


বসন্ত ভট্টাচার্য
সাত সকালে মাঠের কাজে যাওয়ার পথে আজই প্রথম দেখতে পেল ভুবন। রেললাইন বরাবর মাঠ ভরা সাদা সাদা কাশফুল ফুটে আছে। শরৎকাল এসে গেছে, মা আসছেন। আবার তাকে কাশীপুর জমিদার বাড়িতে ঢাক বাজাতে যেতে হবে।
বাড়ি ফিরে সুটকেস খুলে পরম যত্নে পাট করে রাখা বাহারি কাজ করা সিল্কের পাঞ্জাবিটা পড়ন্ত রোদে মেলে দেয় ভুবন। পাঞ্জাবিটা তো আর আজকের নয়। সেই দশ বছর আগে রায় বাড়ির বড়কর্তা পুজোর দিনে ভুবনকে দিয়েছিলেন। পাঞ্জাবিটা ওঁর গায়ে টাইট হওয়ায় বড়কর্তা আর সেটা নিজে পরেননি। ভুবনকে দিয়ে বলেছিলেন মায়ের পুজোতে এটা গায়ে দিয়ে ঢাক বাজাবি।
নিজের থেকেও বেশি যত্ন সে পাঞ্জাবিটাকে রাখে। পুজোয় ঢাক বাজিয়ে বাড়িতে ফিরে সাবান-কাচা করে রোদে শুকিয়ে ভাঁজ করে আবার সুটকেসে তুলে রাখে।
এবার বছর আটেকের ছেলে কৃষ্ণ এসে দেখে বাবা পাঞ্জাবি রোদে দিচ্ছে। সে বলে এই রবিবারের পরের রবিবার দুর্গাপুজো আমি তোমার সঙ্গে যাব। কাঁসি বাজাবো। আপত্তি করে না ভুবন। বলে, বেশ তো যাবি।
মনে পড়ে, এই এমনি বয়সে, সেও একদিন তার বাবার কাছে জমিদারবাড়ি যাবার বায়না ধরেছিল। বাবা তাকে ফেরায়নি, সঙ্গী করেছিল।
দেখতে দেখতে যাবার দিন এসে গেল। সকালে উঠেই তালদি স্টেশান থেকে শিয়ালদহের ট্রেন ধরল বাপ-ব্যাটায়। সঙ্গে ঢাক আর কৃষ্ণর হাতে ব্যাগ। তাতে বাবার ধুতি-পাঞ্জাবি, নিজের জামা-প্যান্ট আর কাঁসি। ভেন্ডর-কামরায় উঠে একপাশে ঢাক রেখে নিশ্চিন্ত ভুবন।
শিয়ালদহ নেমে আবার ধরল কৃষ্ণনগর লোকাল। এবারও ভেন্ডর কামরাতেই বসল ভুবন। জানালার পাশে বসতে পেল কৃষ্ণ। চোখে-মুখে তার খুশির ছোঁয়া। অবশেষে কৃষ্ণনগরে পৌঁছে, সোজা প্ল্যাটফর্মের চায়ের দোকানে এল বাপ-ব্যাটায়। শিঙাড়া-চা খেয়ে ট্রেকারে চেপে সোজা কাশীপুর রাজবাড়ি।
সামনেই ইঁট রঙের মস্ত জমিদার বাড়ি। স্থানীয় লোকদের কথায় রাজবাড়ি। রাস্তার উপরেই প্রকাণ্ড লোহার গেট। অপর পারে বয়ে যাওয়া ক্ষীণ স্রোতা এক নদী। তার ঠান্ডা বাতাস এসে লাগে বাপ-বেটার শরীরে। ভুবন বলে, এই রাজবাড়িতেই আমরা ক’দিন থাকব।
মস্ত উঠোন পেরিয়ে, তিন-মহলা বাড়ির প্রথম মহলে এসে ওঠে দু’জনে। লম্বা টানা বারান্দায় এপাশে বড় চৌকি পাতা। ঢাকটাকে সেখানে রেখে সামনের ঘরের পর্দা সরিয়ে ভুবনরা এসে দাঁড়ায় ইজি চেয়ারে শুয়ে খবরের কাগজ পড়তে থাকা বড় কর্তার সামনে। ওঁর পায়ে হাত ছুঁইয়ে প্রণাম করতেই কাগজের আড়াল সরিয়ে উনি বললেন, কে, ভুবন এসেছিস! সঙ্গে কে? ছেলে?
