


বঙ্গজীবনে নববর্ষ যে বঙ্গরসনারও প্রধান অনুষঙ্গ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পয়লা বৈশাখ মানেই মিষ্টির দোকানে জলভরা কড়াপাকে পহেলা ছাপ। বাঙালির শয়নে স্বপনে জাগরণে মৎস্যবিলাসিতাও। লিখেছেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়।
বাঙালির নববর্ষ মানেই খড়খড়ে পাতা ঝরা চৈত্রের অবসানে হুড়মুড়িয়ে পয়লা বোশেখের তোড়জোড়। বৈশাখের আগমনি মানেই এক আধপশলা অঘোষিত কালবোশেখির ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে সব প্ল্যান ভণ্ডুল। পাড়ার মাচার অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি পর্বে বাড়া ভাতে ছাই। আর সঙ্গে টুপটাপ বৃষ্টি পড়লে তো সোনায় সোহাগা। হালখাতার আসরে বরফকুচি দেওয়া গ্লাস উপচানো অরেঞ্জ স্কোয়াশ আর নতুন ক্যালেন্ডার, পাঁজি— এসবই হল আমাদের ছোটবেলার পয়লা বোশেখ। আর পয়লা বোশেখ এসে পড়া মানেই অতীতের স্মৃতিতে ডুব দিয়ে বাঙালিবাবুদের নববর্ষের বিলাসিতায় অবগাহন। সে যেন এক এলাহি রূপকথার গল্প। সম্বচ্ছর বার্গার, পিৎজা, রোল, বিরিয়ানিতে বুঁদ হয়ে থাকলেও পয়লা বোশেখে যেন বাঙালির নবজাগরণ হয়। বাড়িতে না হলেও মহার্ঘ রেস্তরাঁয় গিয়েই মোচার ঘণ্ট, এঁচড়ের গুলিকাবাব খেতেই হয়, নয়তো মান থাকে না।
বাংলার বাবুবিলাসিতা ছিল সেকালে তুঙ্গে। বিশেষ দিনগুলোয় বাবুয়ানি যেন আরও বেশি প্রকট হয়ে উঠত।
কোর্মা কালিয়া পোলাও/বেয়ারা বাবুর্চি কো বোলাও।
আর সেইসঙ্গে— মুগার সুতো জড়ানো গড়গড়ার নল/ অম্বুরী তামাকের গন্ধে মাত অন্দরমহল ।
গোলাপদানে গোলাপের কেয়ারি/কদম্ব-কুরচির জল কেওড়া গন্ধে ভারি।
গিলে করা পাঞ্জাবি আর চুনোট করা ধুতির কোঁচা দুলিয়ে/
বাবুদের নববর্ষ বিলাস ভুরিভোজে কব্জি ডুবিয়ে।
মোদ্দা কথা, নতুন বছরের শুরুয়াত মানেই রসনাতৃপ্তিতেও যেন বসনভূষণের মতোই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া। বহু বর্ণিল নববর্ষ উৎসব উদযাপনের আঙ্গিক হয়তো বদলেছে কিন্তু এতটুকুও ম্লান হয়নি সেই গৌরব।
লোকগবেষক আতোয়ার রহমানের মতে, হিন্দু পুরাণে বৈশাখ মাসের নাম জ্যোতির্বিজ্ঞানের ২৭টি নক্ষত্রের এক বিশাখা নক্ষত্রের কাছ থেকেই ধার নেওয়া। পুরাণমতে, চন্দ্রের ২৭ জন পত্নীর অন্যতমা এই বিশাখা হলেন উষ্ণতার মাপকাঠি আর বৈশাখের সঙ্গে তাই বুঝি ‘খরতাপ’ জড়িয়ে। কবি কালিদাসের ‘ঋতু সংহার’-এ বৈশাখেই নিদাঘ গ্রীষ্মের সূচনা। তাই বর্ষারম্ভ হিসেবে, গ্রীষ্ম ঋতুর প্রথম মাস হিসেবে বৈশাখের একটা স্বতন্ত্র পরিচয়। সারা বছর যাতে শুভ হয়, ভালোভাবে কাটে তাই নতুন পোশাক, ভালো খাওয়া, আড়ম্বর, উৎসব, হইহুল্লোড় এসবের অনুষঙ্গ জড়িয়ে।
