


শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: শুরু হয়েছে মাতৃপক্ষ। দুর্গাপুজোয় সর্বত্র আলো, ঢাকের বাদ্য। প্রতিমার চোখে যখন শক্তির ঝলক খুঁজে ফিরবে মানুষ, সে সময় মধ্যমগ্রামের প্রীতি চট্টোপাধ্যায়ের লড়াই মনে করিয়ে দেবে রক্তমাংসের মানুষদের ভিতরেও লড়াই করার শক্তি আছে। দুর্গা যেমন অসুর বধ করেছেন। প্রীতিও তেমনই বধ করতে মরিয়া দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতাকে। স্থানীয়রা এখন প্রীতিকে দেখে বলছেন এ যেন ‘জীবন্ত দুর্গা’।
মধ্যমগ্রাম চৌমাথা পেরিয়ে যশোর রোড ধরে একটু এগলে নিউ বারাকপুর স্ট্যান্ড। ব্যস্ত রাস্তার পাশে এক কোণে দাঁড়িয়ে একটি ছোট ভ্যান। কড়াইয়ে ধোঁয়া উঠছে। পাশে সাজানো মাছ ও মাংস সহ একাধিক খাবার। ভ্যানে এক তরুণী কখনও খুন্তি চালাচ্ছেন, কখনও ক্রেতাদের হাতে খাবারের প্যাকেট তুলে দিচ্ছেন। তাঁর বয়স ২৪। বাবা নেই। মাকে নিয়ে ছোট পরিবার। সংসারের ভার অকালেই এসে পড়েছে কাঁধে। তবু ক্লান্ত মুখে নেই হতাশা। রয়েছে দৃঢ় হাসি, প্রত্যয়। মাধ্যমিক পরীক্ষার কিছুদিন আগে বাবার সঙ্গে মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। নেই স্থায়ী কোনও ঘর। ভাড়া বাড়িতে বাবাকে হারিয়ে সংসারের হাল ধরেন মা। কিন্তু সবকিছু একা সামলাতে পারছিলেন না। ফলে অল্প বয়সেই সংসারের খরচ টানতে হয়েছে প্রীতিকে। কলেজে পড়াশোনা চালাচ্ছেন জেদ নিয়ে। একসময় চাকরি পান প্রীতি। আশা ছিল এবার হয়তো সুখ আসবে। কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কিন্তু একদিন ডিউটিতে না যাওয়ায় তাঁর চাকরি চলে যায়। তাতে প্রীতি হাল ছাড়েননি। প্রতিজ্ঞা নেন স্বনির্ভর হওয়ার। জেদ করেন অন্যের হাতে নিজের ভবিষ্যৎ তুলে দেওয়া যাবে না। জমানো ১৩ হাজার টাকায় গত বছর জুলাইয়ে একটি ভ্যান কেনেন। আর সেই শুরু লড়াই। সিদ্ধান্ত নেন ফাস্টফুড বিক্রি করার। সেই মতো ইউটিউব দেখে বিভিন্ন খাবারের আইটেম বানানো শেখেন। প্রতিদিন সকালে উঠে বাজার করা। পরে বাড়ি ফিরে রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় কাজ করে কলেজে যান তিনি। পরে বিকেলে ভ্যান ঠেলে বসেন খাবারের পসরা নিয়ে। প্রীতি বলেন, বাবাকে হারানোর পর মায়ের মুখের হাসিই আমার শক্তি। দোকান বন্ধ করে রাত এগারোটা নাগাদ বাড়ি ফিরি। প্রথমদিকে অনেকেই অবাক চোখে তাকাতেন। কিন্তু আমি জেদ থেকে এক ফোঁটাও সরিনি। এর ফলে একদিকে যেমন আমার সংসার চলে পাশাপাশি পড়াশোনার খরচ উঠে যায়। আমি বারাসত ইভনিং কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, পুজোর সময় একটু চাপ রয়েছে। একটা দিনও দুর্গা মণ্ডপ দেখতে যাব না। বন্ধুরা যখন বিভিন্ন মণ্ডপে ঘুরে ছবি পোস্ট করবে তখন আমি কাজ নিয়েই ব্যস্ত। কারণ এই সময় একটু বাড়তি রোজগার হবে আশা করি। ক্রেতা সুবর্ণা দত্ত বলেন, দুর্গাপুজোয় প্রতিমায় শক্তির আরাধনা করি। কিন্তু প্রীতির লড়াইয়ের কথা মুখে বলার নেই। সংসারের দারিদ্র্য, সমাজের বাঁকা কথা, সব অসুরকেই পরাজিত করছে কলেজ পড়ুয়া মেয়েটি। আজকের দিনে যখন সামান্য ব্যর্থতায় বহু তরুণ-তরুণী ভেঙে পড়েন, তখন প্রীতি হয়ে ওঠেন এক অন্য চরিত্র। তাঁর হাতে পরিবেশিত খাবার শুধু খিদে মেটায় না, দেয় জীবন সংগ্রামের শিক্ষাও। নিজস্ব চিত্র