মৃত্যুরহস্য: একটা দীপশিখা সবসময় আমাদের মধ্যে জ্বলছে। হৃদয়ের ওপর নয়, খুব গভীরে শিখাটি সর্বক্ষণের জন্য জ্বলেই রয়েছে। বিশেষ পুজো-পার্বণে অনেক মহাত্মা অখণ্ড প্রদীপ জ্বালাতে বলেন। প্রাচীন মঠে অখণ্ড দীপ বা ধুনি জ্বালানো থাকে। বছরের পর বছর ধরে জ্বলছে দীপ। এই প্রদীপই প্রভারূপে, জ্যোতিরূপে ব্যাপ্ত হয়ে আছে আমাদের মধ্যে। ওটাই হল নিজের মধ্যকার চেতনার আলো। আত্মসত্তার অনুভব হৃদয়ে একটা বিন্দুর মতন করতে করতে ওই আলোটা একটু একটু করে রোজকার সাধনায় বুদবুদের মতো উঠে দীর্ঘকালের প্রচেষ্টায় অখণ্ড দীপশিখা স্বরূপ উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। ধ্যান করতে করতে আলোটা প্রথমে আসবে হৃদয়ের পুরোভাগে, তারপর অনুশীলনে ক্রমশ তলিয়ে যাবে মেরুতন্ত্রের মধ্যে। হৃদয়ের ওপরটাতে যখন মানুষের চেতনা থাকে তখন নানারকম ভাব বা আবেগ আসে। এটি কখনও কখনও তো ভীষণ ক্ষতিকর। ওই আবেগের বশবর্তী হয়ে আমরা কত রাগ-ঈর্ষা-হিংসা ছড়িয়ে থাকি। পরে যখন বুঝতে পারি, নিজেই কষ্টটা পাই। স্থূলচেতনা থেকে এ ধরনের অভিব্যক্তি আসে আমাদের মধ্যে। চেতনা যখন হৃদয়ের গভীরে দীপশিখার মতো জ্বলে তখন আত্মসত্তার অনুভবটা আমাদের কাছে প্রগাঢ় হয়ে ওঠে। একেই সাধকেরা বলছেন, ব্রহ্মের অনুভব।
প্রাচীন ঋষিরা আমাদের জানিয়েছেন, চেতনার ধারা যখন ঊর্ধ্বগামী হয়, ওপরের দিকে উঠতে থাকে তখনই তার একটা বাইরের লক্ষণ দেখা যায়। এই যেমন হঠাৎ হঠাৎ আমরা রেগে যাই, লোকে বলে মাথাগরম, ওটা আসলে কিন্তু কিছুই নয়, চেতনার তাপের ক্রিয়া। কিন্তু ওই তাপটা যখন অন্তঃশীতলতা লাভ করে, বাইরে তা না বেরিয়ে ভেতরে নেমে যায়। হৃদয়ের মধ্যেই আগুনের একটা হলকা ছড়াতে থাকে, ওই আগুনই ঘন হয়ে প্রদীপের মতো জ্বলে। দুর্গাপুজোর চারটি দিন অনেক প্রাচীন পুজোবাড়িতে অখণ্ড দীপ জ্বালানো হয়। এই প্রদীপ যদি হৃদয়ে জ্বালতে সক্ষম হই তাহলে আমরা দ্রষ্টারূপে যেতে পারব। অনেক কিছু আগে থেকেই দেখতে পাব। ঊর্ধ্বভাবনা, ঊর্ধ্বচেতনা একটি প্রাচীন যোগের শিক্ষা। বেদের ঋষিরা শিক্ষাক্রমটি চালু করেছিলেন ভারতে। ভাবতে হবে আমাদের বাইরে নয়, মেরুদণ্ডে থাকা দু’দুটো নাড়ির মধ্যে দিয়ে ভাবনাকে ওপরে তুলতে হবে। মেরুদণ্ডের মধ্যেই বাঁ-ধারে আছে সূক্ষ্ম একটা নাড়ি— যোগীরা এর নাম বলছেন, ইড়া নাড়ি। ইড়া নাড়ি খুব ঠান্ডা। তাই একে চাঁদের জ্যোৎস্নার সঙ্গে কল্পনা করা হয়েছে। চন্দ্রসমা ইড়া নাড়ি। মানুষের সূক্ষ্মচেতনার ধারা থাকে মেরুদণ্ডের মধ্যকার বাঁ ধারের ওই সূক্ষ্ম নাড়িতে। ওটা যাঁদের যত বেশি তরতাজা তাঁরা আগে থেকেই কোনও ঘটনার রূপরেখা ধরতে পারেন। কী ঘটতে পারে কিংবা কী ঘটবে তা তাঁরা দেখতে পান। তাঁদের দ্রষ্টাসত্তাটি থাকে অত্যন্ত প্রখর। মৃত্যুকে আগে থেকে তাঁরাই ধরতে জানেন, যাঁদের ইড়া নাড়ির স্রোতটা সব সময়ের জন্য ঊর্ধ্বরেতা থাকে, মানে ওপরের দিকে থাকে। এটা একটা যোগের পদ্ধতি। অনেকে আবার যোগ করেন না, কিন্তু কোনও সৃষ্টিকাজকে সুন্দর করে সাজিয়ে-গুছিয়ে মানুষের মনকে জয় করতে পারেন। পূর্বজন্মের কিছু ভালো সংস্কারের ফলে এঁদের আসলে ইড়া নাড়ির স্রোত ঊর্ধ্বমুখী হয়েই থাকে। এঁদের সিংহভাগই শিল্পী হন— গান করেন, সিনেমা বানান, লেখেন। মা সরস্বতীর যাবতীয় কর্মকাণ্ড এঁদের মধ্যে প্রতিভাত হতে দেখা যায়। মেরুদণ্ডের মধ্যেই ডান দিকে থাকে আরও একটি সূক্ষ্ম নাড়ি, যার নাম পিঙ্গলা। পিঙ্গলা নাড়ি সূর্যসমা। এর প্রচণ্ড তেজ। রাগ, ক্রোধ যাঁদের অত্যধিক বেশি তাঁদের পূর্বজ সংস্কারের বশে পিঙ্গলা নাড়ির স্রোত ঊর্ধ্বমুখী থাকে। অনেকেই রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে জানেন না, রাগ থেকে সংসারে তখন কত ধরনের ক্ষতি ও ক্লেশ আসে, শেষ পর্যায়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন পর্যন্ত হন। কিন্তু যদি যোগ অনুশীলন করা যায়, পিঙ্গলা নাড়িটিকে দমিয়ে দেওয়া যায় তাহলে ওই রাগ, ক্রোধ নিমেষে নিয়ন্ত্রিত করে রাখা যায়। আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের ধারা বয় দুটো নাকে এটাই আমরা জানি। কিন্তু এই ধারণা সবটা ঠিক নয়। যখন শরীর খারাপ হতে শুরু করে, যখন কোনও বিপদ, দুর্বিপাক, কষ্ট আসতে চলেছে তখন সবার আগে জানিয়ে দেয় আমাদের শ্বাসের গতি। তখন এক নাকে চলে আসে শ্বাসের স্রোত। আবার যখন ভালো কিছু ভাবি আমরা, চিন্তা করি, উদ্ভাবন করি তখনও শ্বাসের ধারা এক নাকে থাকে। বাঁ-দিকের শ্বাসে থাকে আমাদের সূক্ষ্মচেতনা আর ডানদিকের শ্বাসে স্থূলচেতনা। যোগীরা দিনের বেলা বাঁ-দিক দিয়ে শ্বাস নেন। রাতের বেলা তাঁরা ডান দিক দিয়ে শ্বাসের ধারা চালান। যখন মানুষের দিন হয় তখন যোগীদের রাত, আর মানুষের রাতটা যোগীদের কাছে দিন। ওই সময়টায় তাঁরা শ্বাসের সাধনা করেন। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, ‘রাত্তিরে তো তিন ধরনের মানুষই জেগে থাকেন— যোগী, ভোগী আর রুগি।’
