সুদীপ্ত কুণ্ডু, হাওড়া: ৩৪১ বছর ধরে দুর্গা রূপে পূজিতা হন পদ্মাবতী। শিবপুরের রায়চৌধুরী বাড়ির পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক আশ্চর্য স্বপ্নাদেশের কাহিনি। আজও পুজোর তিনদিন রীতি মেনে হয় পাঁঠাবলি। দশমীতে দেবীর বিসর্জনের পর তাঁর মাথার মুকুট পরিয়ে দেওয়া হয় পরিবারের গৃহদেবী মা ব্যাতাইচণ্ডীকে। কয়েক শতক পেরলেও সেই রীতিতে পড়েনি বদলের ছাপ।
কথিত আছে, শিবপুরের রাজা রামব্রহ্ম রায়চৌধুরীর মেয়ে প্রতিদিন দুপুরে রাজবাড়ির কাছের বালি পুকুরে খেলতে যেতেন। সেখানে তাঁর খেলার সঙ্গী ছিল পদ্মাবতী নামে এক ছোট্ট মেয়ে। খেলাধুলার পাশাপাশি দুই বান্ধবীর পুকুরে নেমে স্নান করাও ছিল রোজকার অভ্যাস। সেই খবর রাজার কানে পৌঁছাতেই ছন্দ কাটে। মেয়ের এমন কাণ্ডে রেগে গিয়ে রাজা জানতে চান, কে এই পদ্মাবতী? কোথায় তার বাড়ি? কেনই বা প্রতিদিন সে রাজকন্যার সঙ্গে দেখা করতে আসে? রাজকন্যার মাধ্যমে তাঁকে রাজ-দরবারে ডেকে পাঠানো হয়। কিন্তু রাজার নির্দেশকে কার্যত উপেক্ষা করে পদ্মাবতী জানিয়ে দেয়, প্রয়োজন মনে করলে সে নিজেই রাজার সঙ্গে দেখা করবে।
এতে ক্ষোভ আরও বাড়ে। পেয়াদাদের পাঠানো হয় বালি পুকুরে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁরা কাউকেই খুঁজে পাননি। পুকুরের ধারে পড়েছিল শুধু একটি শিশুর পায়ের ছাপ। সেই রহস্যের উত্তর অবশ্য মিলেছিল ওই রাতেই। রাজা রামব্রহ্ম রায়চৌধুরীকে স্বপ্নে দেখা দেন পদ্মাবতী। জানান, তিনি কোনো সাধারণ মেয়ে নন, স্বয়ং দেবী দুর্গা। রাজকন্যার বান্ধবী রূপে প্রতিদিন দুপুরে তিনি পুকুরপাড়ে আসেন। এরপর দেবীর নির্দেশেই ১৬৮৫ সালে রায়চৌধুরী বাড়িতে শুরু হয় দুর্গাপুজো। সেই থেকেই বংশ পরম্পরায় চলে আসছে পদ্মাবতীর আরাধনা।
জানা গিয়েছে, বেলুড় মঠে যে রীতিতে পুজো হয়, সেই একই নিয়মে রায়চৌধুরী বাড়িতে পূজিতা হন দেবী দুর্গা। ষষ্ঠীর অনেক আগেই হয় দেবীর বোধন। তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় পুজো। দুর্গা দালানের পাশে একটি ঘরে রয়েছে বেলগাছ। সেই বেলঘরেই রাখা হয় দেবী দুর্গার ঘট। পুজোর চারদিন দেবীমূর্তির পাশাপাশি পুজো করা হয় মূল ঘটকেও। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে রীতি মেনে হয় পাঁঠা বলি। দশমীর দিন ঘট বিসর্জনের সঙ্গে সঙ্গে দেবীর মাথার মুকুট এনে পড়ানো হয় কুলদেবতা মা ব্যাতাইচণ্ডীকে। পরিবারের সদস্য অরুণ রায়চৌধুরী বলেন, ‘রাজা রামব্রহ্ম রায়চৌধুরীর স্বপ্নে আসা পদ্মাবতী প্রতি বছর দেবী দুর্গা রূপে আমাদের বাড়িতে আসেন ও পুজো নেন। এই সময় দেশ-বিদেশে থাকা পরিবারের সদস্যরাও ফিরে আসেন বাড়িতে। চারদিন একসঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠেন সবাই।’ নিজস্ব চিত্র