বিশ্বজিৎ মাইতি, বরানগর: আনন্দমঠে বর্ণিত ভারত মায়ের বিশালাকার মূর্তিকে ঘিরে রয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস। সন্তান দলের প্রতিজ্ঞা ও ত্যাগের চিত্রের মধ্যে অধিষ্ঠান করবেন দশভুজা। দেশপ্রেমের পাশাপাশি আধুনিক সভ্যতায় প্রকৃতি ও প্রযুক্তির ভারসাম্যের কাহিনি চমক দেবে দর্শনার্থীদের। পালাবদলের পানিহাটিতে চমক এতেই শেষ নয়। জলের তলায় থাকা দ্বারকানগরীতে শ্রীকৃষ্ণের লীলাভূমি থেকে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের সংগ্রামী জীবন ফুটবে ‘তাহাদের কথায়’।
৭৭ বছরে পা দেওয়া পানিহাটি এইচবি টাউনের বিজয়পুর সর্বজনীনের পুজোর থিম ‘ভারতভাগ্যবিধাতা’। ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি হয়েছে মণ্ডপ। বিশাল মণ্ডপের উপরে সাহিত্যসম্রাট কল্পিত ৩৫ ফুটের ভারত মায়ের মূর্তি দর্শনার্থীদের বিস্ময় জাগাবে। মণ্ডপের একদিকে নেতাজি, বঙ্কিমচন্দ্রসহ মনীষীদের ছবি থাকছে। অন্যদিকে থাকবে আনন্দমঠের গেরুয়াবসনধারী সন্তান দল। আর মণ্ডপজুড়ে থাকবে স্বাধীনতা আন্দোলন দমাতে ব্রিটিশদের ভয়াবহ অত্যাচারের চিত্র। মণ্ডপের অন্দর সজ্জাতেও আনন্দমঠের ভবনার পাশাপাশি ক্যাপ্টেন স্মিথ মচ্ছরের পাশাপাশি সাহসী বীর ভারতীয় সেনার ছবিও রাখা হয়েছে। অভিনব মণ্ডপে মায়াবি আলোর খেলায় বিমোহিত হতে হবে।
পুজোর প্রধান পৃষ্ঠপোষক জয় সাহা বলেন, আমাদের পুজোর চেতনায় আনন্দমঠ, ধ্বনিতে বন্দে মাতরম, আত্মায় ভারতমাতা। দর্শনার্থীরা মণ্ডপে এলে বিমোহিত হবেন। আগরপাড় ইলিয়াস রোডের আমরা সবাই (ইয়ং ম্যানস অ্যাসোসিয়েশন) পরিচালিত সর্বজনীন দুর্গোৎসব এবার ৫১ বছরে পা দিয়েছে। তাদের থিম ‘ভারসাম্য’। বিশালাকার মণ্ডপে ঢোকার সময়ে সবুজের সমারোহ ঘিরে ধরবে দর্শনার্থীদের। তারপরই দুদিকে গড়ে উঠেছে নগর ও যন্ত্র সভ্যতা। বিশালাকার বহুতলের পাশাপাশি শিল্পায়ন। মাঝে থাকা পিলারে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এআইয়ের কারিকুরি। নদীর মধ্যে থাকা নৌকায় দাঁড়িয়ে থাকবেন জগজ্জননী। নৌকার পাটাতনে বসে থাকবে লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ ও কার্তিক। জলের মধ্যে ভাসমান অসুররূপী প্লাসটিক টেনে নৌকায় তুলবে কার্তিক।
পুজো কমিটির সভাপতি তথা জেলা বিজেপি সভপতি চণ্ডীচরণ রায় বলেন, আমাদের সভ্যতায় প্রকৃতি ও প্রযুক্তি হাত ধরে এগোবে। কিন্তু তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করবে মানুষ। সেই ভারসাম্যে চিড় ধরলে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। সেই বার্তা আমরা দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরব।
শহিদ কলোনি স্পোর্টিং ক্লাবের পুজো এবার ৭৭ বছরে পা দিয়েছে। এবার তাঁদের থিম ‘দ্বারকানগরী’। গুজরাতের আরব সাগরের তীরে জলের তলায় থাকা ওই নগরীকে তুলে আনা হয়েছে। স্কুবা ড্রাইভের আদলে ডুবুরিরা জলে নামবে। মণ্ডপের মধ্যে দর্শনার্থীরা ঢুকলে অনুভব করবেন তাঁরা পৌঁছে গিয়েছেন জলের তলায়। নীল জলরাশির মধ্যে খেলে বেড়াবে রং বেরঙের মাছ। তার মধ্যে দেখা যাবে কৃষ্ণের নানা বয়সে দ্বারকানগরীতে তৈরি লীলা। কৃষ্ণের নানারূপের পাশাপাশি বাসুকি নাগের চিত্রে বিমোহিত হবেন দর্শনার্থীরা।
পুজো কমিটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক বিবেকানন্দ দাস (বিলু) বলেন, সবাই তো ওই দ্বারকানগরীতে স্কুবা ড্রাইভ করে যেতে পারেন না। আমরা মণ্ডপে আসা দর্শনার্থীদের বর্তমানে জলের তলায় থাকা দ্বারকানগরীতে নিয়ে যাব। অসাধারণ অভিজ্ঞতার সাক্ষী থাকবেন দর্শনার্থীরা। পানশিলা ঠাকুরবাড়ির পুজো এবার ৭৭ বছরে পা দিয়েছে। প্রত্যেকবার অভিনব ভাবনার চমক মণ্ডপে তুলে ধরেন উদ্যোক্তারা। এবার তাদের থিম ‘তাহাদের কথা’। বিশিষ্ট লেখক কমলকুমার মজুমদারের লেখা ‘তাহাদের কথা’ উপন্যাস থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মণ্ডপসজ্জা করা হয়েছে। মণ্ডপে প্রতিমা শিল্পীর পাশাপাশি মণ্ডপ তৈরির কারিগরদের ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। একইভাবে খবরের কাগজ বিক্রেতা, রান্নার গ্যাস সরবরাহকারী, ডেলিভারি বয়, নর্দমা পরিষ্কারের কাজে যুক্ত শ্রমিকদের জীবনযুদ্ধ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মা আসছেন থিমের সাজে। পুজো কমিটির সাধারণ সম্পাদক তুহিন সিনহা বলেন, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের লড়াইকে সম্মান জানাতে আমাদের
এই উদ্যোগ।



