রেল, সড়ক পরিবহণ, বন্দর, অসামরিক বিমান পরিবহণ ইত্যাদি সব মন্ত্রক থাকবে। মন্ত্রী-আমলা থাকবেন। সংসদে একটু-আধটু প্রশ্নোত্তরও হবে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি নেবে অন্য কেউ। একটি আমলাতান্ত্রিক সংস্থা! হ্যাঁ, পরিকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে এমনই একটি ইন্টিগ্রেটেড ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড লজিস্টিকস অথরিটি তৈরি করতে চলেছে কেন্দ্রের মোদি সরকার। সেটি থাকবে কেন্দ্রীয় শিল্প বাণিজ্য মন্ত্রকের অধীনে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে নজরদারি করবে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরই। নতুন এই অথরিটি কী করবে? নতুন রেলপ্রকল্প, সেতু-হাইওয়ে-বন্দর-বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের পরিকল্পনা। প্রকল্পের প্রভাব বিচার, তথ্য সংগ্রহ। কেন্দ্র ও রাজ্যের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা। পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে বাজেট, কোন খাতে কত বরাদ্দ ইত্যাদি নির্ধারণ, কর্মসংস্থানের হিসাব তৈরি। মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে রেল এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব জানিয়েছেন, ১০ বছর পর কোনো একটি পরিকাঠামো নির্মাণ করা কেন জরুরি, সেই আগাম পরিকল্পনাও এই সংস্থাই করবে। অর্থাৎ এতদিন যে কাজের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের ছিল, তার একটি বড়ো অংশ এবার চলে যাবে একটি নতুন কর্তৃপক্ষের কাছে। আর এখানেই আসল প্রশ্ন— উন্নয়নের কাজে সমন্বয় দরকার, কিন্তু সমন্বয়ের নামে এভাবে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার দরকার আছে কি? মন্ত্রী একটি প্রকল্প নিয়ে সংসদে জবাব দেবেন, অথচ সেই প্রকল্পের পরিকল্পনা, অগ্রাধিকার বা মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তাঁর মন্ত্রক নেবে না। এমন হয় নাকি? কোনো ভুল হলে কে দায়বদ্ধ থাকবে?
ভারতের মতো দেশে এভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের আরও একটি বাস্তব বিপদ আছে। এখানে সরকারি পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নের ফারাক আকাশ-পাতাল। দিল্লিতে বসে ঠিক হল একটি নতুন হাইওয়ে যাবে অমুক পথে। কিন্তু সেই পথে কার জমি, কোথায় বন, কোথায় গ্রাম, কোথায় আদালতের মামলা, কোথায় বিদ্যুতের লাইন, কোথায় রেলের সঙ্গে ক্রসিং ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর কাগজে কলমে খতিয়ে দেখা হয় না। পরে তা সামনে এলে প্রকল্পের বাস্তবায়ন পিছিয়ে যায়। খরচ বাড়ে। সঙ্গে কিছুক্ষেত্রে বাড়ে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও। ক্যাগ-এর রিপোর্টে তো বারবার সামনে এসেছে যে, জাতীয় সড়ক প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং নকশা বদলের কারণে বহু প্রকল্পের কাজ বছরের পর বছর ধরে পিছিয়েছে। অর্থাৎ, দিল্লিতে বসে এক সংস্থা যতই নিখুঁত মাস্টার প্ল্যান বানাক, বাস্তবের ময়দানে রাজ্য-জেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা না থাকলে তা কাগজেই আটকে থাকবে। বরং নতুন একটি অথরিটি তৈরি হলে, তারা আবার আরও একটি অনুমোদনের স্তর তৈরি করলে, প্রকল্প সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার গতি আরও কমবে। তখন কেন্দ্র বলবে, রাজ্য জমি দেয়নি। রাজ্য বলবে, প্রকল্প বাস্তব পরিস্থিতি না বুঝে তৈরি হয়েছে। আর অথরিটি বলবে, তার কাজ ছিল শুধু পরিকল্পনা করা। অর্থাৎ ক্ষমতা এক জায়গায়, কিন্তু দায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে। পরিকাঠামো নির্মাণে এর চেয়ে বিপজ্জনক সমীকরণ আর কী হতে পারে?
আর সবচেয়ে মজার বিষয়, এই ‘সমন্বয়’ করার জন্য ইতিমধ্যেই একটি ন্যাশনাল মাস্টার প্ল্যান ব্যবস্থা চালু করেছে মোদি সরকার। নাম, পিএম গতিশক্তি। ২০২১ সালে চালু হওয়া এই মাস্টার প্ল্যানের লক্ষ্য ছিল, রেল, সড়ক, জলপথ ও বিমানসহ সমস্ত পরিকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে একটি একক প্ল্যাটফর্মে এনে সমন্বয় করা, যাতে কাজের গতি বাড়ে এবং খরচ কমে। তাহলে নতুন অথরিটি আবার কেন? আগের ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে? তাহলে এভাবে রেল থেকে সড়ক, বন্দর থেকে বিমান পরিবহণ ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তের উপর কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব কায়েম করা কেন? ভারতের সমস্যা সব সময় পরিকল্পনার অভাব নয়। ‘এক সংস্থা, এক পরিকল্পনা’ শুনতে যতই সুন্দর হোক, ভারতকে একটি একরকম প্রশাসনিক ছাঁচে ঢোকানো যাবে না। পরিকাঠামোর সমন্বয় চাই, কিন্তু তার সঙ্গে চাই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, স্পষ্ট দায়িত্ব এবং সরাসরি জবাবদিহি। কে পরিকল্পনা করবে, কে বাস্তবায়ন করবে এবং ভুল হলে কাকে জবাব দিতে হবে, এটা স্পষ্ট করতে হবে। না হলে কাল হয়তো সত্যিই বলতে হবে, রেল কিংবা সড়ক মন্ত্রক রাখার দরকার কী? সব তুলে দিয়ে একটা অথরিটিকেই সবটা দিয়ে দেওয়া যাক! এতেই তাড়াতাড়ি কাজ হবে।