


আগামী শুক্রবার মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ছিলেন অহিংসা ও সত্যের পূজারি। কীভাবে পেলেন এই কঠিন পথে চলার অনুপ্রেরণা, সেই গল্পই শোনালেন সায়ন্তন মজুমদার
সদূর দক্ষিণ আফ্রিকার এক স্কুল। একজন ভারতীয় ব্যারিস্টার সেখানকার স্কুলমাস্টার। তিনি খুবই ভালো মানুষ। সচরাচর মাস্টারমশাই কাউকে মারধর করতেন না। ছাত্রদের মধ্যে ছিল এক দস্যি ছেলে। একদিন রাগের মাথায় ছাত্রটির হাতে স্কেলের এক ঘা বসিয়ে দিলেন। স্বাভাবিকভাবেই ছাত্রটি কেঁদে ক্ষমা চেয়ে নিল। কিন্তু অভূতপূর্বভাবে মাস্টারমশাই নিজেই থরথর করে কাঁপতে শুরু করেন। কারণ তিনি ভীষণই কষ্ট পেয়েছেন। নিজের হাতে বিদ্যার হাতিয়ারকে হিংসার অস্ত্ররূপে ব্যবহার করে তিনি লজ্জিত। সেই মাস্টারমশাই আর কেউ নন— মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। গোটা দেশের কাছে তিনি ‘মহাত্মা’ নামে পরিচিত।
গান্ধীজি ছিলেন অহিংসার প্রকৃত পূজারি। অহিংসার অর্থ হল হিংসা না করা। গান্ধীজির জন্মস্থান গুজরাতের পোরবন্দর। আর আমেদাবাদের সবরমতীতে রয়েছে তাঁর আশ্রম। সেখানে একসময় প্রচুর সাপ ছিল। গান্ধীজি ছোট থেকে সাপকে খুব ভয় পেতেন। কিন্তু আশ্রমে সাপ মারা নিষেধ ছিল। তাঁর প্রতিষ্ঠানে হিংসার কোনও স্থান নেই।
এই অহিংসার বলে বলীয়ান হয়েই মহাত্মা সমস্ত মানুষকে তাদের ভিন্নতাকে দূরে সরিয়ে রেখে এক করে দেখতে শিখেছিলেন। শুধু কথায় নয়, কাজেও তার প্রমাণ দিয়েছিলেন। বিদেশে যখন তিনি ব্যারিস্টারি শুরু করেন, তখন নিজের অফিসের কেরানিদের বহু কাজ নিজের হাতে করে দিতেন! দক্ষিণ আফ্রিকায় সকলে তাঁকে ‘গান্ধী ভাই’ বলে ডাকত।
এই অহিংসার পূজারিকে সারা জীবন হিংসার অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকাতেই প্রচণ্ড শীতের এক গভীর রাতে তাঁকে ট্রেনের কামরা থেকে ফেলে দিয়েছিল শ্বেতাঙ্গরা। তিনি কীভাবে নিজের চুল কাটতে শিখেছিলেন তা জানলেও আশ্চর্য হতে হয়। যখন গান্ধীজি দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিলেন, তখন বর্ণবিদ্বেষ চরম আকার নিয়েছে। এক ইংরেজ নাপিত তাঁর চুল কেটে দিতে অস্বীকার করেন। ফলে তিনি নিজেই নিজের চুল কাটা শিখে নেন।
অনেকেই জানতে চান, মহাত্মা গান্ধী কীভাবে অহিংসার পূজারি হয়ে উঠলেন? তিনি যে সারা জীবন সত্য ও অহিংসার পথে হেঁটেছেন, এর নেপথ্যে রয়েছে তাঁর পিতা করমচাঁদ উত্তমচাঁদ গান্ধীর অবদান। অহিংসার সবথেকে বড় শিক্ষা অহিংসার মাধ্যমেই করমচাঁদ নিজের ছেলেকে দিয়েছিলেন। কিশোর বয়সে মোহনদাস একবার একটা অন্যায় করে বসেন। কাজটা করার পর তিনি অনুতপ্ত হন। অনুভব করেন মনের উপর বোঝা হয়ে বসে রয়েছে সেই অন্যায় কাজটি। বাবার হাতের মার খাওয়ার ভয় ছিল না। কারণ বাবা কোনওদিনই তাঁদের মারধর করতেন না। এদিকে মুখ ফুটে অন্যায়টা বাবার কাছে বলতেও পারছিলেন না। গান্ধীজির বাবা তখন রোগশয্যায়। একটি চিঠিতে গোটা ঘটনাটি জানিয়ে তিনি বাবার বিছানার পাশে রেখে আসেন। চিঠিটি পড়ে গান্ধীজির বাবার চোখ জলে ভরে যায় এবং তিনি চিঠিটি ছিঁড়ে ফেলেন। আড়াল থেকে সব দেখে কিশোর মোহনদাসও কেঁদে ফেলেন। গান্ধীজি তাঁর আত্মজীবনীতে এই ঘটনাটি উল্লেখও করেছেন। এপ্রসঙ্গে তিনি একটি লাইন লিখেছিলেন—‘আমি যদি ছবি আঁকিয়ে হতাম, তাহলে আজকের দিনেও সেদিনের ছবি নিখুঁতভাবে আঁকতে পারতাম।’ এর থেকেই বোঝা যায় বাবার চোখের জল তাঁকে কতটা নাড়িয়ে দিয়েছিল।
পনেরো বছর বয়সে পাওয়া বাবার সেই ভালোবাসাকে পঞ্চান্ন পেরিয়ে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন শুদ্ধ অহিংসারূপে। বাপু মনে করতেন অহিংসা হল পরশপাথরের মতো। যার ছোঁয়ায় বিশ্বের অনেক কিছুই পাল্টে যেতে পারে। নাথুরাম গডসের হিংসার গুলি বুকে নিয়ে এইরকমই এক জানুয়ারি মাসের ৩০ তারিখে তিনি চলে গিয়েছিলেন না ফেরার দেশে। কিন্তু তাঁর বাণী আজও অমর হয়ে রয়ে গিয়েছে— চোখের বদলে চোখই যদি নীতি হয়, তাহলে তো পৃথিবী একদিন অন্ধ হয়ে যাবে।