অভিজিৎ চৌধুরী, চুঁচুড়া: বহু বছর আগে পুজো মণ্ডপে এসেছিল থিম। তারপর থিমের রকমফেরই হয়েছে পুজোর বাহ্যিক আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। থিম যেন গ্রিক পুরাণের সেই হারকিউলিস। যে সব কিছুকেই ধারণ করে নেয় অবলীলায়। তাই কোথাও থিমের আশ্রয় হয়ে ওঠে বিহারের মিথিলার শিল্পকলা, কোথাও বন্দেমাতরম ও তার স্রষ্টাই হয়ে ওঠেন শিল্পের আধার। আবার নিখাদ আলোর বর্ণচ্ছটাই অপরূপ এক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে পুজো মরশুমকে আলোকপ্রপাতে ভাস্বর করে তোলে। বাঙালির বাৎসরিক আনন্দযজ্ঞের মরশুমে তাই এখন চুঁচুড়া ও ব্যান্ডেলজুড়ে বিবিধের জন্য আসন পাতা হয়েছে। সুসজ্জিত সেই আসনের নাম, থিম।
সাবেক পুজোর ঘরানা থেকে থিমপুজোর আঙিনায় বহু বছর আগেই ঢুকে পড়েছিল ব্যান্ডেলের উজ্জ্বল সংঘ। পায়ে পায়ে এবার তাদের পুজো ৬৮ বছরে পা দিয়েছে। মিথিলার লোকায়ত শিল্পকলা, মধুবনীকে আশ্রয় করে এবার মণ্ডপ থেকে প্রতিমায় চমক জাগাতে চাইছেন উদ্যোক্তারা। বিহারের মধুবনী শিল্পকলা একাধারে নারীর শিল্পপ্রতিভা, প্রাকৃতিক ও সাধারণ উপাদানের শীর্ষে আরোহণ এবং নারী জীবনের গল্প শোনায়। বাঙালির উমার সঙ্গে সেই শিল্পের সংযোগ তাই খুবই সহজ। বস্তুত সেই কারণেই মাতৃশক্তির আরাধনায় মধুবনীর চমক আনছে উজ্জ্বল সংঘ। প্লাস্টার অব প্যারিস, কাপড়, কাগজ, সুতোর বুনোটে ধরে রাখা হচ্ছে মধুবনীর নানা আদল। মণ্ডপের অন্দর-বাহিরসজ্জার উপকরণ সেসবই। প্রাকৃতিক উপাদানের ব্যবহার মধুবনীর একটি বৈশিষ্ট্য। সেসব থাকবে মণ্ডপসজ্জায়। দেবী উমা সপরিবারে মৃন্ময়ীরূপে মণ্ডপে থাকবেন। কিন্তু তাঁর গড়নেও থাকবে মধুবনীর ছাঁচ। বিশেষ আলোকসজ্জার আয়োজন করা হয়েছে। তবে বিষয়টিকে আপাতত গোপন রাখতে চান আয়োজকরা। পুজোর উদ্যোক্তা পলাশ চক্রবর্তী বলেন, মধুবনীর ইতিহাসের একটি ঝলক মণ্ডপে দেখা যাবে।
চুঁচুড়ার আজাদ হিন্দ ক্লাবও প্রদর্শনীর পথেই হেঁটেছে। তাদের থিম বন্দেমাতরম। স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ির পুজো— এই থিমেই মণ্ডপ থেকে আলোকসজ্জা করা হচ্ছে। মণ্ডপজুড়ে বন্দেমাতরমের ইতিহাস, তার প্রভাব, বাংলার বিপ্লবীদের অগ্নিযুগের একটি অধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্রের বাড়ি সহ অনেক কিছু তুলে ধরছেন উদ্যোক্তারা। ইতিহাসের পাতা থেকে তুলে আনা পুজো, তাই দেবী এখানে সাবেকি সাজে ভক্তদের দর্শন দেবেন। আলোকসজ্জাতেও থাকছে সাবেকিয়ানার মিশেল। পুজোর উদ্যোক্তা সপ্তর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, আমাদের থিম, ‘সার্ধশতবর্ষে বন্দেমাতরম’। বন্দেমাতরমের সৃষ্টি, তার স্রষ্টা এবং সেই সময়কে আমরা এক সূত্রে বাঁধতে চেয়েছি পুজোমণ্ডপে।
থিমই সেই দর্পণ, যেখানে ইতিহাসকে ফিরে দেখা, বর্তমানের উদযাপন আর ভবিষ্যতের আবাহনের প্রতিফলন একসঙ্গে সম্ভব। আক্ষরিক অর্থে, থিম মানে এক মায়া। চুঁচুড়া থেকে ব্যান্ডেল— সড়কপথের ধারে ধারে এখন তেমনই মায়ার মোহনসুর ছড়াতে শুরু করেছে। তার জেরে গঙ্গাপাড়ের পুরানো জনপদ এখন মায়ানগরীতে রূপান্তরিত হতে শুরু করেছে।