পিছন দিকে হাঁটলে দেখা যাবে, বাংলায় ফসল কাটা ও খাজনা আদায়ের জন্য সে বছরের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ফসলি সন’। পরে তা হল বঙ্গাব্দ আর বাংলা সন। তখন চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে কৃষকদের খাজনা, শুল্ক দেওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। তখন থেকেই কৃষকদের মিষ্টিমুখ করাতেন সম্রাট আকবর। সেই মিষ্টিমুখ যে কোন পর্যায়ে চলে গিয়েছে তার সাক্ষী আমরা এখনও। আজ তাই পয়লা বৈশাখ মানেই মিষ্টির দোকানের জলভরা কড়াপাকে পহেলা ছাপ। রেস্তরাঁর আগাম রিজার্ভেশন। মেগা ইভেন্টের বাম্পার মেনু। এর নাম আধুনিক ভাষায় পয়লার পণ্যায়ন। আগেভাগেই কাপড়চোপড়, মিষ্টি, গয়নার দোকানিদের কোমর বেঁধে তুমুল মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি নিয়ে বাজারে নেমে পড়া। এরে কয় নববর্ষ বাম্পার।
তবে তার মাঝে কিন্তু হারায় না এই বর্ষবরণে মঙ্গলঘট, আমশাখা, সিঁদুর স্বস্তিকের পাশাপাশি মঙ্গল শোভাযাত্রা বা প্রভাতফেরির মতো বাঙালির আচারবিচার, রীতিনীতি। সেখানে গ্রামীণ রীতি আবার আরও প্রকট।
গ্রামে গেলে আজও দেখা যায় কোথাও বৈশাখী মেলা। কিন্তু তাছাড়াও যা চোখে পড়ে তা হল ভোরবেলায় নতুন জামা পরে কৃষকের ও পরিবারের নানাবিধ আনাজপাতির বিচিত্র সব ভর্তার সঙ্গে জমিয়ে পান্তাভাত খাওয়া। কোথাও আবার চাষিবউ আগের রাতে একটি ঘটের মধ্যে জল দিয়ে তাতে আমের ডাল আর একটু চাল ভিজিয়ে রাখে। পয়লার ভোরে সেই চালপানি খেয়ে চাষি যাবে হলকর্ষণে। আর দুপুরে তার আহার্য হল কবির ভাষায়, ‘পান্তা ভাতে মরিচ পেঁয়াজ’। বাড়ি ফিরে গরম ভাতে একটু শুঁটকি বা আলু অথবা বেগুনভর্তা। শেষপাতে পিঠাপুলি, মিষ্টিরও স্থান থাকবে। নিদাঘ গ্রীষ্মের আগমনিই কি তবে বৈশাখী এই পান্তাবিলাস? শরীর ঠান্ডা রাখতে যার জুড়ি নেই। যেন আগাম সতর্কবাণী। গ্রীষ্মের দিন আগত ওই! ওহে ঠান্ডা রাখো পেট।
শহুরে বঙ্গজীবনে নববর্ষ যে বঙ্গরসনারও এক প্রধান অনুষঙ্গ তা বুঝি বলার অপেক্ষা রাখে না। কাকপক্ষীও তার সাক্ষী। পয়লার পরদিন পথের ধারে যে পরিমাণে কলাপাতা, থার্মোকলের প্লেট, বাটি, প্লাস্টিকের গ্লাস, মাংসের হাড়, মাছের কাঁটাপোটা, চিংড়ির খোলা পড়ে থাকে তাতে বিচিত্র কিছুই নয়।
‘মাছেভাতে’ নামে বাঙালির চিরকেলে বদনাম। আর এই মাছভাতই সবচাইতে পুষ্টিকর এমনই শোনা যাচ্ছে বিশ্বের তাবড় সব চিকিৎসক মহলে। কী দূরদর্শিতা বাঙালির তাই ভাবি এক একবার। কবি ঈশ্বরগুপ্ত বাঙালি ছিলেন কি না। তাই তো লিখেছিলেন সেই কোন যুগে...‘ভাতমাছ খেয়ে বাঁচে বাঙালি সকল/ ধানে ভরা ভূমি তাই মাছ ভরা জল’
এই হল আমাদের শাশ্বত গ্রামবাংলার চিত্র, যেখানে বাঙালির শয়নে স্বপনে জাগরণে মৎস্যবিলাসিতা। আর পয়লা বৈশাখে বাঙালিয়ানার অন্যতম অনুষঙ্গ হল পান্তা ইলিশ। আর এখন সেই মহার্ঘ মরশুমি মাছ দিয়েই যেন বাঙালির ইলিশের খাতা খোলা প্রতিবছর। হোটেল রেস্তরাঁ সবখানেই ইলিশের পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা। ঘটিরা অবিশ্যি রে রে করে তেড়ে আসবে তা শুনে। আবারও শুরু হয়ে যাবে সেই ঘটি-বাঙালের চিরাচরিত চিংড়ি ভার্সেস ইলিশ কিসসা। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। তার আগে ইলিশকে নববর্ষে তোল্লাই দেওয়াই যায়। কারণ ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডের প্রাবল্যে ইলিশের হেলথ কোশেন্ট এখন বিদেশি স্যামনের সমান।
