কেন চেয়ে আছ গো মা
  • ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

চারদিনের জন্য মর্ত্যে এসেছেন উমা। কোনো বাড়িতে তাঁর আহারের ব্যবস্থা হয়েছে। কোথাও তিনি যাবেন গয়না পরতে। কোথাও আবার নাচ দেখতে যাবেন মা। এমন হরেক বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে। এই প্রথার প্রচলন সেই অতীতে। আজও তা পালন করা হয়।

Advertisement

আনন্দিনী উমা আজও এল না তার মায়ের কাছে/
হে গিরিরাজ দেখে এসো কৈলাসে 
মা কেমন আছে/ 
মোর মা যে প্রতি আশ্বিন মাসে/ 
মা মা বলে ছুট আসে/
মা আসেনি বলে আজও ফুল ফোটেনি 
লতায় গাছে...
আগমনি গানের করুণ সুরটা করুণতর হয়ে হাহাকারের মতো ছড়িয়ে পড়ছে ভাগীরথীর বুকে। একটা সময়ে প্রবল হাওয়ার শন শন শব্দে ঢাকা পড়ে যায় গানের কথা। শুধু সুরের রেশটা গুমরে গুমরে কেঁদে বেড়ায় চারদিকে। তার সঙ্গে সংগত করে চলে ঝুপ, ঝুপ, ঝুপ... একটানা শব্দ। 
মা এসেছে, আনন্দিনী উমা মা! খবরের কাগজ, টিভি চ্যানেল, সোশ্যাল মিডিয়া মায়ের আগমন বার্তায় ছেয়ে গিয়েছে। আড্ডায় আলোচনা, এবার প্ল্যান কী? অষ্টমীতে বাগবাজারে অঞ্জলি দিয়ে সোজা শোভাবাজার রাজবাড়ি। সন্ধেয় ম্যাডক্স স্কোয়ারে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, না হলে বান্ধবীকে নিয়ে সময় কাটানো। এবার কী কী কেনা হল? ঢাকাই জামদানি, মসলিন, তসরের শাড়ি, আশির দশকের ফ্যাশনের রি-এন্ট্রি। কোনটা কবে পরা হবে তার আলোচনা চলছে জোরদার। আনন্দের উৎসব দুর্গাপুজো। খাওয়া দাওয়া, ফুর্তি, ঘোরাফেরা, জলসা কিছুই বাদ পড়ে না চারদিনে। কলকাতা যেন এক ‘এল ডোরাডো’ হয়ে ওঠে। 
এই স্ফূর্তি, এই জৌলুস, উন্মাদনার শুরু তো আজ নয়, সেই ১৭৫৭ সাল থেকে। সিরাজদৌল্লাকে যুদ্ধে পরাস্ত করে ক্লাইভ ঠিক করলেন একটা সেলিব্রেশন করতে হয়। কিন্তু তখনকার একমাত্র চার্চটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। কোথায় হবে সেলিব্রেশন? এগিয়ে এলেন রাজা নবকৃষ্ণ দেব বাহাদুর। তিনিই করবেন সেলিব্রেশনের আয়োজন। সামনেই দুর্গাপুজো। সেই দুর্গাপুজোই হয়ে উঠবে সেলিব্রেশনের মঞ্চ। সিরাজদৌল্লার সঙ্গে যুদ্ধের সময়ে অন্যদের সঙ্গে নবকৃষ্ণ দেবও ইংরেজদের সাহায্য করেছিলেন। তারই প্রতিদান হিসেবে ক্লাইভ সিরাজদৌল্লার সিন্দুক উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন তাঁদের জন্য। তারই কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এই সেলিব্রেশন। নবকৃষ্ণ দেবের দুর্গাপুজোয় আমন্ত্রিত হয়েছিলেন ক্লাইভ, ওয়ারেন হেস্টিংস সহ ইংরেজ রাজপুরুষরা। উইলসন হোটেল থেকে এসেছিল ইংরেজদের জন্য খাদ্যদ্রব্য, সুরা। বসেছিল বাই নাচের আসর। নিন্দুকেরা বলেন, ইংরেজদের জন্য আনা খানাপিনার মধ্যে ছিল বিফ, হ্যামও। নাচের জন্য যে বাইদের আনা হয়েছিল তাঁরা ছিলেন মুসলিম। ক্লাইভের সংস্কৃত শিক্ষক ভাটপাড়ার পণ্ডিত জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন এসবে কোনো দোষ দেখেননি। মূলত তাঁর হাতযশেই বাংলার সমাজপতিরা এসব নিয়ে টু শব্দটি করেনি। জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন মোটা টাকা পেনশন পেতেন ক্লাইভের থেকে (সূত্র: অবন্তিকুমার স্যান্ন্যালের লেখা বই ‘বাবু’)। পরে ১৭৬৬ সালে হেস্টিংস নবকৃষ্ণকে ‘মহারাজা’ খেতাব দেন। কলকাতা অবাক বিস্ময়ে দেখেছিল সেই ‘মোচ্ছব’। সেই শুরু, একদিকে বিলাস, বৈভব আর অন্যদিকে দারিদ্র্য, অনাহার। নবকৃষ্ণ দেবের পর একে একে অন্য বড়োলোকরাও তাঁদের বাড়িতে দুর্গাপুজো শুরু করেন জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে। ১৮৪০ সালে জোড়াসাঁকোর