আজ্ঞে হ্যাঁ বড়বাবু। ওর নাম কৃষ্ণ।
কথা শেষ হতেই ঝপ করে বড়কর্তার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে কৃষ্ণ ভুবন বলে, আমার ঢাকের সঙ্গে এবার ও কাঁসি বাজাবে।
বেশ, বেশ কথা। সবই মায়ের ইচ্ছে।
কথার শেষে তাঁর খাস লোক বনমালীকে ডাকেন। বনমালী, ভুবনদের থাকবার ঘরটা দেখিয়ে দে। খাবার সময় ডেকে নিয়ে যাস।
চল ভুবনদা।
ভুবনদা এবার হাঁটতে হাঁটতে মণ্ডপ ঘর পেরিয়ে পাশের সারি সারি ঘরের একটার ভিতরে এসে ঢোকে। এবার এখানেই তোমরা থাকবে ভুবনদা।
বেশ বড়সড়ই ঘর খানা। ভেতরে চৌকি পাতা। পাশে গুটোনো বিছানা। জানালা খুললেই অদূরে নদীর বয়ে যাওয়া। কৃষ্ণর সঙ্গে ভুবনও খুশি।
এই রায়বাবুদের বাড়ি ভুবনের পুরনো বাড়ি। তিন পুরুষ ঘরে ভুবনরা এবাড়ির দুর্গা পুজোয় ঢাক বাজায়। ভুবনের ছেলেবেলায় দাদুর সঙ্গে, বাবার সঙ্গে সেও আসত কাঁসি বাজাতে। তার ছেলেবেলায় দিনের মতো কৃষ্ণও এসেছে এবার তার সঙ্গে কাঁসি বাজাতে।
আজ চতুর্থী। মণ্ডপে নানা সাজ-সজ্জায় ঠাকুরকে সাজানো চলছে। বাপ-বেটার আজ আর কোনও কাজ নেই। দু’জনেই মণ্ডপের এক কোণে বসে ঠাকুর-সজ্জা দেখছে। ঠাকুরকে গহনা পরানো হচ্ছে। পুরানো দিনের ভারী-ভারী গহনায় মূর্তির মুখে যেন তৃপ্তির হাসি। আগামীকাল বোধন, অধিবাস। পুজোর শুভ সূচনা।
তারপর সপ্তমী, মহাষ্টমী, সন্ধিপুজো, মহানবমী। রোজ সকালে দেবীর মহাস্নান, ভোগ-আরতি। সব সময়ই আছে ঢাকের বাজনা। একেবারে ঠাসা প্রোগাম থাকবে ভুবনের। একটা নতুন গৎ আয়ত্ত করেছে এবার। সেটা সন্ধি-পুজোয় বাজাবে। খুশি হবেন বাবুরা।
ঠাকুর সাজানো শেষ। ইতস্তত ছড়ানো ছিটোনো জিনিসপত্র গুছোতে থাকে কুমোরের দলের ছেলেটা। অনেক কাজ। আপনা থেকে কৃষ্ণও এসে গুছোয়নোয় হাত লাগায়। এক গোছা ছোট-বড় তুলি গুছিয়ে ওদের দিতে যায় কৃষ্ণ। ছেলেটা বলে ও আর কাজে লাগবে না। তুই নিয়ে নে।
খুশি হয় কৃষ্ণ। এবার রঙের কৌটো তুলতেই ছেলেটা আবার বলে, ওসব আমাদের লাগবে না। তুই নিবি তো নিয়ে নে। পুতুল বানিয়ে রং করতে পারবি।
অনেক যত্নে কতকগুলো খালি রঙের কৌটোও গুছিয়ে নেয় কৃষ্ণ।
বিকেলবেলা লাঠি হাতে বড়কত্তাকে ধরে ধরে মণ্ডপে এনে বসালো বনমালী। খানিকক্ষণ বসেই উঠে পড়লেন বড়কর্তা। ইশারায় অদূরে বসে থাকা ভুবনকে ডাকলেন। ভুবন কাছে আসতেই ইশারায় বাইরে নদীর পাড়ে যাবার কথা বললেন।