দ্বাদশ শতকের পণ্ডিত জীমূতবাহন এসব জানতেন না কিন্তু সাহিত্যে সর্বপ্রথম ইলিশ মাছের নাম উল্লেখ করে গিয়েছেন।
সর্বষামেব মতস্যানাম্ ইল্লিশঃ শ্রেষ্ঠ উচ্যতে
ভাগীরথীজলে ভাত নিত্যং রজতখন্ডবৎ।।
সংস্কৃতে এমন প্রাঞ্জল বর্ণনা পড়লে মনে হয় জহুরিই বুঝি জহর চেনেন।
খাদ্যরসিক পরিমল গোস্বামী একবার বেতারে ইলিশ নিয়ে তাঁর রম্যভাষণেই তো বলেছিলেন, ‘গীতায় ভগবান বলেছেন যে আমাকে যেমন করেই ভজুক তাকে আমি তুষ্ট করি, আর আমাদের ইলিশ বলেন যে, যে যেমন করেই আমায় ভাজুক, আমি তাকেই তুষ্ট করি।’
পয়লা বোশেখেও তাই ইলিশের এত রমরমা আজ।
আসলে বাংলার সাহিত্যসাগরে মাছের অবাধ বিচরণ এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ইতিহাস। এই মাছের মধ্যে আবার ইলিশ নিয়ে একটু বেশিই পক্ষপাতদুষ্ট আমরা বিশেষ বিশেষ দিনে। তবে বছরের প্রথম দিনে বিজয়গুপ্তর মনসামঙ্গলের দক্ষিণ সাগরের কলা দিয়ে ইলিশের ঝোল সেদিন রুচবে না বাঙালির মুখে। সেদিন ভাপা ইলিশ বা সর্ষে ইলিশই চাই তাদের। আর যারা শোল ভালোবাসে তাদের অবিশ্যি কবিকঙ্কন মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলের খুল্লনার হাতের আম শোলই সই।
মাছ তো বটেই, একালের পয়লা বোশেখে মুরগি-মাটনও স্বমহিমায় বিরাজমান। তবে ছেলেপুলেরা ‘ডিপ ফ্রায়েডে’ মুখ বাঁকায় কিন্তু কাবাব বানাতে ম্যারিনেটেড মাংসের টুকরোয় কতবার যে তেল ব্রাশ করা হয় তার তুলতুলে স্বাদ আনার জন্য, তা তাদের অজানা। তাই এখন কাবাব তাদের রসনায় ইন। মাংসের কিমা শিকে গেঁথে পোড়ানো বা মাংসের টুকরো ঝলসানো চলে আসছে সেই মঙ্গলকাব্যের আমল থেকেই। দেবী অন্নপূর্ণাই যখন রাঁধেন ‘অন্নমাংস সিকভাজা কাবাব করিয়া’ অর্থাৎ বাঙালির অন্যতম প্রিয় কম্বো পোলাও মাংস আর শিককাবাবকে যখন স্বয়ং রবিঠাকুর সার্টিফিকেট দিয়েছেন, তখন আমরাই বা বাদ যাই কেন?
‘দু হাত দিয়ে লেগে গেল
কোফ্তা-কাবাব-ধ্বংসনে ।
গুরুপুত্র সঙ্গে ছিল—
বললে তারে, ‘অংশ নে’।’
সেই সঙ্গে এখন আবার নতুন বছরের ভোজসভায় মাছের পাতুরির খুব চল দেখছি। ওই যে ফিশ ফ্রাইয়ের থেকে পুষ্টিকর বলেই হয়তো। ডিপ ফ্রায়েড নয় যে পাতুরি! পারসি সম্প্রদায়ের পত্রানি মচ্ছি অনেকটাই আমাদের এই পাতুরির অনুরূপ বলে বাংলার পাতুরি পারসি সম্প্রদায়ের পত্রানি মচ্ছির সহোদর বলা যেতে পারে। তবে বরিশালের ফুল্লশ্রী গ্রামের বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গলে বরিশালের রান্নাশৈলীতে কলাপাতায় রোহিত মৎস্য বা রুইমাছের উল্লেখ আমাদের ভাবায় বটে।
‘মৎস্য মাংস কুটিয়া থুইল ভাগ ভাগ।
রোহিত মৎস্য দিয়া রান্ধে কলাপাতার আগ।’
তাই আগে মুরগি না আগে ডিম সেই তর্কের মতোই পাতুরির জন্মবেত্তান্ত প্রসঙ্গ তোলা রইল আপাতত।
ধ্রুপদী আর পুরাতনী গানের বৈঠকি আড্ডা চাই বাঙালির। দুয়ারে তেল সিঁদুরের স্বস্তিকের সঙ্গে ডাব, আম্রপল্লব, কলাগাছ, পাঁজি, নতুন ক্যালেন্ডার... এসব অনুষঙ্গের পাশাপাশি চাই নতুন বছরের প্রাতরাশে রবিঠাকুরের সেই আদি অকৃত্রিম সনাতন লুচি ছোকা।
‘সাহেব মেরেছি! বঙ্গবাসীর কলঙ্ক গেছে ঘুচি।
মেজবউ কোথা, ডেকে দাও তারে
কোথা ছোকা, কোথা লুচি!”
