সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: জেন জিও মুখিয়ে ছিল বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠে ‘যা দেবী সর্বভূতেষু’ শুনতে। মহালয়ার ভোর যেন চিরসবুজ। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠের পর এই সকাল অন্য মাত্রা পেয়েছে। ৮০ বছরের বৃদ্ধ বৃদ্ধা যেমন এই ভোরে তাঁর কণ্ঠস্বর শোনার জন্য আগ্রহী, তেমনই নতুন প্রজন্মও এদিন ভোরের অপেক্ষায় দিন গুনছিল। সূর্যের আলো ফোটার আগেই তাঁদের অনেকেই হাজির হয়েছিলেন দামোদরের তীরে। কাশফুলের বনে কেউ সারলেন ফোটোশ্যুট, আবার কেউ ভোরের স্নিগ্ধতা উপভোগ করলেন। মায়ের আগমনে উল্লাস, গোলাপবাগ সহ বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে বাজি ফাটালেন। বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সর্বমঙ্গলার পুজোর প্রতিপদ থেকেই শুরু হয়ে যায়। রাজবাড়ির পুজোও এই তিথিতে শুরু হয়। তাই এদিন থেকেই নতুন প্রজন্ম উৎসবে মাতোয়ারা।
বর্ধমান রাজ কলেজের পড়ুয়া সর্বেশ্বর চক্রবর্তী বলেন, ছোটবেলায় মা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলা শোনার জন্য ঘুম ভাঙিয়ে দিতেন। সেই তখন থেকেই এই ভোরের প্রতি অন্যরকম টান তৈরি হয়। এখন আর মাকে জাগাতে হয় না, এমনিই ঘুম ভেঙে যায়। স্কুল জীবন থেকে এখনও পর্যন্ত মহালয়ার প্রতিটি সকালেই উঠেছি। আর এক ছাত্র অর্ঘ্য প্রধান বলেন, মহালয়ার ভোরে দামোদরের পাড়ে আসব না এমনটা হতেই পারে না। বন্ধুরা একসঙ্গে সবাই মিলে এসে হইহুল্লোড় করি। কবে কোন মণ্ডপে যাব তা নিয়েও আলোচনা হয়ে যায়। এখন মোবাইলে সব সময়ই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলা শোনা যায়। কিন্তু মহালয়ার ভোরে তাঁর চণ্ডীপাঠ শুনলে মন পবিত্র হয়ে যায়। আগামী প্রজন্মের কাছেও এই দিনের গুরুত্ব একইরকম থেকে যাবে। বর্ধমান শহরের বাসিন্দা রূপা হুই, শাশ্বতী মণ্ডল বলেন, মহালয়ার ভোরে সেই ছোটবেলা থেকে রেডিওয় মহিষাসুরমর্দিনী শুনে আসছি। আজও তা না শুনলে মা আসছে, পুজোর আনন্দ যেন শুরু হচ্ছে বলে মনে হয় না। আমাদের কমবয়সিরাও আজ রেডিওয় কান রেখেছে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলা যেন আট থেকে আশি সকলকেই টানে। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, এবার শহরের বিগ বাজেটের পুজো মণ্ডপগুলি চর্তুথীর সন্ধ্যায় উদ্বোধন হবে। এবারও প্রায় ২০টি বিগ বাজেটের পুজো শহরে হচ্ছে। শহরের রাস্তায় এবার ছুটবে ‘বন্দেভারত’। আবার কোথাও তৈরি হচ্ছে দুবাইয়ের মন্দির। সুন্দরবনের পরিবেশও পুজো মণ্ডপে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। কাটোয়া, কালনা, মেমারি, আউশগ্রামেও এবার তৈরি হচ্ছে থিমের মণ্ডপ।
তবে সর্বমঙ্গলা মায়ের পুজো প্রথা মেনে প্রতিপদেই শুরু হয়ে যাচ্ছে। মন্দিরে প্রতি বছরই জেলার বিভিন্ন প্রান্তের বাসিন্দারা মন্দিরে ভিড় করেন। রাত পর্যন্ত পুণ্যার্থীদের ভিড়ে মন্দির জমজমাট থাকে। সেই ভিড়ে মিশে থাকে জেন জি-রা। তাদের পুজো শুরু হয়েছে মহালয়ার ভোর থেকে। এদিন সকাল থেকেই চলছে জমিয়ে আড্ডা। অনেকে অফিস ছুটি নিয়ে আড্ডায় মশগুল। তাঁরা বলছেন, মহলয়ার আগের রাতে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করা হয়। আর ভোর থেকে নিজের মতো করে দিন উদযাপন শুরু হয়। দামোদরের ঘাটে ঘাটে শুরু হয় তর্পণ। নদের পাড়ে দুলছে কাশবন। সেখানে নতুন প্রজন্মের মোবাইল বা ক্যামেরার ফ্ল্যাশ বারবার ঝলসে উঠবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই মুহূর্তের ছবি পোস্ট হতে থাকে। কিন্তু এসেবের মাঝেও তাঁরা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র ‘জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণধারিণী’ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিল।