মৃত্যু আর কী? কিছুই তো নয়, ওই শ্বাসের ক্রিয়াটা চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া। আমাদের পার্থিব শরীর, অবস্থা ও জগতের প্রতি আসক্তি একেবারে কম না হলে মৃত্যুকে বেঁচে থাকতে কখনও বোঝা যাবে না। মৃত্যুকে বুঝতে গেলে এবং তাকে কব্জা ও নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে বাসনা ও আকাঙ্ক্ষার ফর্দটিকে মুদিখানার মতো লম্বা করে নিলে চলবে না। দেশ কাল নিমিত্তের সীমার ওপরে যে অমরত্বের রাজত্ব রয়েছে ধ্যান চেতনার মধ্যে দিয়ে তা উপলব্ধ করেছিলেন বৈদিক ঋষিরা। তাঁদের উপলব্ধির ফলাফল কঠোপনিষদ। বাউল মরমিয়ারা অত্যন্ত সুন্দর একটা কথা বলেন। কুষ্টিয়ার লালন ঘরানার প্রবৃদ্ধ মরমিয়া লবান শাহ একবার এসেছিলেন ঘোষপাড়ায়। তিনি আমাকে বললেন, ‘সাধনা করতে গেলে মরতে হয়। বেঁচে থাকতে গেলেও মরতে হবে। রোজ তোমার মনেতে থাকা কত কামনারাশি দেখ না, আপনা আপনিই মরে যায়। যে আশা ও স্বপ্নপূরণ হয় না তা তো ওই মৃত্যুরই শামিল। মরাটা তাই যদি অভ্যাস করতে পার তাহলে মৃত্যুকে ধরতে কোনও অসুবিধা হবে না। আমার গুরুজি বলতেন, ‘জ্যান্তে মরা। বেঁচে থাকতেই তুমি মরে যাও দেখি। ক্ষোভ বিক্ষোভ সব মার এবং মরো।’
বৌদ্ধাচার্যরা ওই একই কথা বললেন, ‘সর্বম্ অনিত্যম্।’ আজ আছ তো কাল নেই। জগৎ একটা চক্র। সমস্ত জগৎ চক্রের মতো ঘুরছে। একবার উঠছে আর একবার নামছে। জন্ম নিচ্ছে আর মারা যাচ্ছে।
কঠোপনিষদের ঋষি ওই একই কথাটাই বললেন, ‘সমস্ত প্রাণীই দেখ না কেমন শস্যের মতোই মরে যাচ্ছে, আর শস্যের মতোই জন্মাচ্ছে।’
মৃত্যুর এই বোধগুলো জীবনে না এলে মৃত্যুকে বোঝা যাবে না কখনও। ব্রহ্মবিদ্যা, মোক্ষশাস্ত্র আমাদের মৃত্যুকে জানতে সাহায্য করে। মৃত্যুকে জানতে না পারলে জীবনটাকে কখনও ভালো করে জানাও যাবে না।
বটগাছের তলায় গুরু ও শিষ্যেরা বসে আছেন। আশপাশে শিষ্যেরা, তারা বৃদ্ধ, মাঝখানে বসে আছেন গুরু, তিনি যুবা। গুরু যুবক কারণ তিনি মৃত্যুকে জেনে ফেলেছেন। আর শিষ্যেরা বয়স্ক কারণ তাঁরা কেউই মৃত্যুর মহিমা বোঝেন না ভালো করে। গুরু চুপটি করে বসেই আছেন, মুখে কিছু বলছেন না, কিন্তু তাঁর প্রভাবে শিষ্যদের সব সংশয় দূর হয়ে যাচ্ছে। এক সাধারণ মানের শিষ্য বললেন, ‘আপনি যে কিছুই বলছেন না, বুঝব কী করে?’
গুরুদেব মৃদু একটু হেসে বললেন, ‘না বলাটাই বলা। গভীর কিছু, গূঢ় কিছু, আশ্চর্য কিছু, অলৌকিক কিছু, বিশেষ কিছু বুঝতে হলে তোমাকে হতে হবে ইঙ্গিতবাহী। সেই অধিকার তোমাকে লাভ করতে হবে।’
মৃত্যুও গুরুর এইভাবে শিক্ষা দেওয়ার পদ্ধতির মতোই আমাদের মাঝেমধ্যে ইঙ্গিত দেয়। বুঝতে পারি না বলে আমরাও ওই গুরুর সাধারণ শিষ্যের মতোই বকবক করে চলি। ‘বচনম্ অবচনম্’— বুদ্ধদেবেরও শিক্ষাপ্রণালী ছিল এইরকমই। কথা বললে রহস্যবিদ্যা আয়ত্ত করা যায় না, চুপ করে ইঙ্গিত বুঝতে পারলেই মৃত্যুরহস্য ধরা পড়বে আপনার মাঝে।
হাড়ের খাঁচা চামড়ার থলে
জন্ম আসলে কী? এটা তো জীবনের একটি পর্যায় মাত্র। জীবন তো ক্রমশ মৃত্যুর দিকে ছুটে যাচ্ছে এবং ঋষিরা স্পষ্ট করেছেন আমাদের, সেটাই হল অমৃত। জীবনের একটি পর্যায় মৃত্যু, যেমন আমরা পুরনো বাড়ি ছেড়ে নতুন বাড়িতে চলে যাই, পুরনো কাপড় ছেড়ে নতুন পোশাক পরি, তেমনই জীবনের একটি পর্যায়কে ছেড়ে পরবর্তী পর্যায়ে প্রবেশ করি মাত্র। মৃত্যুটা এর বাইরের কিছু না। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের বুদ্ধি ও বোধ সংসারের, জগতের অসাড় স্বরূপকে বুঝে নিতে না পারে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে অমৃতের স্বরূপকে বুঝতে পারে না, সুতরাং অমৃত স্বরূপে পরিণত হতে পারে না।
যমরাজ বললেন, ‘দেহটা চলে যাওয়ার আগে যদি আত্মজ্ঞান লাভ হয় তবেই তুমি মুক্তি পাবে। নচেৎ ব্রহ্মবিষয়ে অজ্ঞানতার জন্য ফের তোমাকে জন্ম নিয়ে এখন যেরকম ক্লেশ ভোগ করছ তেমনই পুনর্জন্মে ফিরেও ওই কষ্ট ভোগ করতেই হবে। এটা একটা চক্র। জন্ম-মৃত্যুর চক্রের বাইরে যদি বেরতে না জান কষ্ট, ক্লেশ, দুর্দশা থেকে তোমার কোনওভাবেই মুক্তি নেই।’
অর্হৎ যোগীরা দুঃখ নিবৃত্তির উপায়টা আমাদের বলে গিয়েছেন। জগতে দুঃখ আছে আর প্রত্যেক দুঃখের আগমন হচ্ছে রোজকার জীবনচর্চার নানান রকম কার্যকরণ থেকে। জাগতিক দুঃখ-যন্ত্রণা, জন্ম-মৃত্যু, জরা-ব্যাধির ঊর্ধ্বে ওঠার কথা বলেন অর্হৎ যোগীরা। গৌতম বুদ্ধ ছিলেন অর্হৎ। অর্হৎ সাধনায় যাঁরা সিদ্ধ হন, তাঁরা যতদিন বেঁচে থাকেন, পরম আনন্দ ভোগ করে চলে যান। পৃথিবীতে বসবাসকারী মানুষজনদের কোনও জাগতিক অনুভূতি তাঁদের স্পর্শ করতে পারে না। অর্হৎ যোগীরা বলেন, ‘বাসনা তেল ভরা প্রদীপের মতো। যতক্ষণ প্রদীপদানিতে তেল রয়েছে জ্বলবে, তেমন যতক্ষণ চাওয়া-পাওয়া রয়েছে তোমার কারও না কারও কাছে, কোনও না কোনও কিছু থেকে ততক্ষণ সে সমস্ত পূরণ যদি না হয় দুঃখ-কষ্ট আপনে এসে হাজির হয়ে যাবে। দুঃখ আসার পথটা খালি বন্ধ করে দিও। বাসনাকে দেহ ধারণের প্রয়োজন অনুযায়ী মেটাও, বেশি সুখ-ঐশ্বর্য ভোগ করতে চেও না, তাহলে দুঃখের পরিমাণ তোমার জীবন থেকে কমতে থাকবে আর তুমি অমৃতের পথে এগিয়ে চলে যাবে। পাঁচটা ইন্দ্রিয় আর মনের অভিব্যক্তি দিয়ে তোমার মধ্যে দুঃখ প্রবেশ করছে। মন ও ইন্দ্রিয়গুলোকে ঈশ্বরচিন্তাতে লাগাও, দেখ সেগুলোর উৎপাত আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।’
ব্রহ্ম কী? যাঁর ক্ষয় নেই, ক্ষরণ নেই, চলন নেই তাই হল অক্ষর। অক্ষরই হল ব্রহ্ম। গীতার মধ্যে অক্ষরব্রহ্মযোগ অধ্যায়টিতে এর সুন্দর ব্যাখ্যা রয়েছে।
ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যর কাছে তাঁর স্ত্রী গার্গী প্রশ্ন করলেন, ‘ব্রহ্ম কী?’
যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ‘তিনি স্থূল না, সূক্ষ্মও না, বেঁটেও না, লম্বাও নন, তিনি আগুনে পুড়ে যান না, জলে মিশে যান না। তাঁর কোনও ছায়া পড়ে না। তিনি বায়ু, আকাশ— এর কোনওটাই নন, তাঁর কোনও আকৃতি নেই। তিনি কিছুই খানদান না, কারও কর্তৃত্ব ভোগ করেন না। তিনি নির্গুণ। মায়ায় জড়িয়ে গিয়ে তিনি সগুণ হয়ে যায় বলেই তপস্বীদের স্বরূপে তাঁর আবার দেখাও মেলে।’
মানুষ দু’ধরনের— ক্ষর ও অক্ষর। আবার কর্মাশ্রয়ী ও মায়াশ্রয়ী। এই দুটো গুণ যখন শরীরে বর্তায় না তখনই তা ব্রহ্মস্বরূপ হয়ে যায়। ব্রহ্মের কাছাকাছি যাওয়ার একমাত্র পথ প্রাণবায়ু— যার সাহায্যে আমরা বেঁচেবর্তে থাকি তাকে মহা সমীরণে মিলিত করে দেওয়া। দেহের মধ্যে থাকে পঞ্চভূত। ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম— এই পাঁচটা ভূত এক হয়েই শরীরটার জন্ম হয়েছে। যখন প্রাণবায়ুটা বেরিয়ে চলে যাবে, দেহটাকে ওই পঞ্চভূতের মধ্যেই মিলিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াদি শুরু করবে স্বজনেরা। শরীরটা আমরা কত সুন্দর করে সাজিয়ে রাখি। ভালো জামাকাপড়, ভালো প্রসাধন— মুখ, চুল, গলায় বার্ধক্য আসতে দিই না, মেকআপ করি, চুলে কত ধরনের কী লাগাই। শরীরটাকে ‘আমি’ মনে করি বলেই তো এত কিছু করে তাকে তার সঠিক বয়স থেকে গোপন করে রাখি। আর সাধকেরা শরীরটাকে বলেন, ‘হাড়ের খাঁচা ও চামড়ার থলিয়া।’ সাপের গায়ে থাকে খোলস— সর্প কুঞ্চকের মতো মহাত্মারা এই খোলস ছেড়ে দিয়েই জীবমুক্ত হয়ে যান। আমরা পারি না বলেই খোলসটার যত্ন করি। দামি দামি পোশাকে, সাজানোর জিনিসপত্রে। অঙ্গের প্রতি আমাদের মায়া থাকে বলেই আমরা অঙ্গসজ্জার পেছনে রোজগারের টাকা ঢেলে দিই। এত কিছু করেও কি শরীরে বয়সের ছাপটা আটকাতে পারি? শরীরের এগুলো স্বাভাবিক নিয়ম— চুলে পাক ধরা, চামড়া কুঁচকে যাওয়া, চোখ-দাঁত খারাপ হওয়া। কিন্তু এই স্বাভাবিক নিয়মটাই আমরা চট করে মানতে পারি না। আমরা মৃত্যুকে মানবটা কী করে? শরীরের চামড়া-হাড়ে আটকে আছে আমাদের মন, দেহটার সুখ নিয়ে সর্বক্ষণ আমরা ব্যস্ত ও নাজেহাল, দেহটা অজ্ঞান, দেহটা স্বপ্ন— জ্ঞান হলে আর স্বপ্ন ভাঙলে পরেই আমরা স্ব-স্বরূপে চলে যাব, জীবমুক্তি ঘটবে আমাদের। তখনই মনে হবে মৃত্যুটা হল অমৃতের পথ। তার আগে পর্যন্ত মৃত্যুকে আড়াল করে আমরা দ্বেষ-বিদ্বেষ নিয়ে মাতামাতি করব, ভাগাভাগি করব আমার তোমার, লড়াই করব খুব। একদিন লড়তে লড়তে টুক করে চলে যাব পৃথিবী থেকে। সাধের ঘরবাড়ি সব পড়ে থাকবে। প্রাণবায়ু শরীর থেকে বেরনোর পরপরই ওটা আর শরীর থাকবে না। হয়ে যাবে মৃতদেহ। ওই দেহ পঞ্চভূতে বিলীন করবার জন্যই স্বজনেরা তখন তৎপর হয়ে উঠবেন। মৃত্যু তাঁদের কাছে অমৃতের যাত্রা নয়, মৃত্যু হল মৃত ব্যক্তির ফেলে যাওয়া সম্পদে দখলদারিত্ব। মৃত্যু সব কিছু নষ্ট করে দিচ্ছে যেন। তাই অশৌচ পালন। শ্রাদ্ধ-শান্তি করে মৃত ব্যক্তির আত্মার তৃপ্তি দিয়ে তাঁর সম্পদটার অধিকারবোধ নিয়েই ঝগড়া বিবাদ। কিন্তু বিবাদ-কলহের সময় এটা আমরা কেউই ভাবি না কিন্তু— একদিন আমার পরিণতিটাও এইরকম হবে। মৃত্যু কখন আসবে— এটা বুঝব তবে আমরা কী করে, কীভাবে? মৃত্যুকে বোঝার একমাত্র রাস্তা অভ্যাসযোগ। গীতার প্রত্যেক অধ্যায়েই এ যোগের কথা থাকলেও সবচেয়ে বেশি করে আছে অষ্টম অধ্যায়ে। মানুষ চলে গেলে তাই শ্রাদ্ধবাসরে গীতার অষ্টম অধ্যায়টিই পড়বার নিয়ম আর শ্রাদ্ধ সম্পন্ন হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত পড়তে হয় কঠোপনিষদ ও গরুড়পুরাণ।
শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, ‘তোমার মনে একই প্রকার ভাবনার প্রবাহ রোজ যদি তুমি প্রবাহিত করাতে জানো সেটাই হল অভ্যাস। মনটাকে একটা স্রোতের মধ্যে রাখতে হবে। তোমার দুই ভ্রুর মধ্যিখানে মনটাকে রাখ, উঁচু মনে হলে হৃদয়ে মনটা রাখ— ওখানে স্থির করে তাকে ধ্যান করতে থাক। তাহলেই দেখবে একটা নতুন প্রাণশক্তি তোমার শরীরে মৃদুভাবে বইতে শুরু করে দিয়েছে। এইভাবে প্রাণবায়ুকে ভ্রু মধ্যে বা হৃদয়ে কিছুটা সময় আটকে ধরবার চেষ্টাটা করে যাও তুমি। এই অভ্যাস যদি থাকে তাহলে মৃত্যুর সময় একইভাবে স্থিরচিত্তে চলে যেতে তুমি পারবে। ওটাই অমৃতের পথে যাওয়া। না হলে রোগের কষ্ট নিয়ে, সংসারের অশান্তি, অপ্রাপ্তি আর আসক্তি নিয়ে— নানান ধরনের খেদ-দুঃখ নিয়ে তুমি চলে যাবে, ফের এখানে এসে ওই একই ফল ভোগ করতে থাকবে। প্রাণবায়ুকে স্থির কর, অর্জুন। মৃত্যুর সময় বায়ুকে যদি আজ্ঞাচক্রে প্রবেশ করাতে জান তাহলে কালের চক্র, জন্ম-মৃত্যুর সাধনায় জয়ী হয়ে যাবে তুমি। মনে রেখ বিনা সাধনায় মৃত্যু জয় করা যায় না, মৃত্যুর আগের মুহূর্ত, আসন্ন মৃত্যুর কালও ধরা পড়ে না কখনও।’
অর্জুন বললেন, ‘কেমন সেই সাধনা?’
