Bartaman Logo
১৪ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

দেশদ্রোহী সাজিয়ে ‘শুকিয়ে’ মারার চেষ্টা যাদবপুরকে!

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষের বিরূপ মন্তব্য কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ নয়, বরং বাংলার বৌদ্ধিক ঐতিহ্য ও মুক্তচিন্তার মূলে কুঠারাঘাত।

দেশদ্রোহী সাজিয়ে ‘শুকিয়ে’ মারার চেষ্টা যাদবপুরকে!
  • ২৭ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

দত্তাত্রেয় ঘোষ: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষের বিরূপ মন্তব্য কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ নয়, বরং বাংলার বৌদ্ধিক ঐতিহ্য ও মুক্তচিন্তার মূলে কুঠারাঘাত। এই আক্রমণের শিকড়ে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে উচ্চশিক্ষার বেসরকারিকরণের পরিকল্পনা। দেশদ্রোহী সাজিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক এজেন্ডা পরিপূর্ণ করার সমীকরণ। স্রেফ শুকিয়ে মারার চেষ্টা।

Advertisement

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থার দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে ১৯০৬ সালে যে ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশন’ গঠিত হয়েছিল, তারই উত্তরসূরি এই বিশ্ববিদ্যালয়। যখন লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে বাঙালির মেরুদণ্ড ভাঙতে চেয়েছিলেন, তখন স্বদেশি আন্দোলনের আবহে দেশীয় শিক্ষা প্রবর্তনের লক্ষ্যে জন্ম নেয় এই প্রতিষ্ঠান। ঋষি অরবিন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়রা ছিলেন এর অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক। জাতীয়তাবাদের বৌদ্ধিক ও ব্যবহারিক রূপ শতবর্ষ আগেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছিল।
অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় আজও ভারতের গর্ব। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কলা বিভাগে এই বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বমানের প্রতিভা তৈরি করে ভারতের জাতীয় স্বার্থ ও উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছে।  ইসরোর চন্দ্রযান অভিযান থেকে শুরু করে গ্লোবাল ইনোভেশন সূচক, প্রতিটি ক্ষেত্রে যাদবপুরের প্রাক্তনীরা ভারতের জাতীয় স্বার্থ সিদ্ধি করছেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক গবেষণার মানচিত্রেও এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক তালিকায় এই প্রতিষ্ঠানের ৫১ জন অধ্যাপক বিশ্বের সেরা ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর মধ্যে স্থান পেয়েছেন। কিউএস অথবা টাইমসের মত আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিং কিংবা কেন্দ্রীয় সরকারের এনআইআরএফ সূচকে এই প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে ভারতের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অন্যতম হিসাবে স্বীকৃত।
কিন্তু বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার সুকৌশলে এই প্রতিষ্ঠানের কণ্ঠরোধ করছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে বরাদ্দ অর্থ কমিয়ে দিয়ে গবেষণা ও কাঠামোগত উন্নয়নকে স্তব্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্য আসলে তাঁর সেই শিক্ষানীতিরই বহিঃপ্রকাশ, যেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে আর্থিকভাবে পঙ্গু করে শিক্ষার বেসরকারিকরণের পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে। সরকারি অর্থায়ন কমিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব তহবিল তৈরির চাপে ফেলা আদতে সাধারণ মেধাবী ও প্রান্তিক ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়ার সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র।
যখনই কোনো প্রতিষ্ঠান মুক্তচিন্তার চর্চা করে এবং সরকারের জনবিরোধী নীতির সমালোচনা করে, তখনই তাকে দেশবিরোধী তকমা দিয়ে তার বরাদ্দ কমানো হয়। এই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ভারতের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোকে বিপন্ন করছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবমাননা মানে আসলে ব্রিটিশদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গড়ে ওঠা ভারতের সেই জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের অবমাননা। 
 লেখক: গবেষক, চলচ্চিত্রবিদ্যা বিভাগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