


মুম্বই: সপ্তাহের ব্যস্ত দিন। তখন বিকেল। অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে দৌড়চ্ছে গোটা বাণিজ্যনগরী। হঠাৎই বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল মুম্বইয়ের লাইফ লাইন, ভিড়ে ঠাসা লোকাল ট্রেনগুলি। মাত্র ১১ মিনিটের মধ্যে পরপর সাতটি বিস্ফোরণ। ২০০৬ সালের জুলাই মাসে হওয়া ভয়াবহ সেই জঙ্গি হামলায় লুটিয়ে পড়ে ১৮৭টি তাজা প্রাণ। জখম ৯০০-রও বেশি। সেই ট্রেন বিস্ফোরণ মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া শেষ হতে লেগে গিয়েছিল ৯ বছর। ২০১৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মূল অভিযুক্ত পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল নিম্ন আদালত। বাকি সাতজনকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজা। সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল অভিযুক্তরা। তাতেই বদলে গেল রায়। ফাঁসির সাজা পর্যন্ত মাফ। সোমবার নিম্ন আদালতে দোষী সাব্যস্ত ১২ জনকেই বেকসুর ঘোষণা করেছে বম্বে হাইকোর্ট। বিচারপতি অনিল কিলোর এবং বিচারপতি শ্যাম চন্দকের ডিভিশন বেঞ্চ সাফ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে জোরালো তথ্যপ্রমাণ পেশ করতে ব্যর্থ সরকারপক্ষ। অভিযুক্তরা কোনও অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল, এটা বিশ্বাস করা শক্ত। তাই অভিযুক্তদের সমস্ত অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হল। যদিও মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ জানিয়েছেন, হাইকোর্টের এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যাবে রাজ্য সরকার।
উচ্চ আদালতের এই রায়ে বিরাট ধাক্কা খেল মহারাষ্ট্রের অ্যান্টি টেররিজম স্কোয়াড (এটিএস)। তারা বরাবর দাবি করে এসেছে, ধৃতরা প্রত্যেকেই নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন সিমির সদস্য। পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তোইবার সঙ্গে যোগসাজশে সিমি এতবড় হামলা চালিয়েছে। এদিন হাইকোর্টের রায় এটিএসের যোগ্যতাকেই কার্যত প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ডিভিশন বেঞ্চ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানায়, ‘দেখে মনে হচ্ছে, বয়ানগুলি যেন অভিন্ন। একটি বয়ান থেকেই কপি করা হয়েছে।’ শুধু তা-ই নয়, মারধর করে তাঁদের দিয়ে মিথ্যা বয়ান লিখিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযুক্তরা যে দাবি করেছিল সেটিও মেনে নিয়েছে হাইকোর্ট।
৬৭১ পাতার রায়ে ডিভিশন বেঞ্চ বলেছে, ‘আইনের শাসন, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধমূলক কাজকর্ম মোকাবিলার অন্যতম শর্তস আসল অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া। এই বিস্ফোরণে কী ধরনের বোমা ব্যবহার করা হয়েছিল, তদন্তকারীরা সেই তথ্যও জানাতে পারেনি। তাই ঘটনাস্থল থেকে জোগাড় করা নমুনা দিয়ে অভিযুক্তদের দোষ প্রমাণ করা যায় না।’ বয়ান রেকর্ড করার সময় অভিযুক্তদের আইনি সহায়তা কেন দেওয়া হয়নি, সেই প্রশ্নও তুলেছেন বিচারপতিরা।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মহারাষ্ট্র সরকারের অন্যতম হাতিয়ার মহারাষ্ট্র কন্ট্রোল অব অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যাক্ট (এমসিওসিএ)। এই আইনের বিভিন্ন ধারা মেনেই ট্রেনে ধারাবাহিক বিস্ফোরণে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করে এটিএস। এদিন তা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন বম্বে হাইকোর্ট। স্পষ্ট জানানো হয়েছে, বিস্ফোরণ মামলায় এমসিওসিএ প্রয়োগ করা যায় না। ফাইল চিত্র