শ্রীকৃষ্ণ বললেন, ‘একজন গুরু দরকার সবার আগে। তিনি বুঝিয়ে দেবেন তোমার মেরুদণ্ডের মধ্যে ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না নাড়ি কীভাবে রয়েছে। মাঝখানে আসে সুষুম্না, ইড়া বামে, ডানে পিঙ্গলা। সুষুম্নার মধ্যে বজ্রিণী বলে একটা নাড়ি আছে, ওর মধ্যে আরেক নাড়ি চিত্রিণী। চিত্রিণী নাড়ির ভেতর আছে ব্রহ্ম নাড়ি। মূলাধার পদ্ম থেকে সহস্রার পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে এই নাড়ি। তোমার কোমরের একেবারে শেষ প্রদেশ থেকে মাথা পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে ব্রহ্ম নাড়ি। কোমরের নীচে, নাভির একটু নীচে, নাভিতে, হৃদয়ে, কণ্ঠে, দুই ভ্রুমধ্যে ও মস্তিষ্কের ওপর ঊর্ধ্বমুখীন দশার ভেতর রয়েছে সর্বমোট সাতটি গ্রন্থি— মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধ, আজ্ঞা চক্র ও সহস্রার— পদ্মের পাপড়ির মতো এগুলো সব আছে তোমার মেরুদণ্ডের ভেতর। সব মুখগুলো বুজে আছে। প্রাণবায়ুর শক্তির সাহায্য নিয়ে গুরুর শেখানো যোগে যদি মুখগুলোকে ওপরে তুলতে শেখ, তাহলে তোমার গোটা কুণ্ডলিনী চক্রটাই খুলে যাবে। ‘তুমি শরীর’ এই ভাবনা আগে দূর কর। ভাব তুমি সূক্ষ্মশক্তির আধার। দেখ এবার অভ্যাস করতে করতে ওই শক্তি তোমার মধ্যে ঢুকছে ক্রমশ। যখন দেহটা ছেড়ে দেওয়ার সময় হবে ওই শক্তি তোমার রোজকার অভ্যাসের জন্যে আপনিই আজ্ঞাচক্র ছাড়িয়ে সহস্রার প্রদেশ ডিঙিয়ে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওপরকার বায়ুতে মিশে যাবে। ইন্দ্রিয় তোমাকে চালাচ্ছে, বায়ু যদি চালায় তাহলে একমাত্র মৃত্যুর আগের সময়টা তুমি ধরতে পারবে আর মৃত্যুর থেকে অমৃতের রাস্তাটা পেয়েও যাবে। না হলে মরবার আগে ভয়, হতাশা, দুঃখ, ব্যর্থতা, ক্লেশ সব এসে চেপে ধরে তোমার মায়ার দেহটাকে আটকে রাখবে। ভোগাবে বেশি। আসক্তি বেশি হলেই ভোগান্তি বেশি হবে। অভ্যাসযোগ কর আর অমৃতের যাত্রাপথটিকে প্রসারিত কর।’
যা অবশ্যম্ভাবী
জোসেফিন ম্যাকলাউড ১৮৯৫ সালে স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে পরিচিত হন। তিনি সবসময় নিজেকে স্বামীজির শিষ্য রূপে নয়, বরং বন্ধু রূপে পরিচয় দিতেন। তাঁর শরীর জীবনের শেষদিকে ভয়ঙ্করভাবে ভেঙে পড়েছিল। তিনি একাই থাকতেন, সারা পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াতেন। মায়াবতী ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। মৃত্যুর চারদিন আগে ম্যাকলাউডকে হলিউড বেদান্ত সোসাইটি অব সাদার্ন ক্যালিফোর্নিয়াতে এনে রাখা হয়েছিল। তাঁর শরীরে মৃত্যুর যবনিকা যত নেমে আসছিল, তত তিনি উজ্জীবিত ও প্রাণবন্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলতেন, ‘কোনওরকম একটা জরাজীর্ণ রোগগ্রস্ত শরীর আঁকড়ে থাকাটা কোনও কাজের কথা নয়, বরং সবসময় প্রস্তুত থাকাটাই আসল কথা। যিনি নিত্য, তিনি তো আমাদের মধ্যেই আছেন। তোমরা কি জানো না তোমরা ঈশ্বরের পুত্র?— এই কথাটাই চিন্তা করতে হবে, আমি তো তা-ই করি। লোকে বলে, মৃত্যু নিয়ে কথা বল কেন?— এমনভাবে কথাগুলি বলে যেন মৃত্যু যখন আসে তখন তা আশীর্বাদ নয়, যেন অভিশাপের মতো আসে! যা অবশ্যম্ভাবী তাকে চিনতে, মেনে নিতে এত দ্বিধা কেন? আমার মৃত্যু মুহূর্তে আমি তো পরিবার পরিজন থেকে দূরে থাকতে চাইব কারণ মৃত্যু এক অসাধারণ, অনবদ্য অভিজ্ঞতা— মৃত্যু মুহূর্তের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস, মৃত্যুর জন্য অপেক্ষমাণ মানুষের নিবিড় পর্যবেক্ষণের বিষয়— তোমাদের কি তা-ই মনে হয় না?’
