


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ‘দাদা, পায়ে সদ্য অপারেশন হয়েছে। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। আপনি কি কাছেই নামবেন? তাহলে এখানেই বসতে পারব...!’
মহিলার বেদনার্ত মুখ দেখে এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই বাসের সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। মানবিক যে কারও পক্ষে এটাই স্বাভাবিক। বাগবাজারের দেবাশিস চক্রবর্তী তেমনই একজন। বছর পঞ্চাশের এক প্রৌঢ়ার এমন অবস্থা দেখে তাঁকে বসতে দিয়েছিলেন তিনি। প্রৌঢ়ার সঙ্গে ছিল এক তরুণী। বয়স ৩০-৩৫ বছর হবে। ভিড় বাসে দেবাশিসবাবুর পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল সে। শ্যামবাজার মোড়ে নেমে যায় দুই মহিলা। গ্যালিফ স্ট্রিট ক্রসিংয়ে নামেন মাঝবয়সি দেবাশিসবাবু। তারপর মোবাইল নেওয়ার জন্য আনমনে পকেটে হাত দিতেই চমকে উঠলেন তিনি। পকেট থেকে তাঁর ৫০ হাজারি মোবাইল হাওয়া! কোথাও পড়ে গেল? নাকি বাসেই কেউ হাতসাফাই করল?
প্রবল দুশ্চিন্তা সঙ্গী করে তড়িঘড়ি শ্যামপুকুর থানায় ছুটলেন দেবাশিসবাবু। অভিযোগ দায়ের করেন। তদন্তভার নেয় লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগ। অভিযোগকারীর মুখ থেকে ভিড় বাসে দুই মহিলার বসতে চাওয়ার আরজি ও পরবর্তী ঘটনা শুনেই গোয়েন্দারা বুঝতে পারেন, এ কোনো ছিঁচকে চোরের কীর্তি নয়। ‘অর্গানাইজড ক্রাইম’ বা সংগঠিত অপরাধ চালাচ্ছে কোনো মহিলা গ্যাং। শ্যামপুকুরের ঘটনায় সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের একটি পুরানো মোবাইল বিক্রির দোকানের সামনে থেকে দুই মহিলাকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা বিভাগের ওয়াচ শাখা। ধৃতদের নাম সীমা সিং (৩০) ও বীণা পাওয়ার (৫০)। অভিযুক্তরা দু’জনেই পশ্চিম মেদিনীপুরের কোতোয়ালি থানার বাসিন্দা।
ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। জানা গিয়েছে, শহরজুড়ে সক্রিয় এই মহিলা পকেটমার গ্যাং। ছোটো ছোটো দলে ভাগ হয়ে ‘অপারেশন’ চালায় তারা। তবে নিছক চুরি নয়! ‘টার্গেট’-এর সঙ্গে ভাব জমিয়ে তাঁর বা তাঁদের বিশ্বাস অর্জন করে ‘অপারেশন’ চালাচ্ছে মহিলা গ্যাং। এই গ্যাংয়ের টার্গেট মূলত মাঝবয়সি পুরুষ। অভিযুক্তদের জেরা করে পুলিশ জেনেছে, প্রথমজন ‘শিকার’-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। গ্যাংয়ের অপর সদস্য সেই সুযোগে হাতসাফাই করে। মূলত মোবাইল ফোন হাতায় তারা। মানিব্যাগেও নজর থাকে তাদের। তবে ইদানিং অনেকে মানিব্যাগে নামমাত্র টাকা রাখেন। তাই মোবাইলই তাদের মূল লক্ষ্য। সেই মোবাইল বিক্রি করা হচ্ছে মধ্য কলকাতার বিভিন্ন পুরানো হ্যান্ডসেট বিক্রির দোকানে। বদলে মিলছে ২-৩ হাজার টাকা। দামি মোবাইল হলে আরও ২ হাজার টাকা বেশি।
গোয়েন্দাদের দাবি, উত্তর ও মধ্য কলকাতাতেই এই গ্যাং বেশি সক্রিয়। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, জোড়াসাঁকো, রবীন্দ্র সরণি, শ্যামবাজার, উল্টোডাঙা, খান্না সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পকেটমারির অভিযোগ আসছে। বেহালাতেও গত মাসে অটো থেকে ব্যাগ সহ ৩১ হাজার টাকা খোয়া যায় এক যাত্রীর। সেই ঘটনায় পশ্চিম বর্ধমানের জামুড়িয়ার এক মহিলাকে গ্রেপ্তার করেছে ওয়াচ শাখা। সেও এই গ্যাংয়ের সদস্য কি না, খতিয়ে দেখছে লালবাজার।