বাড়ি বরাবর নদীর পাড়ে সিমেন্টে বাঁধানো বসার জায়গা। বড়কত্তা সেখানে বসে ক্লান্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন। বললেন, শোন ভুবন, আমাদের মায়ের পুজো কিন্তু ভাগ হয়ে গেছে। ও বছর আমি করেছি। এবার মেজ তরফের পালা। সামনের বার ছোট তরফ করবে। তারপর আবার আমার পালা।
কথার শেষে আবার ক্লান্তি হাপ ছাড়েন। বনমালী ওঁর পিঠে হাত বুলোতে থাকে। উনি বলেন, মেজবাবু একেবারে শয্যাশায়ী। উঠে বসারও ক্ষমতা নেই। ওর ছোট ছেলে কুনালই দেখাশোনা করছে। সেই এবার পুজোর কর্তা।
চুপ করে কথাগুলো শোনে ভুবন। ভেবেছিল মাকে নতুন গৎ-এর বাজনা শুনিয়ে বড়কত্তাকেও খুশি করবে। তাতে যেন হঠাৎ বাধা এল।
পঞ্চমীর সন্ধ্যার মধ্যে আত্মীয়-পরিজনে বাড়ি মণ্ডপ একেবারে জমজমাট। মণ্ডপের দেওয়ালে পুরানো আমলের দেয়াল ঘড়ি। সাতটায় হবে বোধন, পরে অধিবাস।
বোধনের আগে বরাবরই মিনিট দশেক ধরে আনন্দ বাজনা বাজায় ভুবন। এবারও ঠাকুরমশাইয়ের অনুমতির অপেক্ষায় আছে সে।
অন্যদিকে সেজকত্তার ছোট ছেলে কুনালবাবু তিনজন লোক নিয়ে মণ্ডপে, উঠোনে, বাড়ির গেটে সাউন্ড বক্স বসাচ্ছে। অনেক বক্স বসানো হয়েছে।
খুশি হয় ভুবন। তার ঢাকের বাজনা এবার ছড়িয়ে পড়বে বহু দূর অবধি।
সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা বেজে গেছে। ভুবন এবার গুটি গুটি পায়ে ঠাকুরমশাইয়ে কাছাকাছি আসে। সেখান থেকেই হাতজোড় করে বলে, বাবাঠাকুর, অনুমতি করুন, মাকে একুট আনন্দ বাজনা শোনাই।
হাতের কাজ করতে করতেই ঘাড় নাড়েন ঠাকুরমশাই। নির্জন পরিবেশে হঠাৎ করে ভুবনের ঢাকে কাঠির ঘা পড়ে। সঙ্গে কৃষ্ণর কাঁসির ধ্বনি। বেশ কিছুক্ষণ বাজিয়ে বাজনা থামায় ভুবনরা। ঠাকুরমশাই বলেন, বড় ভালো আনন্দ বাজনা বাজালে ভুবন। এবার বোধন হবে। খুশি হয়ে মা সাড়া দেবেন।
পরদিন মহাসপ্তমী। সকাল থেকে আত্মীয়বন্ধুদের স্রোত চলল মণ্ডপে। ঠাকুরমশাই তাঁর সহকারীকে নিয়ে দেবীর মহাস্নানের ব্যবস্থা করছেন। বাঁহাতে ঘণ্টা আর ডানহাতে কুসি-পূর্ণ গঙ্গাজল নিয়ে স্নানমন্ত্র শুরু করলেন। সঙ্গে সঙ্গে বেজে উঠল ভুবনের ঢাক, সঙ্গে কৃষ্ণর কাঁসি।
সে কয়েক মুহূর্ত মাত্র। তারপরই সবগুলো সাউন্ড বক্স থেকে ভেসে আসতে লাগল ঢাকের বাজনা, অন্য সুর আর ভিন্ন ছন্দে! দুটো বাজনাই চলেছে!
হঠাৎ করে হুঙ্কার ছাড়তে ছাড়তে কুনালবাবু এগিয়ে এল। কী রে, কানে যাচ্ছে না। থামাতে বলেছি। থামছিস না কেন!