স্বামী তুরীয়ানন্দ ছিলেন এমন এক উচ্চকোটির যোগীপুরুষ, যিনি ইচ্ছামাত্র, মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে শরীর, মন এবং পারিপার্শ্বিকতার ঊর্ধ্বে তুলে নিয়ে যেতে পারতেন। শরীরে অস্ত্রোপচার করার সময় তাঁকে অজ্ঞান করবার দরকার পর্যন্ত হতো না। তিনি সেটা চাইতেনও না। ডাক্তারকে শুধু বলতে হতো কখন কাজটি শুরু করবেন। সেই সময় তিনি নিজেকে শরীর, মন ও পারিপার্শ্বিকতা থেকে ঊর্ধ্বে তুলে রাখতেন। তাঁর এ অবস্থা দেখে চিকিৎসকেরা পর্যন্ত অবাক হয়ে যেতেন। শেষ জীবনটাতে তিনি স্নায়ুর নানান সমস্যাতে ভুগছিলেন। আমেরিকা থেকে এ কারণেই তাঁকে ভারতে ফিরে আসতে হয়েছিল। তাঁর মহাসমাধির ইঙ্গিত তিনি আগেই দিয়েছিলেন কিন্তু সেবকেরা কেউ তা বুঝতে পারেননি।
মহাসমাধির আগের রাতে স্বামী তুরীয়ানন্দ বললেন, ‘শেষ দিন, শেষ দিন।’
বেনারসে স্বামী অখণ্ডানন্দজি তাঁকে দেখতে গেলে বললেন, ‘সুপ্রভাত, সুপ্রভাত।’ তিনি সাধারণত এরকম বলতেন না। একটু পরে থেকে থেকে তিনি বললেন, ‘আমরা মায়ের, মা আমাদের, এটা বারবার বল, বারবার বল।’ সন্ধ্যার দিকে বললেন, ‘তাঁর ইচ্ছাই পূর্ণ হবে। মানুষ জানুক, আর নাই জানুক তাঁর ইচ্ছাই পূর্ণ হচ্ছে।’ এসময় তাঁর গলার আওয়াজ অস্বাভাবিক রকমের কোমল ও স্নেহসিক্ত হয়ে উঠল। তিনি সেবককে বললেন, ‘সনৎ, আমার ব্যান্ডেজ খুলে দাও। এসব কী?’
তারপর ব্যান্ডেজ খুলে দেওয়া হলে বললেন, ‘বাঃ! খুব ভালো হয়েছে। খুব ভালো করলে। আমাকে যেতে দাও, তুমি যদি যাওয়ার অনুমতি দাও, আমি দুর্ভাবনা থেকে মুক্ত হতে পারি।’ তারপরই ধ্যানাসনে উঠে বসবার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। বললেন, ‘শরীর যাচ্ছে, প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে, আমার পা-দুটো সোজা করে দাও, আমার কপালের কাছে হাতদুটো অঞ্জলিবদ্ধ করে দাও।’
এরকম করে দেওয়া হতেই তুরীয়ানন্দ বললেন, ‘ব্রহ্ম সত্য, জগৎ সত্য, সত্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত।’ ব্যস। তারপরই মহাসমাধিতে প্রবেশ করলেন শ্রীরামকৃষ্ণের সাক্ষাৎ শিষ্য স্বামী তুরীয়ানন্দ। এ সময়ে তাঁর মুখমণ্ডলে যন্ত্রণা বা বিরক্তির চিহ্ন ছিল না, বরং তা এক স্বর্গীয় আভায় জ্বলজ্বল করছিল।
পণ্ডিচেরী আশ্রমে শ্রীঅরবিন্দের অবস্থা ক্রমেই সঙ্কটজনক হচ্ছিল। মহানির্বাণের দশ মিনিট আগে হঠাৎ শ্রীঅরবিন্দ শিষ্যের নাম ধরে ডেকে উঠলেন, ‘নীরদ, আমাকে পানীয় কিছু একটা দাও!’
ফলের রস একটু দেওয়া হতেই শ্রীঅরবিন্দ অতি সামান্যই পান করলেন। তারপর আর কোনও সাড়াশব্দ নেই। তখন ঠিক রাত ১টা ২৬। ভোরবেলা দেখা গেল এক অপরূপ অবিশ্বাস্য দৃশ্য। তাঁর সারা দেহখানি সোনালি আভায় উদ্ভাসিত।
পণ্ডিচেরীর শ্রীমা সোনালি আলোর দিকে আঙুল তুলে বললেন, ‘যদি এই অতিমানস আলো স্থায়ী হয়, আমরা এই দেহ কাচের আধারে রেখে দেব।’
চার দিন শ্রীঅরবিন্দের দেহ ঘিরেই ছিল ওই সোনালি আলোর বলয়। পঞ্চম দিন ৯ ডিসেম্বর বিকেলে দেহ থেকে আলো সরে যেতেই তাঁকে পণ্ডিচেরী আশ্রমে সমাধিস্থ করা হল।
১২ ডিসেম্বর শ্রীমা এক অতুলনীয় হাসি হেসে আশ্রমের সাধকদের উদ্দেশে বললেন, ‘কিছুই বদলায়নি। প্রেরণা ও সাহায্যের জন্য ডাক দাও, যেমন বরাবর করেছ, আগের মতোই তাঁর কাছে সব পাবে।’
শ্রীমা দেহ ছেড়ে দেওয়ার পর ওই একই রকম ঘটনা ঘটেছিল। তাঁর দেহ ঘিরে নীল আলোর বলয় তিনদিন ছিল। চতুর্থ দিনে শ্রীমাকে সমাধিস্থ করা হয়।
মা আনন্দময়ী যখন দেহ ছাড়েন তখন ওই একই ধরনের সাদা আলোর বলয় উদ্ভাসিত করে রাখে তাঁর দেহটিকে।
১৯৫২ সালের ৭ মার্চ ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলসে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত বিনয়রঞ্জন সেনের সম্মানে আয়োজিত ভোজসভাতে উপস্থিত হয়েছিলেন যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ীর প্রশিষ্য পরমহংস যোগানন্দ। তখন এক আলোকচিত্রী যোগানন্দজির প্রেমপূর্ণ স্মিত হাসির একখানি ছবি তুলেছিলেন। এর এক ঘণ্টা পরই যোগীরাজ দেহ ছেড়ে দেন। তাঁর দেহ ঘিরে ওই স্মিতহাস্যের বলয় কুড়ি দিন পর্যন্ত কার্যকরী ছিল।
দেহে কোনও ধরনের বিঘটন দৃষ্ট হয়নি, তাঁর চামড়ার ওপর ছত্রাকের কোনও নিদর্শন পাওয়া যায়নি। দেহপেশির কোনও শুষ্কতাও দৃশ্যত ঘটেনি। ২৭ মার্চ পর্যন্ত যোগানন্দজির দেহ একইরূপ স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ছিল।
যোগানন্দজি তাঁর গুরুদেব যুক্তেশ্বর গিরিজির দেহ পুরী আশ্রম বাগানের মধ্যে সাধুসন্ন্যাসীদের প্রাচীন শাস্ত্রবিধি অনুসারে সমাধিস্থ করেছিলেন।
মাউন্ট ওয়াশিংটনে একদিন ধ্যানে বসছেন যোগানন্দ। হঠাৎ তাঁর অন্তরের অন্তস্থলে যুক্তেশ্বর গিরির স্বর ধ্বনিত হয়ে উঠল, ‘ভারতবর্ষে ফিরে এসো, তোমার জন্য আমি পনেরো বছর ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে বসে আছি। শীঘ্রই আমি দেহত্যাগ করে অনন্তের দিকে পাড়ি জমাব। যোগানন্দ, চলে এস!’
