তন্ময় মল্লিক: গোটা দেশ যখন জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার, তখন বিজেপি তাঁকে আড়াল করতে মরিয়া। বিরোধীদের ও সুপ্রিম কোর্টের প্রশ্নের মুখে জর্জরিত মুখ্য নির্বাচন কমিশনার যখন চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করছেন তখন তাঁর হয়ে ব্যাট হাঁকাচ্ছে গেরুয়া শিবির। বিজেপির তাবড় তাবড় নেতা জ্ঞানেশ কুমারকে পুরস্কৃত করার দাবি করে বসেছেন। তাঁদের বক্তব্য, বাংলায় নির্বাচন হয়েছে রক্তপাতহীন। তাই তাঁকে পদ্মভূষণে ভূষিত করা উচিত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নিরপেক্ষ, স্বশাসিত, সাংবিধানিক শক্তিতে বলীয়ান প্রতিষ্ঠানের প্রধানের কৃতকর্মের দায় বিজেপি ঘাড়ে নিচ্ছে কেন? নিয়োগকর্তার দায়বদ্ধতা, নাকি ঝুলি থেকে বেড়াল বেরিয়ে পড়ার ভয়!
বিহারের বিধানসভা ভোটের সময় থেকেই নির্বাচন কমিশনের কাজ নিয়ে অভিযোগ উঠছিল। বাংলাতেও নির্বাচনের মুখে শুরু হয়েছিল এসআইআর। এসআইআর দ্রুত শেষ না করলে রাষ্ট্রপতি শাসনে ভোট হবে। এই ভয় দেখিয়ে লক্ষ লক্ষ ভোটারকে ‘সন্দেহজনক’ দাগিয়ে তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলা হয়। তাতেই কমিশনের বিরুদ্ধে উঠেছিল রাজনৈতিক অভিসন্ধির অভিযোগ।
এসআইআর পর্বে শুধু ভোটারের নাম বাদ নিয়েই নয়, ৬ নম্বর ফর্ম নিয়েও বিস্তর অভিযোগ ছিল। সুপ্রিম কোর্টের মহামান্য বিচারপতিরা নির্বাচন কমিশনকে দফায় দফায় সতর্কও করেছিলেন। তাতেও ‘প্রভুভক্ত’ জ্ঞানেশ কুমারকে থামানো যায়নি। রক্ষাকবচের বরাভয়ে তিনি এতটাই বেপরোয়া ছিলেন যে দুই সহযোগী নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি শোনার প্রয়োজন মনে করেননি। সংবাদপত্রে সেই সব ফাঁস হতেই জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে আন্দোলন। চলছে আইনি লড়াই।
সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে পড়েছেন জ্ঞানেশ কুমার। এই পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টকে ‘ঢাল’ করে বাঁচার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু, দেশের সর্বোচ্চ আদালত জানিয়ে দিয়েছে, ‘৬ নম্বর ফর্ম সংশোধন বা পরিবর্তনের ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্ট কোনো অনুমতি দেয়নি।’ তার মানে আদালতের নাম নিয়ে মিথ্যাচার!
কথায় আছে, ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম।’ বিপাকে পড়লে মানুষ আগে নিজে বাঁচার চেষ্টা করে। আপনজনকেও ভুলে যায়। অথচ বিজেপি জ্ঞানেশ কুমারকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। কিন্তু, কেন?
