


সাগর দাস, কলকাতা: পুজোর সময় তাঁর বয়সি ছেলেমেয়েরা ব্যস্ত থাকেন ফ্যাশন নিয়ে। কোথায় গেলে মনের মতো শপিং হবে, কি কেনা উচিত সেসব নিয়ে পরিকল্পনা করেন। এ সময় বিপাশা বসুর সময় কাটে ঢাক নিয়ে। পুজোয় বাজাতে হবে বলে নতুন বোল তুলতে ব্যস্ত। অষ্টমীর অঞ্জলি পর্যন্ত দেওয়া হয়ে ওঠে না। ছুটতে হয় কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী।
বিরাটির অঞ্জনগড়ে একটি বাড়ির এক চিলতে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকেন বিপাশারা। পুজোর আগে সে ঘর থেকে ভেসে আসে ঢাকের আওয়াজ। যত কাছে যাওয়া যায় আওয়াজ তত ভারী হয়ে ওঠে। ঢুকলে চোখে পড়ে বিপাশাকে। বাবার সঙ্গে ঢাকের বোল তুলছেন বছর একুশের তরুণী। কপালে ঘাম। বাজাতে বাজাতে কাঁধ ব্যথা হয়ে গিয়েছে। তবে মুখে হাসি। তিনি একজন জনপ্রিয় মহিলা ঢাকি হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছেন এই বয়সেই।
পড়াশোনার সঙ্গে সমানতালে জীবনসংগ্রামেও নেমে পড়ছেন চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। এবার যাচ্ছেন অসম। শিলচরে এক পুলিসকর্তার বাড়ি থেকে পুজোয় বাজানোর বায়না এসেছে। টানা পাঁচদিনের প্যাকেজ। ন’জন ঢাকির একটি দল যাচ্ছে সেখানে। পাঁচজনই মহিলা। বিপাশার সঙ্গে যাচ্ছেন বর্ষা ঘোষ, নন্দিতা সরকার, প্রিয়া মণ্ডলরা। তাঁরা তৈরি করেছেন ‘রাধা রানি ঢাকি সম্প্রদায়’। সে দলের অন্য একটি টিম যাচ্ছে উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজ।
বিপাশার বাবা বাপি বসু ছিলেন গ্রাফিক ডিজাইনার। কিন্তু ঢাক বাজানোর নেশা প্রবল। অসুস্থতার জন্য আর ধকল নিতে পারেন না। কিন্তু তাঁর সে দুঃখ ভুলিয়েছে মেয়ে। বাবার হাত ধরে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় ঢাকে তামিল নিয়েছিলেন। তারপর ১৪ বছর বয়সেই পেশাদার ঢাকি হিসেবে আত্মপ্রকাশ। পুজো ছাড়াও বিভিন্ন ইভেন্টে ঢাক বাজানোর ডাক আসে তাঁর। অঞ্জনগড়ের ভাড়াবাড়িতে বাবা-মা ও দাদার সঙ্গে থাকেন বিপাশা। নিউ বারাকপুরের একটি কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। যেন সাক্ষাৎ দশভুজা। বিপাশা বললেন, ‘ফাঁকা সময় পড়াশোনা করি। ভিন রাজ্য থেকে বায়না এলে ট্রেনে যেতে হয়। তখনও বইতে চোখ বোলই। ভবিষ্যতে মিউজিক নিয়ে পড়াশোনা করার ইচ্ছা।’ সারাবছরই জীবনযুদ্ধ নামক অদৃশ্য অসুরটির সঙ্গে লড়াই চালাতে হয়। তবে শিউলি ফোটার পর তার গন্ধ নাকে আসলে টের পাওয়া যায় মা আসছেন। তখন সব দুঃখ-দুর্দশা ভুলে ঢাকে বোল তোলেন বিপাশারা। সে তালে কোমর দোলায় বাংলা।