চোখের পলকে দশ হাজার মাইল অতিক্রম করে গুরুদেবের আহ্বান যোগানন্দজির অন্তরে এসে পৌঁছল— বিদ্যুৎচমকের মতো। যোগানন্দ পাশ্চাত্য দেশে এসেছিলেন ১৯২০ সালে। পনেরো বছর ধরে তিনি গুরুর শিক্ষা আমেরিকায় প্রচার করে এসেছেন। এখন গুরু তাঁকে ডাক দিলেন।
শ্রীরামপুর আশ্রমে এসে উপস্থিত হলেন যোগানন্দ, কিছু গোলাপফুল আর ফলমূল নিয়ে। ১৯৩৫ সালে প্রয়াগে চলছে কুম্ভমেলা। যোগানন্দ সেখানে যাবেন বলে গুরুর অনুমতি চাইলেন। গুরুদেবের চক্ষু দু’টি স্থির, স্নিগ্ধ। শান্তভাবে বললেন, ‘পৃথিবীতে আমার কাজ ফুরিয়েছে, তোমাকেই এখন থেকে সব চালাতে হবে।’
শুনে ভয়ে যোগানন্দজির বুক ধড়াস ধড়াস করতে লাগল। যুক্তেশ্বর গিরি বললেন,‘পুরীতে আমাদের আশ্রমের ভার নেওয়ার জন্য কাউকে পাঠিয়ে দিও। তোমার হাতে আমি সবই দিয়ে যাচ্ছি। তুমি তোমার জীবন আর এই প্রতিষ্ঠানের তরী, ঠিকই সাফল্যের সঙ্গে স্বর্গের বেলাভূমিতে ভিড়োতে পারবে।’
অশ্রুপ্লাবিত নয়নে যোগানন্দ গুরুদেবের পা দু’টি জড়িয়ে আশীর্বাদ নিয়ে চলে গেলেন কুম্ভে। ফেরার পর শ্রীরামপুর আশ্রম এসে শুনলেন গুরুদেব গিয়েছেন পুরীতে। পরদিন সন্ধেবেলা ট্রেন ধরার জন্য যাত্রা করলেন। তখন প্রায় সাতটা বাজে।
একটা ঘন কৃষ্ণবর্ণ সূক্ষ্ম মেঘ হঠাৎ কোথা থেকে এসে আকাশ আচ্ছন্ন করে ফেলল। ট্রেন পুরীর দিকে ছুটে চলেছে, যুক্তেশ্বর গিরিজির মূর্তি হঠাৎ যোগানন্দজির সম্মুখে এসে আবির্ভূত হল। মূর্তিটি তাঁর কাছে এসে বসল। অত্যন্ত গম্ভীর মূর্তি। মূর্তির দু’ধারে আলো।
করজোড়ে অনুনয় করে যোগানন্দ বললেন, ‘সব কি শেষ হয়ে গেছে?’ গুরুদেব একটু মাথা নেড়ে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
পরদিন সকালে পুরী প্ল্যাটফর্মে এসে নামলেন যোগানন্দ। মনে তখনও ক্ষীণতম আশা। এমন সময় একজন অপরিচিত লোক তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে বলল, ‘আপনার গুরুদেব দেহরক্ষা করেছেন।’ বলেই লোকটা চলে গেল।
যোগানন্দজির শরীর অস্থির অস্থির করতে থাকল। অজ্ঞান হওয়ার মতো যখন অবস্থা তখনই তিনি নিজের মধ্যে গুরুদেবের স্বর শুনতে পেলেন, ‘শান্ত হও, স্থির হও।’
আশ্রমে পৌঁছে যোগানন্দ শুনলেন গতকাল সন্ধ্যা সাতটার সময় যুক্তেশ্বর গিরি দেহ রেখেছেন। যোগানন্দজির সামনে গুরুদেব কাল আবির্ভূত হয়েছিলেন ওই একই সময়ে!
পরমহংস যোগানন্দ ১৯৩৬ সালে তাঁর গুরুর দর্শন পান বোম্বাইয়ে রিজেন্ট হোটেলে। তিনতলা ঘরে হঠাৎ জ্যোতি এসে ভরে যায়। জ্যোতি থেকে বেরিয়ে আসেন রক্তমাংসের শরীরে যুক্তেশ্বর গিরিজি।
যোগানন্দ জিজ্ঞেস করলেন, ‘পুরীতে আপনার দেহ আমি নিজে হাতে সমাধি দিয়েছিলাম। আপনি কি তেমনই দেহ ধারণ করে এলেন?’
যুক্তেশ্বর গিরি বললেন, ‘এটা রক্তমাংসের শরীর হলেও আমার চোখে সূক্ষ্ম। তুমি আমার জড়দেহের সমাধি দিয়েছিলে। ঠিক তারই মতো একটি সম্পূর্ণ নতুন দেহ আমি মহাব্যোম থেকে সৃষ্টি করে তোমার কাছে এসেছি।’
যোগানন্দ গুরুদেবকে প্রণাম করে আলিঙ্গন করে বুঝলেন, তাঁর গা থেকে আগের মতো মৃদু একটা সুরভী বের হচ্ছে। শ্রীরামপুর আশ্রমে থাকাকালীন পুরনো কথা সব মনে পড়ে যাচ্ছে শিষ্য যোগানন্দের।
যুক্তেশ্বর গিরি বললেন, ‘জড় জগতে মানুষের কর্মক্ষয়ে সাহায্য করতে যেমন মহাপুরুষেরা প্রেরিত হন আমিও তেমনই এক সূক্ষ্মজগতের মুক্তিদাতারূপে কাজ করতে ঈশ্বর কর্তৃক আদিষ্ট হয়েছি। যেখান থেকে আমি এসেছি তার নাম হিরণ্যলোক। সেখানে উচ্চস্তরের জীবাত্মারা সূক্ষ্মদেহে থাকেন। মৃত্যুর সময় যাঁরা সমাধিমগ্ন হয়ে দেহ ছেড়ে দেন তাঁরাই ওখানে থাকেন। সূক্ষ্মজগতে বহু আত্মীক বাস করেন। তাঁরা আলোকপিণ্ডের সাহায্যে গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ঘুরে বেড়ান। সেখানে পৃথিবীর মতো জলবায়ু, ঋতু নেই। সাধারণ সূক্ষ্মলোক হল পরলোক। সেখানে শুভ আত্মারা সব বিচরণ করেন। দুষ্ট আত্মাদের গতিবিধি নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে থেমে যায়। পরলোকে যেতে পারে না তারা। প্রেতলোকে থাকে তারা। সূক্ষ্ম জগতের সবকিছুই ঈশ্বরের ইচ্ছায় আর কিছুটা আত্মীকদের ইচ্ছার আহ্বানে প্রকাশিত হয়।’
মৃত্যুর আগের পরিবর্তন
মহাত্মারা বলছেন, ‘মানুষের মৃত্যু একটা আবৃত্তি।’ একটা জিনিসের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়াটাই হল আবৃত্তি। চক্রের মতো মানুষের মনটারও ওই একইরকমের গতি। মানুষের মনও একটা আবৃত্তি। মনের ঘোরাফেরাটাকেও যোগীরা বলছেন, মৃত্যু। মৃত্যুর দুটো শক্তি থাকে। একটা শক্তি সবাইকে সে আবর্তিত করছে, ঘুরিয়ে মারছে। মৃত্যু থেকে জন্ম, জন্ম থেকে মৃত্যু। এই ঘুরে চলাটিকে উপনিষদের ঋষিরা বলছেন, মর্তশক্তি। সাধারণ মানুষেরা মৃত্যুর এই ভয়ঙ্কর শক্তির বলেই কেবল আসা-যাওয়া করছে পৃথিবীতে, আর দুঃখ-ক্লেশ ভোগ করে মরছে। মৃত্যুর আরেকটা শক্তি রয়েছে তাকে ঋষিরা বলছেন, মরশক্তি— মরুৎশক্তি। এই শক্তিটা আমাদের আবর্তনের ওপারে নিয়ে চলে যায়। সেখানে মৃত্যু জ্যোতিস্বরূপ হয়ে ওঠে। লৌকিকভূমি পার করে তপস্বীরা, যোগীরা চলে যান আর ব্যবহারিক ভূমি এই পৃথিবীতে সাধারণ ভোগবাদী মানুষরা ফিরে-ফিরে আসে।