বিজেপির দাবি, ‘আইন মেনেই কাজ করেছেন জ্ঞানেশ কুমার।’ তিনি আইন মেনে কাজ করলে ভয় পাওয়ার কী আছে? সংবিধান তাঁকে প্রচুর ক্ষমতা দিয়েছে। তার চেয়েও বেশি দিয়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। ২০২৩ সালে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন সংশোধন করে তাঁর ক্ষমতা ও সুরক্ষা অসীম উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসাবে নেওয়া সিদ্ধান্তের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ করা যাবে না। এমনকি, অবসর গ্রহণের পরেও নয়। এমন সুরক্ষা সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিরাও পান না।
নরেন্দ্র মোদি সরকারের এই ‘রক্ষাকবচ’কে জ্ঞানেশ কুমার ‘ফ্রি হিট’ বলে ধরে নিয়েছেন। তাই ‘প্রভু’কে সন্তুষ্ট করতে চোখ বুজে ব্যাট হাঁকিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জানেন, উইকেট গার্ড করে থাকা প্যাডে বল লাগলেও আম্পায়ার এলবিডব্লু দিতে পারবে না। ক্যাচ আউট তো দূরের কথা, মিডল স্ট্যাম্প ছিটকে গেলেও তিনি নট আউটই থাকবেন। কিন্তু, ‘ফ্রি হিটে’ও আউট আছে। রান আউট। প্যাডে লেগে গড়াতে গড়াতে যাওয়া বল থেকে বড়ো জোর এক রান নেওয়া যায়। কিন্তু, জ্ঞানেশ কুমার লুকিয়ে তিন রান নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাই পড়েছেন রান আউটের চক্করে। মাঠের দুই আম্পায়ারই আঙুল তুলে দিয়েছেন। ‘ক্যাপ্টেন’ সবুজ সংকেত না দেওয়ায় মাঠে থাকলেও জ্ঞানেশ কুমারের ভাগ্য ঝুলছে সরু সুতোয়। ‘থার্ড আম্পায়ার’ আঙুল তুললেই যেতে হবে মাঠের বাইরে।
এসআইআর পর্বে নির্বাচন কমিশনের কাজ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট নানান মন্তব্য করেছিল। সেই সব মন্তব্য থেকে অনেকের মনে হয়েছিল, আদালত যেভাবে নজরদারি চালাচ্ছে তাতে কমিশন লক্ষ লক্ষ ভোটারকে বাদ দিয়ে ভোট করাতে পারবে না। সুপ্রিম কোর্ট প্রত্যেক নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিত করবে। সেই আশাতেই কেউ নাকে অক্সিজেনের নল, কেউ হাতে স্যালাইনের সুচ নিয়ে ভোটার হওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু, ট্রাইবুনালে আবেদনকারী ৩০ লক্ষেরও বেশি ভোটারকে বাদ দিয়েই বাংলায় নির্বাচন করিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার। তাতে সুপ্রিম কোর্টের ভরসায় যাঁরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন তাঁরা হতাশ হয়েছেন।
জ্ঞানেশ কুমারের কৃতকর্মের খেসারত এখনও তালিকার বাইরে থাকা ভোটারদের গুনতে হচ্ছে। তাঁরা শুধু ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকেই বঞ্চিত হননি, সরকারি সুযোগ সুবিধাও পাচ্ছেন না। ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় বাংলার বহু মা, বোন অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা ও রেশন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কারণ নির্বাচন কমিশন তাঁদের এই দেশের নাগরিক বলে মানতেই চাইছে না। ৬ নম্বর ফর্ম সংশোধন, নির্বাচন কমিশনারের রক্ষাকবচ ইস্যুতে আদালতের মন্তব্য আন্দোলনকারীদের উৎসাহিত করতেই পারে, কিন্তু আসল হল আদালতের রায়। এসআইআর পর্বে আদালতের সওয়াল-জবাব আমাদের এই শিক্ষাই দিয়েছে।
