সমৃদ্ধ দত্ত: ভূমিকা যেন উলটে গেল। দীর্ঘকাল ধরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের অঘোষিতভাবে রাজনৈতিক শাখার নাম ছিল ভারতীয় জনতা পার্টি। সংঘের নীতি, আদর্শ এবং লক্ষ্যকে বুকে নিয়েই বিজেপির অগ্রগমন ছিল। সংঘের নির্দেশ ছিল সর্বোচ্চ। ১৯৮০ সালে ভারতীয় জনতা পার্টির দুই প্রধান প্রতিষ্ঠাতা লালকৃষ্ণ আদবানি এবং অটলবিহারী বাজপেয়ি দুজনেই প্রত্যক্ষভাবে সংঘ থেকেই উঠে এসেছেন। পরবর্তীকালেও যত প্রথম সারির নেতা বিজেপির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, তাঁদের রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত হয়েছে আরএসএসের হাত ধরেই। সরকার গঠন বিজেপি করলেও সংঘই সেই সরকারের দিশানির্দেশের নেপথ্যে। কিন্তু এই পরিস্থিতি আমূল বদলে গেল। বিজেপি নেতা, বিধায়ক অথবা সরকারের মন্ত্রী কিংবা পাড়ায় পাড়ায় বিজেপির নামে যাদের দেখা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে সংঘের নীতি নৈতিকতার কোনো ছাপ নেই। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ মুখে যা যা উচ্চমার্গীয় কথা বলে, তার কোনোরকম প্রতিফলন কি প্রকাশ্যে তাদের রাজনৈতিক শাখার নেতা-কর্মী-মন্ত্রীদের বাক্য ব্যবহারে দেখা যায়? বিজেপি অনেকটাই পুরানো ভাবমূর্তি হারিয়েছে। আর তার থেকেও বেশি ইমেজ নষ্ট হয়েছে সংঘের।
বিগত ১২ বছরে নরেন্দ্র মোদির প্রবল জনপ্রিয়তা, নির্বাচনি সাফল্য এবং অমিত শাহের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের রীতিনীতি সবথেকে বেশি যাকে গুরুত্বহীন করেছে, সেটি হল রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ। অত্যন্ত সুকৌশলে সংঘের প্রভাব থেকে দলকে বাইরে নিয়ে এসে এখন বিজেপি স্বশাসিত পরিষদে পর্যবসিত হয়েছে। সংঘের কাজ এখন মাঝেমধ্যে বিভিন্ন মঞ্চ, সমাবেশ, সভা ও সম্মেলনে বিভিন্ন নীতি ও আদর্শমূলক বার্তা প্রদান করা। যা বিজেপির সিংহভাগ নেতাকর্মীরাই পালন করেন না।
সামাজিক ও ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে প্রশ্ন উত্থাপিত হতেই পারে যে, সংঘের এই ক্রম অবক্ষয়ের কারণ কী? সম্পূর্ণ অসংস্কৃতিসম্পন্ন, অপরিশীলিত একটি বিশেষ শ্রেণি, অশিক্ষা ও আগ্রাসনের রাজনীতি করছে বিজেপির পতাকাতলে, যাদের সঙ্গে বিজেপি বা সংঘের নীতির মিল নেই। এটা সংঘ কি দেখতে পায় না? সেটিকে দমন করার এখন আর ক্ষমতা নেই ।
অন্য দলকে লাগাতার রাজ্যে রাজ্যে অনৈতিক উপায়ে ভেঙে দেওয়া। আজ যে দুর্নীতিগ্রস্ত, কাল তাকেই দলে টেনে নিয়ে সব অপরাধ থেকে মুক্তি দেওয়া। সংঘের নীতি আদর্শের সঙ্গে যাদের কোনো সম্পর্কই নেই বরং বিপরীত, তাদের অনায়াসে দলে নিয়ে উচ্চপদে আসীন করা ইত্যাদি ঘটনা চোখের সামনে ঘটে চলেছে সংঘের সাম্প্রতিক অতীতে।
আজ বিজেপির অন্দরে কেন্দ্র ও রাজ্যস্তরে বহু বছর ধরে অন্য রাজনীতি করা নেতানেত্রীর রমরমা। অন্য দল থেকে এসে নেতা, মন্ত্রী তো বটেই, এমনকি মুখ্যমন্ত্রীও হওয়া যায় বিজেপিতে। এই প্রবণতায় আরএসএসের কি সম্পূর্ণ সমর্থন প্রথম থেকেই আছে? পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের বিদ্রোহী দুই অংশ, এমপি এবং বিধায়কদের দুই গোষ্ঠী, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে বিজেপি বিগত ১৫ বছর ধরেই দুর্নীতির অভিযোগ করেছে। এবার ভোটের আগে প্রকাশ্যে বিজেপি প্রচার করেছিল যে, এই প্রত্যেকের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার হবে। কিন্তু এখন সেরকম কোনো উদ্যোগ অথবা লক্ষণ নেই। বরং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সঙ্গে ব্রেকফাস্ট করছেন।