আমরা বিশ্বাস করি জীব মাত্রেই পুনর্জন্ম হয়, মানুষ মাত্রেই পুনর্জন্ম হয়। আমাদের এহেন বিশ্বাসকে সমর্থন দেননি কিন্তু উপনিষদের ঋষিরা। তাঁরা বলেছেন, মৃত্যুর পর মানুষের তিন ধরনের গতি হয়। যে সমস্ত মানুষের চেতনা ঊর্ধ্বমুখী থাকে, ঊর্ধ্বমুখী হয়ে আবার ফিরে চলে আসে পৃথিবীতে। আবর্তগতি। ফিরে ফিরে আসা। এটা পিতৃযানের পথ। সাধারণ মানুষের এই ধরনের গতি হয়। আর যাঁদের চেতনা একেবারে ঊর্ধ্বে উঠে যায়, পৃথিবীতে আর ফিরে আসে না— ঊর্ধ্বলোক থেকে আরও ঊর্ধ্বলোকে উঠে যায়, তাঁদের হয় দেবযানের উৎক্রান্তি। এই ধরনের মৃত্যু হয় সাধু-মহাত্মা, যোগী-তপস্বীদের। আর একটা তৃতীয় ভূমি রয়েছে— যেখান থেকেও মানুষের পুনর্জন্ম হয়, এখানকার মানুষেরা জন্মাচ্ছে আবার মরে যাচ্ছে— তাদের না হচ্ছে সংসারগতি না ঊর্ধ্বগতি।
অনেক মানুষের চেতনা থাকে খুব নীচের স্তরে। ঊর্ধ্বে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাদের থাকেও না। এদের পুনর্জন্ম নাও হতে পারে। গাছেতে অজস্র ফুল ধরে, প্রত্যেক ফুলেরই ফল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে কিন্তু আমরা দেখি যে কিছু ফুল ঝরে যায়। আর যা ফল হয়, সবগুলো পাকে না। ঋষিরা বললেন, ‘সমস্ত জীবজন্তু, মানুষ— ভূতবর্গের মধ্যে এরকম ব্যাপারও ঘটে। সবার যে জন্মান্তর হবে এরকম মনে করবারও কোনও কারণ নেই। জন্মান্তর তাদেরই হয় যারা একদিন পাকবে ওই ফলের মতো।’
বাসনা যাদের প্রবল তাদের ফিরে আসতেই হবে। এটাই ভবিতব্য। যাদের বাসনা এ জন্মে না মেটে তাদের ফেরার সম্ভাবনা অত্যধিক। কোন ধরনের মানুষ ফিরবে তার একটা সূত্র দিয়েছেন পৌরাণিক ঋষিরা। তাঁরা বলছেন, ‘মৃত্যু যখন মানুষের কাছাকাছি আসতে থাকে তার ছায়া তাকে ছেড়ে চলে যায়। তেলে, জলে নিজের ছায়া দেখা যায় না। মৃত্যুর আগে যে মানুষদের জীবনে এরকম ঘটনা ঘটে তারা ফিরবে। একটা একাকিত্বের পরিবেশ যদি চলে যাওয়ার আগে কোনও মানুষের মধ্যে থেকে যায় তাহলে এরাও ফিরবে। অনেক মানুষের মৃত্যুর আগে গা থেকে একটা অদ্ভুত গন্ধ ওঠে— ফুল, ধূপ কোনও চেনা সুগন্ধ বা দুর্গন্ধের সঙ্গে মিল থাকে না। এ হল আসক্তির গন্ধ। এরা চক্রাকারে পাক খাবেই। আয়নাতে নিজের ছায়া যখন বড় দেখা যায়, বিসদৃশ একটা অবয়ব ফুটে ওঠে, বুঝতে হবে মৃত্যু আসন্ন আর শরীর সর্বস্ব ভাবনার কারণে তাকে ফের এখানে আসতে হচ্ছেই। চোখের সামনে হঠাৎ চাঁদ দেখতে পাওয়া কিংবা একই আকাশে সূর্য-চন্দ্র একসঙ্গে দেখা— এই দৃষ্টিভ্রম ঘটলে বুঝতে হবে যে যাওয়ার যেমন সময় হল তেমনই মায়াসিক্ত দ্বৈত অনুমতির ফলস্বরূপ তাকে মায়া ঘেরা জগতে ফের এসে বাস করতে হবে। হঠাৎ কোনও মানুষের গায়ের রং যদি লালচে, হলদে হয়ে যায় বুঝতে হবে মৃত্যু আসন্ন। জিভ, মুখ, নাক অসাড় হয়ে গেল, নিমেষে দৃষ্টি একেবারেই ক্ষীণ— কিছু দেখা যাচ্ছে না, তাকালেই নিজের মৃতদেহটা কেবল ফুটে উঠছে— এইরকম ঘটনাগুলো সব দেহবদ্ধতার কারণে ঘটে। দেহ ঘিরে যাদের বেশি ভাবনাচিন্তা থাকে, রোগ হলে উতলা হয় যারা, তাদের মৃত্যুর কিছুদিন আগে থেকেই এ সমস্ত ঘটতে থাকে। গরুড় পুরাণের ঋষিরা এইসব সংকেত আমাদেরকে দিয়ে গিয়েছেন।
বেদের ঋষিরা পাঁচজন দেবতার কথা বলেছেন—
অগ্নি, বায়ু, ইন্দ্র, সূর্য ও মৃত্যু। শরীরটাই আমাদের পৃথিবী। পঞ্চভূতের একটা ক্ষিতি, এই ক্ষিতির মধ্যে রয়েছে অগ্নি দেবতা— ভূতাগ্নি, জঠরাগ্নি সব আগুন দেহের মধ্যে আছে। এই আগুনে খাবার দাবার যেমন পরিপাক হয় তেমনই সাধনা চলে। মণিপুর চক্রে থাকেন অগ্নি দেবতা। বায়ু দেবতা থাকেন হৃদয়ে— অনাহত চক্রে। ধ্যানে যে জ্যোতি দেখি তা বায়ু অন্তরিক্ষ তৈরি করে। এই হল দেহের আরেকটা ভূত। ধ্যানের ভেতর শুদ্ধ মনের যে জ্যোতি, তাই হল ইন্দ্র। ওই জ্যোতির ওপরে সূর্য। অখণ্ড চৈতন্যকে ঋষিরা বলছেন, সূর্য। সূর্যের ওপারে মৃত্যু, অন্ধকার। চেতনার একটা ভূমি থেকে আরেকটা ভূমিতে সাধনার মধ্যে দিয়ে যাঁরা চলে যান তাঁরাই মৃত্যুকে ভয় পান। মৃত্যু হল একটা অব্যক্ত তত্ত্ব। আমাদের শরীরের প্রতি প্রচণ্ড আসক্তি থাকে বলেই মৃত্যুর কথা শুনলেই আমরা ভয় পেয়ে যাই।
আমার সঙ্গে আজ থেকে বারো বছর আগে এক জ্ঞানসিদ্ধা মাতাজির সাক্ষাৎ হয়েছিল তারাপীঠের কাছে মদিয়ান গ্রামে। তিনি তখন এসেছিলেন কামাখ্যা থেকে। তাঁর এক গুরুবোন সঙ্গে ছিলেন। তিনি এসেছিলেন কাশী থেকে। মদিয়ানের কুঠিয়াতে যে রাতে আমরা ছিলাম, সেখানে এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা ঘটেছিল। মাতাজির গুরুবোন সে রাতে রাজহাঁসের ডিমের তরকারি খেতে চাইলেন। মাতাজি সে রাত্তিরেই তড়িঘড়ি তাঁকে রেঁধে খাওয়াতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। আর মায়ের গুরুবোন উপস্থিত সাধুগুরুদের কাশী যাওয়ার নিয়ন্ত্রণ করলেন। গুরুবোনের জন্য রাজহাঁসের ডিমের তরকারি রাঁধতে রাঁধতে মাতাজি তাঁর গুরুভাই কাশীর সুমেরু মঠের সোমানন্দ অবধূত ঠাকুরকে বললেন, ‘ডিমটা রান্না হলে যুক্তামুখীকে খাইয়ে দিতেই তুমি বাবা ওকে মল্লারপুর পাঠিয়ে দিও।’
অবধূত বললেন, ‘এত রাতে কীভাবে যাবেন তিনি?’
