাত্রছাত্রীরা।
এক শিক্ষক বলেন, স্ত্রীর স্মৃতিতে তাজমহল না হোক, কলেজের জন্য একটা ভবন তৈরি করে দায় সারতে পারতেন গৌতমবাবু। তবে, তিনি তা করতে চাননি। প্রোডাক্টিভ কিছু করার ভাবনা ছিল তাঁর। তাই, অগিলভিতে মূলত কমার্স এবং ম্যানেজমেন্ট শাখাকে নিয়ে যাওয়ার ভাবনা থাকলেও ইনকিউবেশন সেন্টারকেও সেখানে জায়গা দেওয়া হয়েছে। দু’টির সহাবস্থানে কোনও সমস্যা হচ্ছে না।