নয়াদিল্লি: সাংবিধানিকভাবে দেশে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব ভারতের নির্বাচন কমিশনের। যদিও নির্বাচন সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রক্রিয়া, বিশেষ করে দেশজুড়ে চলা ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ বা এসআইআর ঘিরে কমিশনের সর্বোচ্চ স্তরেই নজিরবিহীন মতপার্থক্য ও সংঘাতের অভিযোগ সামনে এসেছে। সর্বভারতীয় সাংবাদপত্র ‘দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনে এই ইস্যুতে একঝাঁক বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের অধীনে অনুমোদিত বিভিন্ন নির্দেশ, পদক্ষেপ ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন তাঁরই দুই ডেপুটি, নির্বাচন কমিশনার (ইসি) সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি। জ্ঞানেশ কুমারের অধীনে গৃহীত এই পদক্ষেপকে ‘অনুমোদনহীন ও বেআইনি’ বলে উল্লেখ করেছেন তাঁরা। একবার, দু’বার নয়... দুই নির্বাচন কমিশনার ১০ মাসে ১৪ বার লিখিত আপত্তি পেশ করেছিলেন। এমনও হয়েছে যখন একদিনে চারবার আপত্তিসূচক নোট পেশ করেছেন তাঁরা। অর্থাৎ, কমিশনের সর্বোচ্চ তিন অফিসারের মধ্যে দু’জনই দফায় দফায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে কার্যত ‘বিদ্রোহ’ করেছেন বলে অভিযোগ। পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়েও সুস্পষ্ট আপত্তি জানিয়েছিলেন সান্ধু ও যোশি। জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন তিন শীর্ষ অফিসারের মধ্যে দু’জনের লিখিত আপত্তি সত্ত্বেও কীভাবে সিদ্ধান্ত কার্যকর হল, সেই প্রশ্ন তুলছে বিরোধী শিবির।
২০২৫ সালের জুন মাসে বিহার থেকে দেশজুড়ে এসআইআর-এর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কালক্রমে ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়ে ১৩ কোটি ভোটারের নাম। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এই বিস্ফোরক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্টের মধ্যে, সম্মতি ছাড়াই গৃহীত ভোটার তালিকা সংশোধন, সফটওয়্যার ব্যবহারে বিধিনিষেধ থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন পদে নিয়োগ পর্যন্ত বিভিন্ন মূল সিদ্ধান্তের বিষয়ে বারবার আনুষ্ঠানিক ভিন্নমত প্রকাশ করেছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার।
ফর্ম ৬ (ভোটার তালিকায় নাম তোলার আবেদন)-এ সংশোধনী আনা নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন সান্ধু ও যোশি। নয়া নিয়মে বিগত এসআইআর-এর ভোটার তালিকায় তাদের বা তাদের পিতা-মাতা, দাদু, দিদিমা বা ঠাকুমার নাম ছিল কি না, তা জানানো বাধ্যতামূলক করা হয়। এবিষয়ে আপত্তি জানিয়ে মে মাসে যোশি সতর্ক করে বলেছিলেন, সরকার নিয়ম সংশোধন না করলে কমিশন ফর্ম ৬ এভাবে পরিবর্তন করতে পারে না। অপর কমিশনার সান্ধুও সেই আপত্তিতে সম্মতি জানিয়েছিলেন। ফর্ম ৬-এর এই পরিবর্তনকে ১৩ আগস্ট লিখিতভাবে তিনি ‘অনুমোদনহীন ও বেআইনি’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। সান্ধুর দাবি ছিল, অবিলম্বে এটি প্রত্যাহার করতে হবে। একইভাবে, ভোটার তালিকা ডেটাবেসের ‘ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীকরণে’র বিরুদ্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যোশি ও সান্ধু। তাঁদের প্রস্তাব ছিল, বিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ ব্যতীত অন্য কারও (ভোটার) ডেটাবেসে কোনো পরিবর্তন করার অনুমোদন যেন না থাকে। ভোটার তালিকা রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে রাজ্য-স্তরের নির্বাচন আধিকারিক এবং ইলেকটোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের (ইআরও) বিধিবদ্ধ ক্ষমতা প্রয়োগে বাধা দেওয়ার বিরুদ্ধেও সতর্ক করেছিলেন তাঁরা। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ডিরেক্টর জেনারেল অব আইটি সীমা খান্নার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
তাৎপর্যপূর্ণভাবে সান্ধু এবং যোশি উভয়েই পৃথকভাবে ক্যাবিনেট সচিব টি ভি সোমনাথনকে চিঠি লিখেছেন। এক্ষেত্রে তাঁরা একটি প্রশাসনিক নির্দেশের কথা উল্লেখ করেছিলেন। ওই নির্দেশের মাধ্যমে কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি পরিকাঠামো থেকে তদারকির স্তরগুলি সরিয়ে ফেলা হয়। সান্ধু ও যোশি এটিকে আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন। তাঁরা জানান, কমিশনের কাজকর্ম সর্বসম্মতভাবে বা সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া আবশ্যিক। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার সেই বিধিকে এড়িয়ে শুধুমাত্র ‘নির্বাচন কমিশন’- নামের উল্লেখ করে নিয়ম বহির্ভূতভাবে বিভিন্ন নির্দেশিকা ইস্যু করা হয়েছিল।