রামকুমার চট্টোপাধ্যায় তো সেই লুচির মহিমা নিয়ে গুণকীর্তন করেইছেন রসরাজ অমৃতলাল বসুর কথায়, ‘ওগো লুচি তোমার মান্য ত্রিভুবনে/ তুমি অরুচির রুচি মুখমিষ্টি সূচি/ খাইয়ে ধন্য জীবন-এ...’ বাঙালির বিশেষ দিনে প্রিয় খাবারে লুচি না থাকলে চলে? সঙ্গে হয়তো লেজওয়ালা বেগুনভাজাও।
আচ্ছা শুরু থেকে কতজন বাঙালির নাম করলাম বলুন তো? আসলে নতুন বছরের খাওয়াদাওয়া আর বাঙালির কথা লিখতে বসলেই বাঙালির অন্যতম আইকনদের কথা এসে পড়ে তাই তাঁদের স্মরণ মননও হয়। মানে রথ দেখা আর কলা বেচার মতো আর কী। যাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন খাদ্যরসিক।
শান্তিনিকেতনে গোড়ার দিকে নববর্ষের উদযাপন খুব বড় করে না হলেও ব্রাহ্মসমাজের অন্যান্য উৎসবের মতোই সকাল থেকে চলত উপাসনা, সামগান, বেদমন্ত্র পাঠ। থাকত খাওয়াদাওয়ার আয়োজনও। ক্রমে ব্রাহ্মসমাজের প্রভাব ক্ষীণ হতে লাগল আর কলকাতায় নববর্ষের উৎসবের দায়িত্ব এসে পড়ল রবীন্দ্রনাথের হাতে যাঁর নিজের জন্মদিনও বৈশাখে। খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাপনায় মাতিয়ে দিত অন্দরমহলের মহিলাবাহিনী। তাঁদের ইনোভেটিভ কুকিংয়ের প্রতিযোগিতা চলত যেন সেই দিনে। একসময় নববর্ষের দিনই রবীন্দ্রজন্মোৎসব পালনের প্রথা শুরু হল। কারণ পঁচিশে বৈশাখ পড়ত গরমের ছুটির মধ্যে। টানা বারান্দায় মেঝেতে কার্পেটের আসন বিছিয়ে সামনে কলাপাতার পাত। আর তাকে ঘিরে অগুনতি মাটির খুরিতে সাজানো সব উপাদেয় পদ। কাঁচা ইলিশের ঝোল থেকে চিতল মাছ, মাছের পোলাও থেকে চালতা দিয়ে মুগডাল, নারকেল চিংড়ি থেকে আমশোল আরও কত কিছু ডেলিকেসি। সবই ঠাকুরবাড়ির সিগনেচার আইটেম। শেষপাতে রেলিশ হল দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রিয় পাঁঠার হাড়ের অম্বল। সে অম্বল যে খায়নি তার নাকি জীবন বৃথা।
‘বৃহৎ রূপার থালে পাচক ব্রাহ্মণ ঢালে/ মাংসের পোলাও গাদা গাদা/ কি গুণ পাঁঠার হাড়ে, অম্বলের তার বাড়ে/ কে বুঝিবে ইহার মর্যাদা।’ দ্বিজেন্দ্রনাথ কি আর সাধে লিখেছিলেন তাঁর ‘গুম্ফ আক্রমণ’ কাব্যে?
ঠাকুরবাড়িতে রান্না নিয়ে এমন নিত্যনতুন চর্চার প্রতিফলন ঘটত এইসব উৎসবের দিনের খাবারের তালিকাতেও।
আসলে বাঙালির রসনাসংস্কৃতি চিরকালই বহুমাত্রিক তাই নববর্ষ মানেই খাওয়াদাওয়া। সেদিন আমাদের খেতেই হবে খাঁটি বাঙালি খাবার। তাই বুঝি আধুনিক হোটেল রেস্তরাঁও মেপে নিয়েছে বাঙালির স্বাদকোরকের চাহিদা। সেখানে আজ মোচার চপ থেকে চিংড়ির বাটিচচ্চড়িরও বেশ কাটতি। সঙ্গে কচুপাতা চিংড়ি আর নোবেলজয়ী রবিকাকার জন্য উদ্ভাবিত প্রজ্ঞাসুন্দরীদেবীর ‘কবি সম্বর্ধনা বরফি’ বা ‘এঁচোড়ের পুরভরা পটলপূরণ ভাজা’ আজ দৌড়য় সমান তালে। এবং অবশ্যই পয়লা বৈশাখের দিনেই। ভাবতে মজা লাগে, একসময় বাঙালি রেস্তরাঁয় যেত নতুন খাবারের স্বাদ নিতে। আর এখন যায় বাঙালি রান্না খেতে। আসলে আমরা সাবেক বাঙালির রান্নার স্বাদই যে পেতে চাই এই দিনে। তার উপাদান থেকে রন্ধনপ্রক্রিয়া সবটাই আমাদের মা, ঠাকুরমার হেঁশেলের। বাঙালির ডালনায় জিরে, তেজপাতা, কাঁচালঙ্কা ফোড়ন আর নামানোর সময় ঘি-গরমমশলা অথবা চচ্চড়ি বা লাবড়ায় পাঁচফোড়ন আর শুকনো লঙ্কা... খাঁটি ঘিয়ের স্পর্শে শুক্তোর সুখ উপচে পড়া আর যে কোনও ঘণ্ট গারনিশিংয়ে নারকেলের বিছানায় কুড়মুড়ে ভাজাবড়ির গুঁড়ো... এভাবে বোধহয় রান্না করে আসমুদ্রহিমাচলের মানুষ। কিন্তু ঠিক বাংলার স্টাইল আর সিগনেচার বুঝি হয়েও হয় না। তাই নববর্ষের দিন সেই ছোঁয়া, সেই গন্ধটাই যেন আবিষ্কার করি আমরা। আরও আরও বেঁচে উঠি বাঙালি হয়ে, বাংলা মায়ের আদরে। যারা পারে নিজের হাতে বানায়। যারা পারে না তারা ছোটে রেস্তরাঁয় মায়ের হাতের সেই স্বাদ পেতে।
