


বিশ্বজিত্ দাস, কলকাতা: যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন রোগী। তা দেখে মাঝেমধ্যে বাড়ির লোকজন ট্রলি থামাচ্ছেন। একটু দাঁড়িয়ে নিচ্ছেন। তারপর অনভ্যস্ত হাতে ফের ঠেলছেন। রাস্তার গর্তে ট্রলির চাকা পড়ছে, আবার চিৎকার রোগীর। নাহ্, এ চিৎকার রোগ-যন্ত্রণার নয়, নরম বিছানাহীন শক্ত লোহার ট্রলি এবড়োখেবড়ো রাস্তায় পড়া মাত্রই ট্রলির লোহার পাতে মাথা ঠুকে যাচ্ছে রোগীর। ককিয়ে উঠছেন।
এ চিত্র এখন রাজ্যের সর্বত্র—কমবেশি সব সরকারি হাসপাতালে। চতুর্থ শ্রেণির কর্মীদের ট্রলি নিয়ে যাওয়ার কথা এক ওয়ার্ড থেকে অন্যত্র। কোথায় তাঁরা? কেউ খুঁজে পাবেন না। অগত্যা বহুকষ্টে কাকুতিমিনতি করে ট্রলি জোগাড় করে এদিক-ওদিক ঠেলে নিয়ে যাওয়ার জন্য সাহায্য প্রার্থনা করে, শেষমেষ রোগীকে ট্রলিতে তোলা থেকে ওয়ার্ড বা রোগপরীক্ষায় জায়গায় নিয়ে যাওয়া—সবটাই করতে হচ্ছে প্রিয়জনদের। হাতে চিকিৎসার গাদাখানিক কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে, কখনো স্যালাইনের নল ঠিক করতে করতে বৃদ্ধা স্ত্রী ট্রলিতে আচ্ছন্ন বৃদ্ধ স্বামীকে ঠা ঠা রোদের মধ্যে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যাচ্ছেন। এই চরম অমানবিক দৃশ্য রোজ দেখা যাচ্ছে কলকাতা মেডিকেল কলেজ বা আর জি কর, এন আর এস বা ন্যাশনালে।
দিনদুই আগে এন আর এস মেডিকেল কলেজের ফ্রেজার ওয়ার্ডের সামনে দেখা হল আন্দুলের বাসিন্দা দেবাশিস রায়ের সঙ্গে। দেবাশিসবাবুর স্ট্রোক হয়েছে। মেডিসিন ওয়ার্ডে ভরতি। এমআরআই করাতে বলেছেন চিকিৎসকরা। তাই ওয়ার্ড থেকে ট্রলিতে চাপিয়ে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁর দিদি সন্ধ্যা খামরুই এবং একজন অল্পবয়সি যুবক।
দেবাশিসবাবুর দিদি বললেন, অনেক কিছু চাওয়াপাওয়া আছে নতুন সরকারের কাছে। তার অন্যতম হল, সরকারি হাসপাতালে এই রোজকার ভোগান্তি বন্ধ করা। ওয়ার্ডে স্টাফেদের বললাম, খাবার নিয়ে আসা লোকজনকে বললাম, ওয়ার্ডবয়দের বললাম, বাবারা, একটু ট্রলিতে করে মানুষটাকে নিয়ে যাও না। কেউ সাড়া দিল না। অগত্যা আমি আর এই ছেলেটা মিলে ঠেলছি।
কেন এই বেহাল দশা? ট্রলিবয়রা কোথায়? আর জি করের এক কর্তা বললেন, ট্রলিবয় বলে কোনো সরকারি পদই নেই। তাহলে নিশ্চয় সরকার নিযুক্ত ঠিকাদারি সংস্থার কর্মীদের এটি কাজের মধ্যে পড়ে?
ওই কর্তার বক্তব্য, তাও না। তাহলে? হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে আসা বিপর্যস্ত রোগীর বাড়ির লোকজনকেই কি ট্রলি ঠেলে নিয়ে যেতে হবে? ওই কর্তা তখন বলেন, এই দায়িত্ব চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মীদের। তাঁদের জবচার্টে ট্রলি নিয়ে যাওয়ার কথা আছে। তাহলে? সরকারি স্বাস্থ্যকর্তারা বলছেন, গড়পড়তা যেকোনো মেডিকেল কলেজে ৫০ শতাংশের বেশি চতুর্থ শ্রেণির পদই খালি। রোজকার সাফাইসহ হাজারগন্ডা জরুরি কাজই কম লোকবলে করাতে নাভিশ্বাস উঠছে। তার মধ্যে কাদের দেব ট্রলি ঠেলার কাজ! রাজ্যের স্বাস্থ্য অধিকর্তা (শিক্ষা) ডাক্তার ইন্দ্রজিৎ সাহা বলেন, বিষয়টির ব্যাপারে মেডিকেল কলেজগুলি সুপার এবং অধ্যক্ষদের কাছ থেকে জানতে চাইব। যদি এরকম সমস্যা থাকে তবে তা দূর করতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।