কথার শেষে ভুবনের কাছ থেকে ছোঁ-মেরে ঢাক বাজাবার কাঠি দু’টো নিয়ে নেয় কুনালবাবু। ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে কাসি বাজানো থামায় কৃষ্ণ। যেন চুরির দায়ে ধরা পড়েছে, এমনিভাবেই মণ্ডপের একপাশে দাঁড়িয়ে রইল ভুবন ঢাকি আর কৃষ্ণ।
একে একে মহাসপ্তমী, অষ্টমী, সন্ধিপুজো আর মহানবমী শেষ হল। ভুবনের আর ঢাক বাজানোর ব্যাপার রাখেনি কুণালবাবু। সারাক্ষণ মাইকে ঢাক বেজেছে।
তবুও সিল্কের পাঞ্জাবি পরে মণ্ডপের কোণে ঢাক বাজানোর অপেক্ষায় থেকেছে। আশা ছিল, কাঠি দুটো ফেরত পাবে। আবার সে ঢাক বাজাবে। সঙ্গে কাঁসি বাজাবে কৃষ্ণও।
না। ঢাক বাজানোর আর কোনও ব্যাপার রাখেনি কুনালবাবু। বক্সের মাধ্যমেই অসংখ্যবার ঢাক বেজেছে। বাপ-বেটায় শুধু মণ্ডপের কোণে বসে থেকেছে। খাবার সময় বনমালী এসে খেতে ডেকে নিয়ে গেছে।
আজ দশমী। পরিবারের রেওয়াজ অনুযায়ী সূর্যাস্তের আগেই ভাসান হয় প্রতিমার। কুনালবাবু আর তার সঙ্গী-সাথীদের ব্যস্ততার আর শেষ নেই। সাউন্ড বক্স বাড়ানো হয়েছে। আরও মণ্ডপ থেকে নদীর ঘাট অব্দি ছড়িয়ে রয়েছে সব। বিরামহীন ভাবে ঢাকের বাজনায় মুখরিত সবটা অঞ্চল। মন-কাঁদানো সে বাজনা বয়ে আনছে বিদায়ের সুর।
প্রতিমা বাইরে এসেছে। কাঠামোয় কাঁধ দেবার লোকও তৈরি। এসময় একেবারে কুণালবাবুর মুখোমুখি ভুবন। দেখে, কুণালবাবুর হাতে রয়েছে তার ঢাক বাজানোর কাঠি দুটো। ভয় কাটিয়ে ভুবন বলে, কাঠি দু’টো দেন বাবু। ও আমার বাবার হাতে বানানো কাঠি। মায়া পড়ে আছে বাবু!
চুপ কর! খেঁকিয়ে ওঠে কুণালবাবু। এটাও ভাসানো যাবে।
বন্ধুদের সঙ্গে হাসি মস্করায় মেতে ওঠে কুণালবাবু। কাচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে থাকে ভুবন। ওর দাঁড়ানোর ভঙ্গিমায় মায়া হয় এক বন্ধুর। সে কুণালকে বলে, ওর কাঠি ওকে দিয়ে দে কুণাল। গরিব মানুষ। কাঁদছে!
দুটো কাঠিই ছুড়ে ফেলে দেয় কুণালবাবু।
ছুটে গিয়ে তুলে নেয় ভুবন। পরম মমতায় নিজের পরা কাপড়ের আঁচল দিয়ে ধুলো-বালি মোছে। কৃষ্ণ বলে, আমায় দাও, রেখে দিচ্ছি।
পরদিন সকালে বড়কত্তাকে প্রণাম করতে এল ভুবন। উনি বললেন সামনের বার না, তার পরের বার আসিস। আমার পালা থাকবে। তুই ঢাক বাজাবি। মনে থাকে যেন।
কথার শেষে একটা খাম এগিয়ে দেন বড়কত্তা। বলেন, তোর মজুরির টাকা আর বকসিসের টাকা আছে। আর ওই প্যাকেটে তোদের ধূতি-চাদর।
ভুবনের চোখে তখন জলের ধারা।
সব দেবতার ভাসান হয় না!