ঔপনিবেশিক বাংলায় রান্না নিয়ে আলোড়ন ফেলেছিলেন সে যুগের সু-রাঁধিয়ে, খাদ্যগবেষক রবিঠাকুরের ভাইঝি স্বনামধন্য প্রজ্ঞাসুন্দরীদেবী। তাঁর হাতে বাঙালি রান্নার মধ্যে শুক্তো থেকে শাকভাজা যেমন ছিল, তেমনই ছিল চিংড়ির মালাইকারি আজ যা পয়লা বৈশাখের অন্যতম প্রধান পদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চিংড়ির মালাইকারি বা মালয়কারির অস্তিত্ব প্রাক-ঔপনিবেশিক ভারতে পাওয়া যাবে কি না জানা নেই তবে রবিঠাকুরের ইন্দোনেশিয়া যাত্রার প্রভাবে বাটিকের মতো মালয় দেশের নারকোলি রান্না ঢুকে পড়েছিল আমাদের বাংলায়। তারপর কিছুটা এধার-ওধার। বাঙালির স্বাদে ঝাল-নুন-মিষ্টির কোশেন্ট একটু চড়া। তাই সবমিলিয়ে আজ এই সেলেব পদ নিপাট বাঙালির ঘরোয়া খাবারে উন্নীত। সেই যে কল্যাণী দত্তের ‘থোড় বড়ি খাড়া’য় নারকেল চিংড়ির স্তুতিব্যজন।
‘গলদাং বাগদাং রস্যাং নারিকেল সমণ্বিতাম্
অলাবু লোভানাং কৃত্বা তক্ষিতব্যং শুভে যোগে’
যতই পোকাগোত্রীয় হোক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মাছভাত, পিঠেপায়েসের মতো চিংড়ি নিয়েও আদিখ্যেতা কিন্তু শিখরে। বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গলের মতো মধ্যযুগীয় রেসিপি মানে
‘ভিতরে মরিচ গুঁড়ো বাহিরে জুড়ায় সুতা/
তৈলে পাক করিয়া রান্ধে চিংড়ির মাথা’
এমন জটিল পাকপ্রণালী আজ আমরা ফলো করি না। কিন্তু মাছমহলে চিংড়িপোকার পপুলারিটি রোধে কে আর নববর্ষের মেনু থেকে চিংড়িকে হটায় কার সাধ্যি? সে তো সব্ব ঘটে কাঁঠালি কলা। সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতেই তো নতুন বছরের খানাপিনায় অন্যতম আইটেম হতো চিংড়ির কাটলেট কারি, জানিয়েছিলেন তাঁর পুত্রবধূ ললিতা রায়।
তবে ইংরেজদের রাজত্বকালে বনেদি জমিদার বাড়িতে নববর্ষের খাওয়াদাওয়ার মেনুতে সাবেকি বাঙালি পদের পাশাপাশি বিদেশি কিছু পদও থাকত বইকি। এতকিছুর পরেও অবনঠাকুর কি আর সাধে বাবুর্চি তালেব আলির রান্না মুরগির স্টু চাইতেন? না চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তীদেবী রুইমাছের কাঁটা বেছে সেদ্ধ করে বাবুর্চির কাছেই তো শিখে ফেলেছিলেন ফিশ ক্রোকে! আমার দিদিশাশুড়িমাকে নিজের হাতে খাইয়েছিলেন তিনি এমনই এক পয়লা বৈশাখেই। বনেদি বাঙালি বাড়িতে বয় বাবুর্চি রেখে রান্না করানোর চল ছিল। তাই ঔপনিবেশিক বাংলার ট্র্যাডিশনে মাটন ডাকবাংলোও যেমন হতো তেমনি হতো মুরগির স্টিমার কারিও। কলেজ স্ট্রিটের প্যারামাউন্টের মতো নববর্ষে নতুন রকম শরবতি বিলাসও হতো বাঙালির ওইদিন। ডাবের মালাই শরবত, জিরেভাজার গুঁড়ো ছড়ানো কাঁচা আমপোড়ার সরবত, কাগজি লেবুর গন্ধে মাত করা বাড়িতে পাতা টক দইয়ের ঘোল বা তরমুজের শরবতও ছিল।
বাঙালি রান্নার পাশাপাশি একটু স্বাদ বদলাতে বা বিদেশি অতিথি আপ্যায়নের জন্য স্ট্যু, স্যুপ, দোলমা, ক্রোকে, ফ্রাইজাতীয় সব কেতাদুরস্ত পদ বাবুর্চিদের দিয়ে রাঁধানো হতো।
তবে পুরনো কলকাতায় হালখাতার আয়োজনে বিতারিত মিষ্টি মানেই আগাগোড়া বাঙালিয়ানা।
কড়া পাক ও নরম পাকের জলভরা সন্দেশ, কাঁচাগোল্লা, গোলাপ পাপড়ি সন্দেশ, দিলখুশ, রোজক্রিম সন্দেশ, বসন্তবাহার, বাতাবি, বাবু সন্দেশ, লেবু সন্দেশ, আবার খাব, সবুজ আম সন্দেশ, রসগোল্লা, ছানার পায়েস, রাবড়ি, কালোজাম, চমচম, পান্তুয়া... ছানা ও ক্ষীর আর চিনির মেলবন্ধনে মিষ্টান্নের একই অঙ্গে কত রূপ! এ হাতের খেল বাঙালিই দেখাতে পারে।
