


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: প্রয়াত জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক প্রফুল্ল রায়। বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। কিছুদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত অসুখে ভুগছিলেন তিনি। ভর্তি ছিলেন দক্ষিণ কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে। বৃহস্পতিবার দুপুরে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ বাংলার সাহিত্য জগৎ। শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও।
প্রফুল্ল রায়ের জন্ম ১৯৩৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। আদি বাড়ি ছিল তত্কালীন পূর্ববঙ্গের ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে পূর্ববঙ্গে। দেশভাগের পর ভারতে চলে আসেন। শুরু হয় কঠিন জীবন সংগ্রাম। একসময় ভারতের এপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশ দেখার ইচ্ছেয়, লেখার টানে। ছোটখাটো নানা কাজ করার পর ‘যুগান্তর’ পত্রিকার সাহিত্য বিভাগ ‘সাময়িকী’র সম্পাদক হন। কিছুকাল সংবাদ প্রতিদিনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর লেখা প্রথম গল্প ‘মাঝি’ এবং প্রথম উপন্যাস ‘পূর্বপার্বতী’। এছাড়াও ‘কেয়াপাতার নৌকো’, ‘আকাশের নীচে মানুষ’, ‘রামচরিত্র’, ‘ধর্মান্তর’, ‘রথযাত্রা’, ‘ভাতের গন্ধ’, ‘একটা দেশ চাই’-এর মতো উপন্যাস তাঁকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে পাঠকের দরবারে। তাঁর লেখায় বার বার উঠে এসেছে বাংলাদেশ ও দেশভাগের যন্ত্রণার কথা। উদ্ধাস্তু মানুষের জীবন সংগ্রাম প্রফুল্ল রায়ের বহু উপন্যাসের কাহিনিতে প্রবাহিত হয়েছে। মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘কেয়াপাতার নৌকো’, ‘শতধারায় বয়ে যায়’-এর পরবর্তী খণ্ড ‘উত্তাল সময়ের ইতিকথা’ নিছক কাহিনি নয়, বঙ্গজীবনের এক কান্তিকালের অনন্য ইতিহাস। দেশভাগের পর কলকাতা হয়ে বিহারে বসবাস শুরু করে প্রফুল্ল রায়ের পরিবার। যৌবনের সন্ধিক্ষণের একটা বড় অংশ কেটেছে বিহারে। তাঁর উপন্যাস ও গল্পের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বিহারের সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার প্রতিফলন। দীর্ঘ সাহিত্য জীবনে লিখেছেন অসংখ্য ছোটগল্পও।
‘বর্তমান’-এর শুরু থেকেই তিনি লেখক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন কালজয়ী রচনা লিখেছেন ‘বর্তমান’-এর শারদ সংখ্যায়। আত্মজীবনীমূলক ধারাবাহিক ‘আরব সাগরের তীরে’ লিখেছেন ‘সাপ্তাহিক বর্তমান’ পত্রিকায়। শারদীয়া বর্তমানে লেখা ‘ক্রান্তিকাল’ উপন্যাসের জন্য তিনি পেয়েছিলেন ‘সাহিত্য অকাদেমি’ পুরস্কার। এছাড়াও ‘বঙ্কিম’, ‘শরত্ স্মৃতি’ সহ অন্যান্য বহু পুরস্কার পেয়েছেন। দীর্ঘদিন হিন্দি ও বাংলা চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন কাহিনিকার ও চিত্রনাট্যকার হিসেবে। তাঁর গল্প-উপন্যাস অবলম্বনে প্রায় চল্লিশটি সিনেমা, টেলিফিল্ম, সিরিয়াল নির্মিত হয়েছে। উত্তমকুমার অভিনীত ‘বাঘবন্দি খেলা’ ছবির কাহিনিও তাঁর লেখা। তাঁর গল্প অবলম্বনে তৈরি বহু সিনেমা আজও দর্শকের মনে স্বমহিমায় ভাস্বর।