খুন মানেই সব শেষ। মৃতকে বাঁচানো যায় না। তখন খুনির চরম শাস্তিই হয় মৃতের পরিবারের অন্যতম প্রধান দাবি। সন্তানহারা মাকেও বলতে শোনা যায়, ‘দোষীর চরম শাস্তি চাই। এই পরিণতি আর কোনো মায়ের যেন না হয়।’ বিরোধীদের অভিযোগ, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার গণতন্ত্রকে খুন করেছেন। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার টুঁটি টিপে ধরেছেন। তাঁকে চেয়ারে রেখে নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচন করা সম্ভব নয়। তাই তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য তিনজনের যে কমিটি আছে, তারমধ্যে দু’জনই কেন্দ্রীয় সরকারের মাথা। একজন প্রধানমন্ত্রী, অন্যজন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আর আছেন বিরোধী দলের নেতা। ফলে বিতর্ক তৈরি হলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকারি দলের সিদ্ধান্তই বহাল থাকে। এক্ষেত্রেও সেটাই ঘটবে। কারণ যে গাছ নিজেরা বসিয়ে রক্ষাকবচের বেড়ায় বড়ো করছেন তাকে কিছুতেই কাটতে চাইবেন না। তাই জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর একটাই পথ। আন্দোলন। সেই লক্ষ্যেই চলছে লড়াই। বেড়ালকে গাছে উঠতে বাধ্য করার জন্য আন্দোলনে নেমেছে ‘আরশোলার দল’। চাপে পড়লে বেড়াল যে গাছে ওঠে, সেটা ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার ঘটনায় প্রমাণ হয়েছে। বেড়ালকে গাছে ওঠানোর কৌশলটা জেন-জি’র জানা। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই শুরু হয়েছে, ‘জ্ঞানেশ হটাও দেশ বাঁচাও’ আন্দোলন।
ফাইনাল ম্যাচ হবে ২০২৯ সালে। তার আগে বিজেপিকে উত্তরপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের মতো কয়েকটা কঠিন ম্যাচ খেলতে হবে। পরিস্থিতি যা তাতে ১১জন খেলোয়াড় নিয়ে ম্যাচ জেতা অসম্ভব। তাই ১২তম প্লেয়ার হিসাবে আম্পায়ারকে দরকার। আর ‘আম্পায়ার’ হিসাবে জ্ঞানেশ কুমারের সমকক্ষ যে কেউ নেই, সেটা পরীক্ষিত সত্য।
ঘুরপথে যারা কাজ হাসিল করতে চায় তাদের কাছে দক্ষতার চেয়ে আনুগত্যের মূল্য অনেক বেশি। কারণ নির্দেশ পালনে দক্ষদের থেকে ‘জো হুজুর’রা এগিয়ে থাকে অনেকটা। এই ফরমুলাতেই বাংলার নির্বাচনে এসেছে ‘সাকসেস’। দক্ষতা যাঁদের কম তাঁরা বিনা বাক্যব্যয়ে নির্দেশ পালন করেন। সেই উদ্দেশ্যেই ছাব্বিশের ভোটে বেশিরভাগ দক্ষ অফিসারকে ‘গ্যারেজ’ করে কম দক্ষ বহু অফিসারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচনের আগেই এই অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু, কেউ আমল দেয়নি। তবে, এখন গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ দুই সহযোগী নির্বাচন কমিশনারই এই সমস্ত বিষয় নিয়ে জ্ঞানেশ কুমারের দিকে আঙুল তুলেছেন। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য বিজেপি যেভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের হয়ে ব্যাটিং শুরু করেছে, তা এককথায় অভাবনীয়।
দেশের কোটি কোটি মানুষ জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জানালেও তাঁকেই পুরষ্কৃত করার দাবি জানাচ্ছেন শমীক ভট্টাচার্যরা। সেই দাবির পিছনে একটাই যুক্তি, বাংলার ভোটে ঝরেনি রক্ত। শমীকবাবু, আপনারা জ্ঞানেশ কুমারকে পুরস্কার দিতেই পারেন। কিন্তু ভুলে যাবেন না, গোটা দেশে ১৩ কোটি, আর বাংলায় লক্ষ লক্ষ নাগরিকের নাম এসআইআর পর্বে বাদ দেওয়া হয়েছে। ভোটাররাই ‘ডেমোক্র্যাটিক সিস্টেমে’র রক্ত। সেই ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ গেলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটাই রক্তশূন্য হয়ে যায়। আর বাংলায় সেটাই হয়েছে। তাই রক্ত ঝরবে কী করে? মৃতদেহের যেমন মৃত্যুভয় থাকে না, তেমনই রক্তহীন শরীর থেকেও ঝরে না রক্ত।