কিন্তু বাঙালি গৃহস্থ বাড়ির নববর্ষের আয়োজন? সেখানে সাধারণ মধ্যবিত্ত থেকে বনেদি পরিবার সর্বত্র বাঙালিয়ানার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে খাওয়াদাওয়ার রেওয়াজই কিন্তু মুখ্য আজও। কালিয়া, কোর্মার সঙ্গতে ঘি-ভাত বা পোলাওয়ের প্রচলন ছিল। মুসলমানি হেঁশেলের কালিয়া বা কোর্মা হিন্দু বাঙালির হাতে পড়ে কেবল হাতবদল হল যেন! বাঙালি আমিষ ও নিরামিষ উভয়প্রকার কালিয়া-কোর্মাতেই অভ্যস্ত কিন্তু। মাছ ও মাংসের পাশাপাশি গরমে সদ্য ওঠা এঁচোড় বা গাছপাঁঠার কোফতা, গুলিকাবাব বা কালিয়াই তার প্রমাণ। সেইসঙ্গে ধোঁকা বা ছানার ডালনা তো মধ্যমণি বিশেষ দিনে। আর এই কোর্মা, কালিয়া বা রেজালা সবই মূলত আজকের দিনের গরগরে ‘কারি’ যার অঙ্গ হল ঘি আর গরমমশলা তা বুঝতেও বাকি নেই আমাদের। কোনওটায় বেশি তো কোনওটায় কম । কালিয়ায় আলু দেওয়া হতো তবে কোর্মা বা রেজালায় আলু থাকে না। আবার কালিয়া খুব ঘন হয় না কিন্তু কোর্মা রেজালা বা কালিয়া অপেক্ষা ঘন হবে। কোর্মায় হলুদ মাস্ট কিন্তু রেজালা হবে দুধ সাদা। পেঁয়াজ, রসুন দিয়ে এসব মশলাদার রান্না হল বাঙালি পাকশালে মুসলমানি প্রভাব। তবে পয়লা বৈশাখের মেনু ঠিক করতে গিয়ে এসবের কথা মাথায় রাখতেই হয় কারণ পেটরোগা বাঙালি সারাবছর এত মশলাদার, গরগরে ‘রিচ’ খাবার খেতে পারে না।
তার চাইতে বাঙালির সাবেকি ডাল— না কিন্তু অনেক সহজপাচ্য আর বারোমেসে আইটেম। এমনি দিনেও চলে, বিশেষ দিনেও তার কাটতি আছে বইকি। আচ্ছা বলুন তো আসল শব্দটা কী? ডালনা না ডানলা? সেই আলনা আর আনলা কিংবা রিশকা আর রিকশার মতো এ রহস্য আজও অমীমাংসিত। তবে ডালের পরে খাওয়ার নিয়ম ডালনা আর মিলন দত্তর বাঙালির খাদ্যকোষ থেকে প্রজ্ঞাসুন্দরীদেবীর নিরামিষ আহার সর্বত্র নিরামিষ ডালনার মূলে ডুমো ডুমো বা ‘ডুমা ডুমা’ করে কাটা আনাজের উপস্থিতি। প্রজ্ঞাসুন্দরীর মতে ডালের মতো নাতি গাঢ়, নাতি পাতলা মাঝামাঝি গোছের কনসিস্ট্যান্সির এই বাঙালি পদের নামই হল ডাল-না। পয়লা বোশেখের ছানা বা ধোকার ডালনার অন্যতম অঙ্গ কিন্তু আলু এখনও।
এবার আসি পয়লা নম্বর অন্নকাহনে। পোলাও অর্থাৎ ঘিয়ে ভেজে মিষ্টি ভাত রান্না আজকের পাইস হোটেলের বাসন্তী পোলাও। আবার বাঙালির মিঠে পোলাও মানেই নিরামিষ পুষ্পান্ন। চলতি কথায় যার আদুরে নাম ঘিভাত। পুষ্পান্ন হল ঠাকুরের ভোগে নিবেদিত নিরামিষ পোলাও আর পলান্ন হল আমিষ। মূলত সেসময় পোলাও রাঁধা হতো গোবিন্দভোগ বা তুলসীভোগ অথবা চিনিগুড়া এইসব চাল দিয়ে। এখন বাসমতীতেও রাঁধা হয়। একটু মিষ্টির পরিমাণ এই রান্নায় বেশিই থাকে। প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর ভাষায় ড্রাইফ্রুটস এই পোলাওতে ‘সোহাগ’ উৎপাদন করে। তাই সোহাগী পোলাও বা ঘিভাতের এত আদর এই বিশেষ দিনগুলোয়। আগেকার দিনে খাঁটি ঘিয়ে চপচপে করে রাঁধা হতো এই ঘিভাত। এখন তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে যতই ফ্রায়েড রাইসের ঢালাও আয়োজন হোক না কেন তা একপ্রকার বিজাতীয় এবং অপাঙ্ক্তেয় এই বিশেষ দিনে। তার মূলে হল ভাতের ফ্যান ঝরানো। পোলাও বা ঘি ভাতে চালের সুগন্ধই চলে যাবে যদি তার ফ্যান ফেলে দেওয়া হয়। ফ্রায়েড রাইস সেখানেই কম নম্বর পায়।