সংঘ বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে কঠোর বার্তা দিতে পারেনি যে, তোমরা স্পষ্ট করে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে দাও যে, কোনো নীতিহীন, দুর্নীতিগ্রস্তদের সংঘের আদর্শে চলা দলে জায়গা হবে না। কাউকে আইনগতভাবে বাঁচানোও হবে না। সংঘ কিন্তু এরকম কোনো কঠোর নির্দেশ দেয়নি। তাই অন্য দল ভেঙে যারা বেরিয়ে এসেছে, তাদের নীতি ও মূল্যবোধহীনতাকে পরোক্ষে মদত ও প্রশ্রয় দিতে রাজনৈতিক একটি সুবিধা পাওয়ার চেষ্টাকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে বিজেপি। অথচ এর ফলে যে ক্ষতি হচ্ছে, সেটি হল, দল ও সংঘের ভাবমূর্তি খারাপ হচ্ছে।
কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার কোনোদিন অনৈতিক ও মূল্যবোধহীনতাকে প্রশ্রয় দেননি। স্বদেশি চেতনার অগ্নিশিখা তাঁর অন্তরে প্রজ্বলিত করেছিল কলকাতা নামক একটি শহর। অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর সমিতির কার্যকলাপে তিনি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তারও আগে কলকাতার স্বদেশচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি স্কুলে ব্রিটিশ পরিদর্শক আসার সময় প্রকাশ্যে বন্দেমাতরম স্লোগান দিয়েছিলেন। ক্ষমা চাইতে বলা হলেও তিনি ক্ষমা চাননি। কলকাতায় এসেছিলেন ডাক্তারি পড়াশোনা করতে। পরবর্তীকালে কংগ্রেসের একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে জেলেও যান। সেখানেই জানতে পারেন গান্ধীজি হঠাৎ সেই আন্দেলেনের ইতি টেনেছেন। প্রবল ক্ষুব্ধ হন তিনি। নতুন পথের সন্ধান করেন। বিনায়ক দামোদর সাভারকরের লেখা হিন্দুত্ব সংক্রান্ত একটি বই তাঁর ভাবনাকে বদলে দেয়। ১৯২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নাগপুরে গঠন করেন একটি সংগঠন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ। ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতির বিশুদ্ধ প্রশিক্ষণ প্রদান লক্ষ্য।
এই যে বিরোধীদের লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া, জুতোর মালা পরিয়ে ঘোরানো, সর্বদাই ক্ষমতার আস্ফালনে হুমকি, হুঁশিয়ারির সুরে কথা বলা, রাতের অন্ধকারে বিরোধীদের উপর আক্রমণ, মারধর, এসবের কোনটা কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের প্রদর্শিত নীতি ও আদর্শের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ? গেরুয়া উত্তরীয় গলায় ধারণ করে যে হুমকি হুঁশিয়ারি বাইক মিছিল করে ত্রাস সৃষ্টি করা হয়, সেটি দেখলে কি হেডগেওয়ার অথবা দীনদয়াল উপাধ্যায় খুশি হতেন? প্রশ্ন উঠছে, এসব চোখের সামনে ঘটছে। অথচ সংঘ কোনো কঠোরতম নির্দেশ ও বার্তা দিচ্ছে না। যদি দিত, তাহলে পরদিন থেকেই এইসব বন্ধ হয়ে যেত। আর সম্পূর্ণ অসামাজিক শ্রেণিকে বিজেপি কোনোভাবেই বরদাস্ত করত না।
কে কেমন খাবার খাবে, কেমন পোশাক পরবে, কোথায় যাবে, কোন বই ভালো, কোন বই খারাপ এসব নিয়ে নীতি পুলিশ হওয়ার অধিকার কিছু মানুষকে পাড়ায় পাড়ায় কে দিয়েছে? রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের সম্পর্কে বলা হয়, তারা সনাতনী ভারতবর্ষীয় সমাজ নির্মাণের কাজে নিয়োজিত গত ১০০ বছর। তাই যদি হয়, তাহলে, এখনও আমাদের আশপাশে আদর্শ সমাজ গঠন করা গেল না কেন? অসহিষ্ণু, হিংসাত্মক, আগ্রাসী, উচ্চকণ্ঠে একে অন্যকে ধমক, সৌজন্যহীন সামাজিক দৃশ্য, ধর্মকে ডিজে বাজানোর প্রতিযোগিতায় পর্যবসিত করা, ভিন্নধর্মীদের অভারতীয় আখ্যা দেওয়া এসব ক্রমবর্ধমান প্রবণতা কেন? তার অর্থ কি এই নয় যে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করছে না তাদেরই রাজনৈতিক শাখার শাসনে চলা রাজ্য অথবা কেন্দ্র?
