বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা কেমন, জানেন না দুর্গাপুরের লাভলি। হিসেবমতো তিনি তো তখন নেই! স্বামী সহ বাড়ির লোকজনকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে কঠিন কথাটি। কলকাতা মেডিকেল কলেজের স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান ডাঃ তপন নস্করকে বিভাগীয় চিকিৎসক এবং এনাস্থেসিওলজিস্টরা কাতর অনুরোধ জানালেন, ‘স্যর, মাকে তো আমরা পাব না, একবার চেষ্টা করে দেখিই না, সিজার করে বাচ্চাকে যদি পাওয়া যায়!’
২৫ শে সেপ্টেম্বর সন্ধ্যে। প্রসূতি তখন মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের লেবার ওটিতে। নিয়মমাফিক স্ত্রীরোগ বিভাগের একটি টিম ওয়ান-টু-থ্রি বলছে আর মুখে বিশেষ কৌশলে ফুঁ দিয়ে সিপিআর চালু রেখেছে। দ্রুত পেট আড়াআড়ি কেটে বের করে আনা হল সন্তানকে। তার অবস্থাও খুব সঙ্গীন। বাঁচবে না ধরে নেওয়া যায়! জরায়ু ফেটে পেটের ভিতর জমেছিল প্রায় আড়াই লিটার রক্ত! প্লাসেন্টা, রক্তে মাখামাখি সন্তান কীভাবেই বা বাঁচবে! ‘সিপিআর শেষ হলে ওটি থেকে নামিয়ে দিও। বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কথা বলে ফরমালিটিগুলো ঠান্ডা মাথায় দেখে নাও।’ ওটি থেকে চলে যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিলেন ডাঃ নস্কর।
প্রবীণ চিকিৎসকরা বলে থাকেন, চিকিৎসায় সবকিছু হিসেব মিলিয়ে হয় না। মানব দেহ কখন কীসে সাড়া দেয়, কখন বিগড়ে বসে, দেবা ন জানন্তি। হঠাৎ সবাইকে অবাক করে নাড়িতে স্পন্দন ফিরে এলো লাভলির। কার্ডিয়াক মনিটরের সমস্ত গ্রাফ স্ট্রেটলাইন হয়ে গিয়েছিল। শুরু করে দিল ওঠানামা। ততক্ষণে চিকিৎসকদের থেকে খারাপ খবরটা শুনে নিয়েছেন আবিদ আহমেদ। কাঁদো কাঁদো মুখে একের পর এক ফোন করে যাচ্ছিলেন লাভলির স্বামী আবিদ। জনে জনে বলছেন, ‘স্ত্রী আর নেই। বাচ্চার অবস্থাও ভালো নয়।’ তখনও তিনি জানতেন না, অপারেশন টেবিলে ‘মৃত’ স্ত্রী জীবন ফিরে পেয়েছেন! দু’দিন পর অতি আশঙ্কাজনক সদ্যোজাতের মৃত্যু হয়। কিন্তু আরও দুই শিশুর মা লাভলিকে ফিরে পায় তার পরিবার।
মঙ্গলবার যোগাযোগ করা হলে দুর্গাপুরের বাসিন্দা আবিদ বলেন, ‘কলকাতা লেডি ডাফরিন হাসপাতালে স্ত্রীকে দেখাচ্ছিলাম। সব ঠিকই চলছিল। ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে হঠাৎ করে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হতে শুরু করল। ভর্তি করার মতো সময়ও পাননি চিকিৎসকরা। ততক্ষণে ও অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। সোজা অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেলেন ওঁরা।। যা ঘটনা ঘটেছে, তা অবিশ্বাস্য। চিকিৎসকদের জন্যই সম্ভব হল।’
বিভাগীয় প্রধান ডঃ নস্কর ও সহকারী অধ্যাপক ডাঃ মনামি রায় বলেন, ‘আগের সিজারের সেলাইয়ের কাছে লাভলির প্লাসেন্টা আটকে গিয়েছিল। তারপর জরায়ু ফেটে রক্তপাত। ও শকে চলে যায়। প্রেসার, নাড়ির গতি কিছুই ছিল না। পেট থেকে আমরা আড়াই লিটার রক্ত পেয়েছিলাম। মারা গিয়েছেন ধরে নিয়ে বাড়ির লোকজনকে মৃত্যুসংবাদ পর্যন্ত দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপর যা হলো, তা দেখে জুনিয়রদের একটাই বার্তা, কখনো হাল ছাড়বে না। লড়াই চলুক শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।’ মেডিকেল সূত্রে খবর, জীবনের শিখা দপ করে জ্বলে ওঠার পর লাভলিকে স্থিতিশীল করে বাড়ি পাঠাতে লেগেছিল আরও ২৯ দিন।