পুরনো কলকাতায় নববর্ষের ভোজে মুসলমানি বিরিয়ানি রাঁধার রীতি ছিল না। পল বা মাংস মিশ্রিত অন্ন বা পলান্ন মানে আজ যার বিরিয়ানি নামে কদর তাও বাঙালির সম্পত্তি বটে। যদি অন্নদামঙ্গলের দেবী অন্নপূর্ণা ‘অন্নমাংস সিক ভাজা কাবাব করিয়া’ অর্থাৎ শিবের জন্য নিজেই রাঁধেন সঘৃত পলান্ন ও শিকপোড়া তাই বুঝি নতুন বছরে আমাদের বাড়িতে ঠাম্মা, দিদিমা মাংসের পোলাও রাঁধতেন। আখনির জলে রাঁধা সে পোলাও বিরিয়ানির এক কদম বেশি। তবে সুগন্ধি চাল ছাড়াও পোলায়ের প্রধান অঙ্গ হল অনেকটা ভালো ঘি, কাজু-কিশমিশ-কাঠবাদাম আর ছোট, বড় দু’রকম এলাচ, লবঙ্গ, দারচিনি, জয়িত্রী, জায়ফল, শাজিরে, শামরিচ। আগে দেখেছি ঠাকুরমা, দিদিমা আখনির জলে পোলাও রাঁধতেন। ওঁরা দিতেন কিশোরী রং। আর বাংলার প্রথম কালিনারি কলমচি বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায় তো তাঁর পাকপ্রণালী গ্রন্থের অন্ন প্রকরণে অভগ্ন ঝুরঝুরে ভাতের জন্য নির্দেশ দিয়েইছেন এরূপ: ‘চাল দেবে যততত, জল দেবে তার তিন তত’। আর ‘ফুটলে পরে ভাতে কাটি/ তারপরে দেবে জ্বালে ডাঁটি’
যদি কেউ বছরের প্রথম দিনে ঘিভাত রাঁধতে নাও চায় তাহলেও অতিথি সৎকারে ঘাটতি থাকে না বাঙালির ঘরে। সেই চর্যাপদ বা চৈতন্যদেবের ট্র্যাডিশন যেন এখনও অব্যাহত। অতিথির পাতে ধোঁয়া ওঠা অভগ্ন চালের ওপর ঘি ছড়াতে ছড়াতে আজও বুঝি বঙ্গললনা ভাবেন সেই প্রসঙ্গ। সার্বভৌম ভট্টাচার্যের কাছে চৈতন্যদেবের নিমন্ত্রণে—
‘পীত সুগন্ধি ঘৃতে অন্ন সিক্ত কৈল,
চারিদিকে পাতে ঘৃত বহিয়া চলিল’।।
সাদা ভাত ফেলনা নয়। রেস্তরাঁর মহার্ঘ স্টিমড রাইসের প্রতি বাঙালির আবেগ পলান্ন বা পরমান্ন অপেক্ষ কিছু কম নয়। ভোজনবিলাসী বাঙালি গোবিন্দভোগের ফুরফুরে ভাত দিয়ে মুড়িঘণ্ট, রামশাল চালের ভাতের সঙ্গে মাছের ঝোল, ঝিঙেশাল চালের ভাতের সঙ্গে নিরামিষ ডাল তরকারি, বাসমতী চালের সঙ্গে দই রুই বা চিংড়ি মালাইকারির রসায়ন একটু যেন বেশিই বোঝে এই পয়লা বোশেখের মধ্যাহ্নভোজে। প্রজ্ঞাসুন্দরীই তো বলেছেন, ‘সৈন্যের গুণে যেমন সেনাপতির খ্যাতি বর্ধিত হয়, সেইরূপ আনুষাঙ্গিক খাদ্যের গুণে প্রধান খাদ্য সমাধিক রুচিকর হইয়া ওঠে।’
এবার আসি পয়লা বোশেখের মধ্যাহ্নভোজের আনুষঙ্গিক পদে।
সৈয়দ মুজতবা আলির ‘জলে ডাঙ্গায়’ বইতে আছে বাঙালির পঞ্চরসে ভোজন সমাপনের কথা। ‘আমরা তেতো, নোনা, ঝাল, টক, মিষ্টি— এই পাঁচ রস দিয়ে ভোজন সমাপন করি’ অর্থাৎ আমাদের পঞ্চব্যঞ্জন সেই হরেদরে পঞ্চ রসের সমাহার বটে এবং বিদেশি মেনুর ফাইভ কোর্স মিলও। বাঙালির এ এক প্রাচীন ট্র্যাডিশনও। এখনও সেই ট্র্যাডিশন চলছে। পঞ্চপদের সমাহারে ভরে ওঠে নববর্ষের থালি। শাকের সঙ্গে বাঙালির গাঁটছড়া সেই চর্যাপদের যুগ থেকেই। সেখানে ভাতের সঙ্গে নালিতা বা পাটশাকের কথা রয়েছে। আর শাক শুভ তাই শুরুয়াত শাকভাজা দিয়ে। এবার শুক্তো, ঘণ্ট। ডালের সঙ্গে নানা তরকারির ভাজা। নতুন বছরের ডালও স্পেশাল। মাছের মাথা দিয়ে সোনামুগ ডাল কিংবা নারকেল দিয়ে মুগ মনোহরা। সেকালে থাকত আরও নিরামিষ পদ। সেগুলি মেন কোর্স বা প্রধান পদ। যেমন ডালনা, কালিয়া, কোর্মা জাতীয়। সঙ্গে গরগরে আমিষ। যেমন চিতল মাছের মুইঠ্যা, দই কাতলা, সর্ষেপোস্ত বাটা দিয়ে রুই, চিংড়ি মালাইকারি, ভেটকি পাতুরি, ভাপা ইলিশ বা হরগৌরী কইয়ের মতো জনপ্রিয় সব আইটেম।
মাছের পাশাপাশি মাংসের মধ্যে বড় বড় আলু দেওয়া, ওপরে তেল ভাসা কচি পাঁঠার বাঙালি ঝোল আজও সমান জনপ্রিয়।
ঠিক গরম পড়তেই পর্যাপ্ত তোপসে মাছ পাওয়া যায়। তাই পয়লা বৈশাখে আমার ঠাম্মার ছিল পোলাওয়ের সঙ্গে প্রজ্ঞাসুন্দরীর তোপসে বড়া যাকে আমরা বলতাম তোপসে ফ্রাই। সাধে কি আর ঈশ্বর গুপ্ত এত আদিখ্যেতা করেছিলেন এই ‘কষিত-কনককান্তি কমনীয় কায়, গালভরা গোঁফ-দাড়ি তপস্বীর প্রায়’ ম্যাঙ্গোফিস নিয়ে? সাহেবরা এমন তোল্লাই দিয়ে গেল যে বাজারে তোপসের দাম যেন আর কমল না।
এতসব এলাহি ভোজনের মধুরেণ সমাপয়েত টকমিষ্টি চাটনি দিয়ে। কবি কৃত্তিবাস যে বাঙালিই ছিলেন তা আবারও প্রমাণিত হল যেন। নয়তো কৃত্তিবাসী রামায়ণে সীতার বিয়ের ভোজনে খাবার পরিবেশনার বর্ণনাতে কেন লিখবেন তিনি?