মাতাজি বললেন, ‘যেতেই হবে যে বাবা, আর ওই রাজহাঁসের ডিম না খেয়ে ও যদি চলে যায়, ফের আসতে হবে।’
অবধূত চমকে বলে উঠলেন, ‘এর মানেটা কী মাতাজি?’
জ্ঞানসিদ্ধা মাঈ বললেন, ‘আমার গুরুদেব ছিলেন প্রধাবন সাধু। যাঁরা উপস্থিত মৃত্যুর চিহ্ন শরীরে ধরতে পারেন তাঁদের বলে প্রধাবন সাধু। আমি এই বিদ্যা গুরুর কাছ থেকে রপ্ত করেছি। আজ দুপুরে আমি দেখেছি যুক্তামুখীর ছায়া প্রখর রোদের সময় বসে থাকলেও দাওয়াতে পড়েনি। মানুষের চলে যাওয়ার সময় হলে এই ঘটনা ঘটে। দেহের ছায়া যেদিন মরে যায় পরদিন সূর্য ওঠার আগে সে চলে যায়। আমার গুরু যদি সত্যি হন আর প্রাচীন ঋষিদের কাছ থেকে পাওয়া এই প্রধাবন বিদ্যা যদি সত্যি হয়, তাহলে কাল সকালের সূর্য ওঠার আগেই যুক্তামুখী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করবে। মল্লারপুর শিববাড়িতে আজ থেকে তিনশো বছর আগে এক নাগা সাধু জীবন্ত সমাধি নিয়েছিলেন। তিনি সমাধি খুঁড়ে শিষ্যদের বলেছিলেন মাটি চাপা দিতে। সেই সাধু ছিলেন মাতৃসাধক রামপ্রসাদ সেনের তন্ত্রগুরু। ওখানে এখনও সূক্ষ্ম শরীরের অনেক মহাত্মারা রাত্তিরে আসেন। যুক্তামুখী ওখানে গেলেই ওঁর আত্মার সদগতি লাভ করবে।’ সত্যি কথা বলতে কী, উপস্থিত সকলেরই তখন মাতাজির ভাবাবেশে বলা কথাগুলো কেমন যেন প্রলাপ মতো মনে হচ্ছিল। কিন্তু পরদিন সকাল হতেই যখন সত্যি সত্যি খবর এল মদিয়ানে— যুক্তামুখী মাতা মহাত্মা কৃষ্ণানন্দের জীবন্ত সমাধির বেদিতে ধ্যানরতা অবস্থাতেই দেহ ছেড়ে দিয়েছেন! তখনই সবার টনক নড়ে গেল। জ্ঞানসিদ্ধা মাতাজি কেবল বললেন, ‘সর্গেষু লোকেষু শরীরত্বায় কল্পতে।’ আর কোনও কথাই বলতে পারলেন না। তাঁর সমাধি হয়ে গেল। এই ঘটনাটি আমার স্বচক্ষে দেখা। একশোর কাছাকাছি বয়স নিয়ে মাতাজি এখনও দেহে বর্তমান। মানুষের শরীর চলে যাওয়ার সময় কারা অগ্রিম কী কী অনুধাবন করতে পারবেন সে সম্পর্কে প্রধাবন সিদ্ধা মাতাজির কাছ থেকে যেটুকু আমি সংগ্রহ করতে পেরেছিলাম তাই এখানে সাজিয়ে দিলাম।
১. যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ভুগেই চলেছেন, একেবারেই বিছানাতে মিশে গিয়েছেন তাঁদের চেতনার ঊর্ধ্বমুখীন শক্তি একেবারেই নীচে নেমে যায় বলে এ ধরনের মানুষেরা চট করে যান না কখনও।
২. শরীরে যাঁদের অন্নময় চেতনা বেশি— সর্বক্ষণ জাগতিক চিন্তা নিয়েই আছেন, সারাটা ক্ষণ টাকা টাকা করে কাটাচ্ছেন, একে ঠকাচ্ছেন ওকে হেনস্তা করছেন, এ ধরনের মানুষের শরীরে হঠাৎ জড়ত্ব নেমে আসে। চেতনা হারিয়ে তাঁরা দীর্ঘকাল থাকেন আর শরীরের দুর্ভোগটা বুঝতেও পারেন না। এঁরা যখন চলে যান, তখন কিছুই যাওয়ার আগাম আভাস পান না।
৩. কিছু বিরল মানুষের শরীরে থাকে দেবচৈতন্য। তিন ধরনের চৈতন্য থাকে শরীরের মধ্যে— স্থূলচৈতন্য, সূক্ষ্মচৈতন্য আর দেবচৈতন্য। দেবচৈতন্যের অধিকারী যাঁরা মৃত্যুর আগাম সংকেত তাঁরা পান। মৃত্যুর আগে সমস্ত রকম জাগতিক দায়- দায়িত্ব পরবর্তী উত্তরসূরিদের হাতে অর্পণ করেই যান এঁরা। সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে বলতে দেবচৈতন্যের অধিকারীগণ অন্তরাবৃত্ত হয়ে গিয়ে অপরের আত্মচৈতন্যকে পর্যন্ত দেখতে পান।
৪. দেহ, ইন্দ্রিয় ও সকল মানসক্রিয়া থেকে যাঁরা একেবারে মুক্ত, যাঁদের সুখ-দুঃখের বোধগুলো চলে যায়, যাঁরা নিজের শাশ্বত স্বভাবকে ধরতে জানেন তাঁরা মৃত্যুমুক্ত।
৫. চিরবিকারহীন আত্মসত্তার দিকে যাঁদের প্রবল মনোযোগ থাকে তাঁরা নিজেদেরকে দুঃখ-ক্লেশের ভোক্তা বলেই মনে করেন না বলে দেহ থেকে প্রয়োজনমতো মন তুলে নিতে পারেন। ইচ্ছামৃত্যু এঁদের একমাত্র হতে পারে। যেমন গঙ্গার পুত্র ভীষ্মের হয়েছিল।
৬ . নাড়িমালা দেখে যে কোনও রোগী মৃত্যুজ্ঞান লাভ করতে পারেন। যদি রোগীর শরীর অতিশয় ক্ষীণ হয়ে যায়, চামড়ার বাইরে সমস্ত শিরা ফুটে উঠতে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে যে শরীরের মধ্যকার নাড়ি কেঁচো ও সাপের মতো পাতলা ও মসৃণ হয়ে বেঁকে বেঁকে গোটা দেহটাতে বইছে বলেই সেটা ক্ষীণশক্তির দিকে ক্রমশ এগচ্ছে। এই ধরনের শরীর হলে একমাসের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু ঘটবে।
৭. যদি কোনও মানুষের দিকভ্রম প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকে— উত্তর-দক্ষিণ ঠিক করতে পারেন না, তাহলে বুঝতে হবে যে তাঁর আয়ু কমে এসেছে।
৮. স্নান করার পরপর যদি হৃদয় প্রদেশ শুকনো-শুকনো লাগতে থাকে, ধোঁয়া-ধোঁয়া লাগে চোখ, অন্তত একমাস কাল যাবৎ যদি এই একই অনুভূতি আসে স্নানের পর তাহলে তাঁর মৃত্যুগ্রাসে পতিত হওয়ার আশঙ্কা আছে।
৯. কোনও মানুষের খুব খারাপ স্বভাব হঠাৎ যদি ভালো হয়ে যায় বুঝতে হবে যে তিনি আর বেশিদিন ইহজগতে নেই।