দাঁ বাড়িতে শুরু হয় দুর্গাপুজো। সেখানে মা দুর্গাকে সাজাতে বিদেশ থেকে সোনাদানার গয়না ও সাজসজ্জা আসত। মায়ের চালচিত্র সাজাতে জার্মানি থেকে আসত তামা ও পিতলের চুমকি। ইউরোপের অন্য দেশ থেকে আসত মায়ের সোনার গয়না, পিতলের অস্ত্রশস্ত্র, কলা বউ স্নান করানোর জন্য মণিমুক্তো খচিত ছাতা ইত্যাদি। ওই বছরই কুমোরটুলির অভয়চরণ মিত্রের বাড়িতে শুরু হয় দুর্গাপুজো। এঁদের দুর্গাপুজোর খ্যাতি ছিল খাওয়া দাওয়ার এলাহি আয়োজনের জন্য। দেবীর ভোগের জন্য একশো রকমের পদ রান্না হত। রাধাবল্লভী, জিলিপি, গজা, নিমকি, লুচি, নানারকম মিষ্টি ইত্যাদি। একেকটা জিলিপির সাইজ হতো রথের চাকার মতো। তবে এঁদের বাড়িতে অন্নভোগ দেওয়ার রীতি ছিল না। নৈবেদ্যয় প্রায় এক কুইন্টাল চাল দেওয়া হত। 
সে সময়ে বলা হত, মা দুর্গা শোভাবাজারের রাজবাড়িতে যান নাচ দেখতে, জোড়াসাঁকোর দাঁ বাড়িতে যান গয়না পরতে আর কুমোরটুলির মিত্র বাড়িতে যান আহার করতে। এই বৈভব, জৌলুসে ছেদ পড়েনি ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময়েও। জাঁকজমক সহকারেই বনেদি বাড়ির পুজোগুলি হয়েছিল বলে জানা যায়। 
আজ যখন শপিং মল থেকে শুরু করে বিভিন্ন দোকানপাটে সুবেশা নারী-পুরুষদের কেনাকাটা করার ভিড়, তখনই রাজ্যের অনেক জেলায় মানুষ গৃহহীন হয়ে কাঁদছে। নদীয়ার শান্তিপুর, মুর্শিদাবাদের শমসেরগঞ্জ, লালগোলার রাধাকৃষ্ণপুর-তারাপুর, মালদহের ভূতনির চরে পাড় ভাঙছে ভাগীরথীর। নদী গিলে খাচ্ছে ঘরবাড়ি, স্কুল, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, মন্দির, মসজিদ, শ্মশান, কবরখানা, চাষের জমি, বাগান। সর্বস্ব হারিয়ে মানুষগুলো আশ্রয় নিচ্ছে পলিথিনের ছাউনির নীচে। তাঁদের পুজোয় নতুন জামাকাপড় নেই, আনন্দ নেই। মাথায় শুধু একরাশ চিন্তা—  এবার কোথায় যাব? খাব কী? নদী ভাঙনে ঘর হারালে সরকার পুনর্বাসন দেয় না। সাময়িক আশ্রয় আর ত্রাণই ভরসা। 
চাষের জমি হারিয়ে দলে দলে মানুষ পরিযায়ী শ্রমিকে পরিণত হচ্ছে। গরিব মানুষ আরও গরিব হচ্ছে। তাদের ছেলেমেয়েরা স্কুলছুট হয়ে ইটভাটায় কাজ করছে। বসতভিটে হারিয়ে দলে দলে মানুষ রেলপাড়ে, নয়তো হাইওয়ের ধারে ঝুপড়ি বানিয়ে বসবাস করছে। তাদের জীবনে মা দুর্গা দুগর্তিনাশিনী হয়ে দেখা দিচ্ছে না। শহরের নারীরা যখন পাটভাঙা ঢাকাই জামদানি পরে মা দুর্গাকে অঞ্জলি দেওয়ার তোড়জোড়ে ব্যস্ত, অষ্টমীর রাতে কোন রেস্তরাঁয় খাওয়া দাওয়া সারবেন তার প্ল্যান চলছে। তখনই নদী ভাঙনে ভিটেহারা পরিবারগুলির মহিলারা ভাবছেন ছেলেমেয়েদের মুখে কী করে দু’ মুঠো খাবার তুলে দেবেন। একদিকে অঢেল আনন্দ হুল্লোড়। আর অন্যদিকে নিরানন্দ। আজকের ভাটপাড়ার পণ্ডিতরা যখন দুর্গোৎসব না শারদোৎসব লেখা হবে তা নিয়ে তর্কযুদ্ধে মগ্ন, তখন তাঁদের অগোচরে রাজ্যের মানুষের একাংশ পলিথিনের ছাউনির নীচে ছেলেমেয়েদের মুখে হয়তো শুধু নুন ভাত তুলে দিচ্ছেন। 
তবুও ওরা পুজো করে। জৌলুসহীন সেই পুজোয় মলিন মুখে মায়ের পায়ে ফুল ছুড়ে দিয়ে প্রার্থনা জানায়— দুর্গতি নাশ কর মা। কিন্তু দুর্গতি থামে না, চলতেই থাকে। রাতের অন্ধকারে পাড় ভেঙেই চলে, একটানা শব্দ হয়— ঝুপ, ঝুপ, ঝুপ। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলে। তারপর একদিন, ‘ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন, থাকে শুধু অন্ধকার...।’ অদ্ভুত আঁধার নেমে আসে পৃথিবীতে। জীবন চলতে থাকে। বছরের পর বছর ওদের আগমনি গানে শুধুই বিষাদের সুর বাজে। মাটির দুর্গা প্রতিমা ডাগর চোখ মেলে চেয়ে থাকে সব হারানো মুখগুলির দিকে। 

স্বস্তিনাথ শাস্ত্রী