দল ক্ষমতায় আরোহণ করলে সেই ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার জন্য দলে দলে মৌমাছির মতো পরজীবী রাজনৈতিক পেশাদাররা ছুটে আসে শাসক দলের কাছে। কেউ নেতা। কেউ কর্মী। প্রত্যেকটি দলের প্রধান পরীক্ষা হল বাছাই করা। যাচাই করা। কঠোরভাবে বাঁধ নির্মাণ করা। সেটা পালন করা কঠিন। কিন্তু বিজেপি যে পারবে না, এটা কল্পনা করা যায়নি।
১২ বছর ধরে বিজেপি যে রাজনীতির আমদানি করেছে, সেটির মূল লক্ষ্য হল যেনতেনপ্রকারে ক্ষমতা দখল করা। আর তারপর সরকার টিকিয়ে রাখতে সবরকম আপস করা। এই দুই লক্ষ্যকে সামনে রেখে মানুষের আবেগকে নিয়ে বহু সময় ছিনিমিনি খেলা হয়েছে। দুর্নীতির সঙ্গে আপস। অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া। নীতিহীন শাসনব্যবস্থায় মদত দেওয়া। বিরোধীদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা না করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা দিয়ে জেলে পাঠানো। এমনকি গণতন্ত্রের সবথেকে শক্তিশালী অধিকার ভোটদানকেও সন্দেহের বাতাবরণে ঘিরে ফেলা।
সমাজে আজও সন্তানের কোনো অন্যায়, অপরাধ, নীতিহীনতার জন্য প্রথমেই সিংহভাগ মানুষ পিতামাতাকে দোষারোপ করে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ কিন্তু বিজেপির অভিভাবক। সেরকমই ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে ১৯৮০ সালের পর থেকে। সুতরাং বিজেপির কৃতিত্ব ও সাফল্য যদি সংঘের শিক্ষার উপর বর্তায়, তাহলে ব্যর্থতার দায়ও সংঘকেই নিতে হবে। কিন্তু বর্তমানে বহু বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে সংঘকে আর বিজেপির একাংশ ভয় পায় না। অন্যায় করলে সংঘ বরদাস্ত করবে না, এই আশঙ্কা আর যেন নেই। সংঘের সঙ্গে সম্পর্কই নেই লক্ষ লক্ষ বিজেপির নেতা, কর্মী, মন্ত্রীর। তাঁরা জানেন বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্বই শেষ কথা। সংঘের গুরুত্ব নেই তাঁদের কাছে। এমনকি এটাও স্পষ্ট যে, বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্বেব মধ্যেও স্বাধীন, একক সিদ্ধান্তগ্রহণের মনোভাব স্পষ্ট। সংঘকে জবাবদিহি দেওয়ার কোনো দায় যেন নেই তাঁদের।
সংঘের রাজনৈতিক শাখা বিজেপি ছিল। সংঘের প্রভাব ছিল। এখন সংঘ বিজেপিকে ভোটে জেতানোর একটি শাখায় পরিণত হয়েছে। সংঘের প্রচুর শাখা চালু হচ্ছে, ভবন নির্মাণ হচ্ছে, প্রভাব বাড়ছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শুধুই হিন্দুত্ব প্রচার কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের লক্ষ্য ছিল না। কোনো একটি রাজনৈতিক দলকে জেতানোই একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল না। বিশুদ্ধ ভারতীয় সমাজ গঠন ছিল তাঁর স্বপ্ন। সংঘ সেই পথে কি হাঁটছে? তাহলে দলে এত অবক্ষয় কেন?