সমীর সাহা, নবদ্বীপ: শারীরিক প্রতিবন্ধকতার দোসর অভাব-অনটন। কিন্তু, লক্ষ্যে অবিচল থাকলে সবই হার মানে। উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নবদ্বীপের ৩৪ বছরের মিঠুন দাস। সব প্রতিকূলতাকে জয় করে মৃৎশিল্পী হিসেবে সুনাম অর্জন করেছেন বৈষ্ণবতীর্থে।
ছেলেবেলা থেকেই বাঁ পায়ে সমস্যা। ট্রাই সাইকেল নিয়ে চলাফেরা করেন। তবে, প্রতিমা তৈরির সময় মিঠুনের মনের জোর দেখলে সবাই তাজ্জব হয়ে যান। মই বা উঁচু টুলকে সম্বল করে ১০-১১ ফুটের দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করেন চলেন অনায়াসেই। লক্ষ্মী, কালী, বিশ্বকর্মা, গণেশ সহ বিভিন্ন দেবদেবীর প্রতিমা তৈরি করে সারা বছরই তাঁর সংসার চলে। আর এই শারদীয়ার সময় মা ও স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন উমার মৃন্ময়ী রূপ গড়তে।
নবদ্বীপ পুরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বড় প্লটে বাড়ি মিঠুনের। বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। প্রতিমা তৈরি করে সামান্য আয়, নিজের প্রতিবন্ধী ভাতা, মায়ের বিধবা ভাতা এবং স্ত্রীর অন্নপূর্ণা ভান্ডারের টাকায় কোনও রকমে সংসার চলে। বাঁশ, সুতলি, মাটি, রং, কাপড়,সাজ সহ বিভিন্ন উপকরণের দাম এবং কারিগরের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় লাভও কমেছে।
এ বছর এখনও পর্যন্ত বড় তিনটি আর ছোট চারটি—সব মিলিয়ে সাতটি দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করেছেন মিঠুন। এর মধ্যে হুগলির শেওড়াফুলি ও পূর্ব বর্ধমানের কুড়মুড়ে এখনো পর্যন্ত দুটি প্রতিমা নিয়ে গিয়েছেন পুজো উদ্যোক্তারা। বাকি পাঁচটি নবদ্বীপের বিভিন্ন বারোয়ারি ও গৃহস্থবাড়ির পুজোর জন্য তৈরি হয়েছে।
মিঠুন বলেন, ‘পাঁচ বছর বয়সেই বাবা মারা যান। মা অন্যের বাসায় কাজ করে আমাকে বড় করেছেন। আমার এক মাস বয়সে পেটের রোগ হয়েছিল। ভুল করে ডাক্তারবাবু তখন পোলিওর ওষুধ খাইয়ে দিয়েছিলেন। সেই সময় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। তারপর থেকেই ডান পা ঠিক থাকলেও বাঁ পা আর স্বাভাবিকভাবে নাড়াতে পারিনি। ছোটবেলায় দাদু ও মায়ের কোলে চেপে স্কুলে যেতাম। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে ট্রাই সাইকেলে যাতায়াত শুরু করি।’
ছোট থেকেই প্রতিমা তৈরির প্রতি আগ্রহ ছিল মিঠুনের। স্কুলে যাতায়াতের পথে প্রতাপনগর খেজুরতলায় পালবাড়িতে প্রতিমা তৈরি করা দেখত। পরে স্থানীয় শিল্পী দিলীপ পালের কাছে কাজ শেখা । প্রায় ১০ বছর সেখানে কাজ শেখার পর ২০১৫ সালে নিজে নিতাই-গৌরের মূর্তি করে সে। প্রায় ১২ বছর ধরে ভাড়া নেওয়া জায়গায় নিজের হাতে বিভিন্ন দেবদেবীর প্রতিমা তৈরি করে চলেছে। কথায় কথায় মিঠুন জানালেন, ‘মা ও স্ত্রী নিয়মিত আমার কাজে সাহায্য করেন। তবে রাস উৎসবের বড় প্রতিমা তৈরির সময় মাচার উপরে উঠে কাজ করতে হয় বলে তখন অন্য কারিগরের সাহায্য নিতে হয়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও আমি নিজেকে একজন শিল্পী হিসেবেই পরিচয় দিতে চাই।’ মিঠুনের মা মায়ারানি দাস বলেন, ‘ছোট থেকেই ওর পায়ের সমস্যা। বেশি দূর হাঁটতে পারে না, বেশিক্ষণ দাঁড়িয়েও থাকতে পারে না। সংসারে অভাব রয়েছে। দুই নাতনি একজন চতুর্থ ও আর একজন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ওদের মানুষ করার জন্য বউমাকেদিপালীকে অন্যের বাড়িতে কাজও করতে হয়। সে সব সামলে আবার ছেলেকে সাহায্য করে।’



