ভোগে থাকে বুনো ওল, লাল ডাঁটা, কচুশাক, নলহাটির বাউটিয়ায় দুই বোনের পুজো ৫০০ বছরের ঐতিহ্য মেনে
  • ১০ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট: আকাশজুড়ে শরতের মেঘ আর কাশের দোলা জানান দেয় দেবীপক্ষের আগমন। বর্তমান যুগের থিম পুজোর জাঁকজমক ও কৃত্রিম আলোর রোশনাইকে দূরে সরিয়ে রেখে নিজস্ব প্রাচীন ঐতিহ্য ও রীতিকে আঁকড়ে আজও জাগ্রত নলহাটির বাউটিয়া গ্রামের দুই বোনের দুর্গাপুজো। ‘বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত’ পঞ্জিকা মতে আয়োজিত এই পুজো কেবল বাউটিয়া গ্রামই নয়, সংলগ্ন প্রায় ৫০টিরও বেশি গ্রামের মানুষের কাছে অন্যতম প্রধান আবেগ ও আকর্ষণ।

Advertisement

বাউটিয়া গ্রামের এই প্রাচীন পুজোর মূল কেন্দ্রবিন্দু ওঝা পরিবারের ‘বড় বোন’ এবং চট্টোপাধ্যায় পরিবারের ‘ছোট বোন’ সিংহবাহিনী। এই দুই পুজোর আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ ও অভিনব হল ছোট বোন অর্থাৎ সিংহবাহিনীর ভোগের বৈচিত্র্য।
চট্টোপাধ্যায় পরিবারের ছোট বোনের পুজোয় সপ্তমীর দিনের ভোগে এক বিশেষ লোকায়ত প্রথা মেনে চলা হয়। সাধারণ জাঁকজমকপূর্ণ রাজভোগের পরিবর্তে মাকে নিবেদন করা হয় গ্রামের ঐতিহ্যবাহী পদ-  বুনো ওল, লাল ডাঁটা এবং কচুর শাক। স্থানীয় প্রথা অনুযায়ী, সপ্তমীর অন্নভোগে এই পদগুলি থাকা বাধ্যতামূলক। পুজোর পর এই প্রসাদ সাধারণ পুণ্যার্থীদের মধ্যে সানন্দে বিতরণ করা হয়। অষ্টমীর দিন মাকে নিবেদন করা হয় ক্ষীর, লুচি ও ফল। নবমীর দিন এখানে ছাগ বলির পাশাপাশি আখ ও চালকুমড়ো বলি দেওয়ার রীতি রয়েছে। দেবীর মূর্তিতেও রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। এখানে সন্তান সন্ততিদের ছাড়াই দেবী কেবল সিংহ ও অসুরকে সঙ্গে নিয়ে একাকী অবস্থান করেন। আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছর আগে রাইজিবাবু নামে এক ব্যক্তি চট্টোপাধ্যায় পরিবারের হাতে এই পুজোর দায়িত্ব তুলে দিয়ে যান।
অন্যদিকে, ওঝা পরিবারের ‘বড় বোন’ দশভুজা মূর্তিতে সন্তান সহ বাপের বাড়িতে পদার্পণ করেন। প্রায় ৫০০ বছর আগে স্বপ্নাদেশ পেয়ে তালু ওঝা মাটির মন্দির করে দেবী দুর্গার পুজোর সূচনা করেছিলেন। প্রায় ১১৫ বছর সেখানেই পাকা মন্দিরে চিরাচরিত একচালার ডাকের সাজে দেবী পূজিতা হন। সপ্তমী পুজোয় মাকে সাতরকম ভাজা, তরকারি, মিষ্টি ও পায়েস নিবেদন করা হয়। ওঝা পরিবারের সদস্য তথা বীরভূম বিজেপির জেলা কমিটির সদস্য বিপ্লব ওঝা জানান, পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শোনা, তখন আমাদের আর্থিক অবস্থা ভাল চলছিল না। মা স্বপ্নাদেশ দিয়ে পুজো করার আদেশ দিলেও কীভাবে সেই পুজো হবে তাও বলেছেন মা। দূর অতীত থেকে চলে আসা স্বপ্নাদিষ্ট এক বিশেষ ঔষধি এখনও ওঝা পরিবার নিরাময়ের উদ্দেশ্যে বিতরণ করে আসছে, যার প্রতি মানুষের অগাধ আস্থা।
বিজয়া দশমীর রাতে দুই বোনকে আলাদাভাবে নৌকার বাইচে চড়িয়ে সমগ্র গ্রাম প্রদক্ষিণ করানো হয়। গ্রামবাসীর আবেগ ও জয়ধ্বনির মধ্য দিয়ে তীরপিতা নদীতে প্রতিমা নিরঞ্জনের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে। এবছর পুজো পাঁচদিন হলেও বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে এখানে চারদিনের পুজো হবে। সর্বজনীন পুজোর ভিড়েও বাউটিয়ার এই দুই বোনের পুজো আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল। • নিজস্ব চিত্র