


নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: বেসরকারি হলে পরিষেবা ভালো হবে! এমনই যুক্তি মোদি সরকারের। তাই তো গত এক দশকে রীতিমতো টার্গেট ঘোষণা করে শুরু হয়েছে ‘অ্যাসেট মানিটাইজেশন’। ব্যাঙ্ক, বিমা, বন্দর, বিমানবন্দর থেকে বিমান সংস্থা— কোনও কিছুই বাদ যাচ্ছে না। কখনও সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা, কখনও তার শেয়ার বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। আর সেই বেসরকারিকরণের ফল মিলেছে হাতে নাতে! কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প সংস্থাগুলিতে চলেছে ব্যাপক হারে কর্মী ছাঁটাই। ফলে গত পাঁচ বছরে এক ধাক্কায় গোটা সেক্টরে ‘বেকার’ হয়ে পড়েছেন লক্ষাধিক স্থায়ী কর্মী। সদ্যসমাপ্ত বাদল অধিবেশনে লোকসভায় রীতিমতো পরিসংখ্যান দিয়ে একথা জানিয়েছে খোদ মোদি সরকার। জানানো হয়েছে, ২০১৯-২০ আর্থিক বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে মোট স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা ছিল ৯ লক্ষ ২০ হাজার। বেসরকারিকরণের ফলে তা কমে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে এসে দাঁড়িয়েছে ৮ লক্ষ ১২ হাজারে। অর্থাৎ, চাকরি হারিয়েছেন মোট ১ লক্ষ ৮ হাজার কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী।
গত পাঁচ বছরে বেসরকারিকরণের জেরে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা থেকে কত লোকের চাকরি গিয়েছে? গত মঙ্গলবার লোকসভায় এই প্রশ্ন করেছিলেন তামিলনাড়ুর সিপিএম সাংসদ আর সচ্চিথানান্থম। জবাবে কেন্দ্রীয় সামাজিক ন্যায় ও ক্ষমতায়ন মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী বি এল বর্মা লিখিতভাবে তথ্য-পরিসংখ্যান দিয়েছেন। জানিয়েছেন, শুধু সাধারণ অসংরক্ষিত ক্যাটিগরি নয়, তফসিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত সম্প্রদায়ের স্থায়ী কর্মীর সংখ্যাও কমেছে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে। একমাত্র ব্যতিক্রম ওবিসি কর্মীরা। ২০১৯-২০ আর্থিক বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় ওবিসি কর্মীর সংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ৯৯ হাজার। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে তা দাঁড়িয়েছে ২ লক্ষ ১৩ হাজারে। যদিও সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এসসি-এসটি কর্মীর সংখ্যার শতকরা হার বেড়েছে। আসলে মোট কর্মীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় সেই অনুপাতে তফসিলি কর্মীদের হার বেশি দেখাচ্ছে । সংরক্ষিত শ্রেণির নিয়োগ বাস্তবে বৃদ্ধি পায়নি।
স্বয়ং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য থেকে স্পষ্ট যে, বেসরকারিকরণের জেরে বাড়ছে কর্মী সংকোচন। সদ্য স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে দেওয়া ভাষণে নরেন্দ্র মোদি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আগামী দু’বছরে সাড়ে তিন কোটি চাকরির। তা কি আদৌ সম্ভব? সেই প্রশ্নও উঠে গিয়েছে। মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে শুরু হয়েছে এই বেসরকারিকরণের পালা। ২০১৫ সালে ৩৫টি সংস্থাকে চিহ্নিত করা হয় বিলগ্নিকরণ এবং সরকারি অংশীদারিত্ব বিক্রির জন্য। পরবর্তী ১০ বছরে বেসরকারিকরণ হয়েছে ১০টি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার। সেই তালিকার অন্যতম ‘এয়ার ইন্ডিয়া’। পাশাপাশি তেল উৎপাদন সংস্থা থেকে এলআইসি—বহু লাভজনক সংস্থার অংশীদারিত্ব বিক্রি করা হয়েছে। তাতে মোদি সরকারের কোষাগারে ঢুকেছে ৪ লক্ষ ২০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬৯ হাজার কোটিই আয় হয়েছে সরাসরি বিলগ্নিকরণ থেকে। আর সরকারি সংস্থার শেয়ার বিক্রি করে রাজকোষে ঢুকেছে ৩ লক্ষ ১৫ হাজার কোটি টাকা।
২০২৪ সাল পর্যন্ত বৃহৎ যে বেসরকারিকরণের তালিকা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভারত পেট্রলিয়াম, শিপিং কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া, কন্টেইনার কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া, আইডিবিআই ব্যাঙ্ক, বিইএমএল, লাইফকেয়ার ইত্যাদি। এমনকী কয়েকটি সরকারি ব্যাঙ্কও বিলগ্নিকরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। শেষ বাজেটেও সরকারি সংস্থা বিক্রি করে আয় করার লক্ষ্যমাত্রা ধার্য হয়েছে ৫১ হাজার কোটি টাকা। অতএব ইঙ্গিত স্পষ্ট, কর্মী সংকোচন চলবেই!