


নিজস্ব প্রতিনিধি, নন্দীগ্রাম: ভোটের মুখে নন্দীগ্রাম রেল প্রজেক্টের সলিল সমাধি। গত ১৬ফেব্রুয়ারি থেকে কাজ বন্ধ। সারি সারি জেসিবি, ডাম্পার ঠায় দাঁড়িয়ে। বরাচিরা থেকে রঙ্কিনীপুর সহ বিভিন্ন জায়গায় প্রস্তাবিত লাইন বরাবর রাখা ছিল সিমেন্ট, বালি, পাথর, রড। কয়েকদিন ধরে সেইসব নির্মাণ সামগ্রী চুরি হয়ে যাচ্ছিল। শুক্রবার থেকে সিমেন্ট, রড জলের দরে বিক্রি করা হচ্ছে। কারণ, বৃষ্টির জন্য খোলা আকাশের নীচে পড়ে থাকা রড ও সিমেন্ট নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। সেই কারণে ঠিকাদার সংস্থা সেসব বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ঠিকাদার সংস্থার ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিক্যাল স্টাফরা ওই প্রজেক্ট এলাকা ছেড়ে বিহার ও ওড়িশায় তাঁদের অন্য প্রজেক্টে চলে গিয়েছেন। অন্য কর্মীরাও যেযাঁর মতো বাড়ির পথে। স্থানীয়রা বলছেন, এরপর এই প্রজেক্ট বাস্তবায়ন হওয়া কঠিন। যদিও বিজেপির জেলা সাধারণ সম্পাদক মেঘনাদ পাল বলেন, ‘নন্দীগ্রামে রেল প্রকল্প হবেই। জমিদাতাদের বিক্ষোভে কাজ সাময়িক বন্ধ। রেলের পক্ষ থেকে আলোচনা চলছে।’
নন্দীগ্রাম-২ব্লকে বরাচিরা আন্ডারপাসের কাছেই একটি ঠিকাদার সংস্থা সাইট অফিস বানিয়েছিল। শুক্রবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সেই সাইট অফিস থেকে নির্মাণ সামগ্রী বিক্রি করা হচ্ছে। মূলত, রড ও সিমেন্ট বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। ২০২৪সালে নভেম্বর মাস থেকে ওই প্রজেক্টে ডালা সমেত নিজের ট্রাক্টর নিয়ে কাজ করছেন কেন্দামারি গ্রামের প্রশান্ত বারিক। এদিন প্রশান্তবাবু প্রস্তাবিত রেল লাইন বরাবর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সিমেন্ট ও রড গাড়িতে তুলে সাইট অফিসে নিয়ে আসছিলেন। তিনি বলেন, ‘নন্দীগ্রামের বাসিন্দা হিসেবে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু, আজ এই দৃশ্য দেখে আর মনে হচ্ছে না, আগামীদিনে নন্দীগ্রামে রেল লাইন তৈরি হবে।’ বৃহস্পতিবার রঙ্কিনীপুর এলাকা থেকে নাইট গার্ড কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। ওই রাতেই অনেক সিমেন্ট, রড চুরি হয়ে গিয়েছে।
জমির বদলে চাকরি পাওয়া নিয়ে জটিলতা চলছিল। সেটাই নন্দীগ্রামে রেল প্রকল্পের কাজ বন্ধের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। গত ১৬ফেব্রুয়ারি চাকরি না হওয়া জমিদাতাদের একাংশ বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন। তারপর থেকেই কাজ বন্ধ। তিন-চারটি ঠিকাদার সংস্থা এলাকাভিত্তিক ওই কাজ করছিল। বিভিন্ন জায়গায় সাইট অফিস খুলে সেখানে ইঞ্জিনিয়ার, সুপারভাইজার, অন্য কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অন্য লেবাররাও দলবেঁধে কাজ করছিলেন। কিন্তু, কাজ বন্ধ হওয়ার পর একাধিক সংস্থা তাদের ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিক্যাল স্টাফদের বিহার ও ওড়িশায় নিয়ে চলে গিয়েছে। বরাচিরায় রেলের সাইট অফিসের স্টোর কিপার সৌমেন মাইতি বলেন, ‘বেশ কয়েকজন হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী ওই লাইনে কাজের জন্য সামগ্রী ঠিকাদার সংস্থাকে বিক্রি করেছিলেন। এখন তাঁদেরকেই সিমেন্ট, রড বিক্রি করা হচ্ছে। বাজকুল থেকে নন্দীগ্রাম পর্যন্ত সাড়ে ১৮কিলোমিটার রেল লাইন তৈরির জন্য ২০১০সালে বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী থাকাকালীন জমির দামেরঅনুপাতে জমিদাতাদের পরিবারপিছু একজনকে রেলে চাকরি দেওয়া হবে বলেও ঘোষণা করেছিলেন। প্রথম কয়েক ধাপে ৪৪৪জনকে চাকরি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে চাকরি প্রাপকের সংখ্যা আরও বাড়ে। কিন্তু, বেশ কয়েকজন এখনও পাননি। তাছাড়া, জমির মালিকানা ভাগাভাগি হওয়ায় দাবিদারের সংখ্যাও অনেক বেড়ে গিয়েছে। এরকম অবস্থায় দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকার পর পুনরায় চালু হয়েছিল। কিন্তু, সেই চাকরি ইস্যুতেই জমিদাতাদের বিক্ষোভ শুরু হয়। হরিপুর গ্রামের বিদ্যাবতী ভুঁইয়া, শ্রীগৌরী গ্রামের সুধীরচন্দ্র দাস, হরিপুর থেকে ঝর্ণা অগস্তি প্রমুখ বলেন, ‘আমরা রেললাইনের জমিদাতা। কিন্তু, ঘোষণা মতো চাকরি হয়নি। আমরা চাই, রেল কর্তৃপক্ষ চাকরি নিশ্চয়তা করুক। পাশাপাশি রেলের কাজও শুরু হোক।’ কাজ বন্ধ। নন্দীগ্রাম রেল প্রজেক্টের নির্মাণ সামগ্রী পড়ে রয়েছে। -নিজস্ব চিত্র