‘শেষে অম্বলান্তে হৈল ব্যাঞ্জন সমাপ্ত/ দধি পরে পরমান্ন পিষ্টকাদি যত...।’ বাঙালির শেষপাতে টকজাতীয় কিছু পদ চাই-ই। তা সে অম্বল হোক বা চাটনি কিংবা টক বা জারক। এই অম্বলের সঙ্গে বাঙালির গাঁটছড়া বহুকাল আগে থেকেই। তবে পয়লা বৈশাখের চাটনির তালিকায় সদ্য ওঠা কাঁচা আম কিন্তু বাধ্যতামূলক। চৈত্রেই নীলষষ্ঠীর দিনে মহাদেবের পায়ে আম ছুঁইয়ে এসেছে বাঙালি। তাই আম খেতে তার নেই মানা। তা আমরা যতই মৈমনসিংহ গীতিকা’র মলুয়া পালার ‘মানকচু ভাজা আর অম্বল চালিতার’ কথা বড়মুখ করে কপচাই না কেন! তবে প্রজ্ঞাসুন্দরী অবিশ্যি ব্যতিক্রমী। রবিঠাকুরের ৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে সেবার নতুন বছরের ভূরিভোজেই নিজের হাতের রান্না করা ‘পটোলের ঝুরঝুরে অম্বল’ খাইয়েছিলেন তাঁর রবিকাকাকে। আম-মৌরলার মতো মাছের অম্বলও সমান তালে জনপ্রিয় বাঙালির বিশেষ দিনগুলোয়। কারণ বৈশাখেই তো কাঁচা আমের কাটতি আর জনপ্রিয়তা দুই-ই। অন্যসময় তেঁতুল দিয়েই মাছের টক রাঁধে বাঙালি। কাঁচা পেঁপের প্লাস্টিক চাটনি? সেও তো সেলিব্রিটি রেলিশ নববর্ষে।
এবার মধুরেণ সমাপয়েতের দ্বিতীয়ার্ধে মনে পড়ে গেল রবিঠাকুরের ‘প্রায়শ্চিত্ত’ নাটকের মিষ্টান্নমিতরে জনাঃ! মিষ্টি ছাড়া শেষ পাত বৃথা। বিশেষ দিনের ভূরিভোজের শেষপাতে পিঠে পায়েসের চল তো বাংলায় বহুকালের। চৈতন্যমঙ্গল থেকে চৈতন্যচরিতামৃত অথবা দ্বিজ বংশীদাসের মনসামঙ্গল... সেখানে তখন কোথায় বাংলার যাদবচন্দ্র অথবা কে সি দাস বা নকুড় নন্দী কিংবা ভীমচন্দ্র নাগ মহাশয়? অগতির গতি আপনা হাত। তাই বুঝি মনসামঙ্গলে ‘পরমান্ন পিষ্টক যে রান্ধিছে সনকা’ অথবা শচীদেবীর তত্ত্বাবধানে লক্ষ্মীদেবীর বিয়ের পর হেঁশেলে প্রবেশ করেই রাঁধতে বসেন স্বামীর প্রিয় ‘সঘৃত পায়স’ আর ‘পিষ্টক’। সেই ট্র্যাডিশন মেনেই বাঙালি পয়লা বৈশাখে পরমান্ন না রাঁধুক অন্তত পাড়ার দোকান থেকে সাধ্যমতো রসমালাই বা মিষ্টি দই কিনে আনবেই। বাঙালির শর্করা জাতীয়র সঙ্গে অটুট আত্মিক বন্ধন মেনে নিয়ে, শত বাধাবিপত্তি, স্বাস্থ্যবিধি সরিয়ে রেখে সেই রসময় দানাযুক্ত আখের নির্যাসেই আত্মসমর্পণ!
আর রন্ধনশিল্পও যে ভারতীয় চৌষট্টিকলার অন্যতম, সে কথা আবারও প্রমাণিত হয় বাংলা নববর্ষের খাওয়াদাওয়ার ফিরিস্তি দেখে।