নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: এক সপ্তাহের মধ্যে দু’টি মৃতদেহ। প্রথমটি ডানকুনি। দ্বিতীয়টি ট্যাংরা। দু’টি ক্ষেত্রেই দেহ অ্যাপ ক্যাব চালকের। দু’জনেই খুন হয়েছেন। আশ্চর্যজনকভাবে দু’টি খুনের প্যাটার্ন এক। দু’টি ঘটনার মোডাস অপারেন্ডি এক। দু’জনেরই পা বাঁধা। লুট হয়েছে নগদ, সোনার গয়না, মোবাইল। ডানকুনিতে দেহ মিলেছে, আর গাড়ি ফেলে রাখা হয়েছিল পার্ক সার্কাসে। ট্যাংরায় আবার গাড়িতেই মিলেছিল অ্যাপ ক্যাব চালকের দেহ। তদন্তকারীদের প্রশ্ন তাই একটাই—কলকাতায় কি তাহলে ফের সিরিয়াল কিলার? নাকি তেমনই কোনো গ্যাং? বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, মোবাইলের টাওয়ার লোকেশেন এমনই সম্ভাবনা জোরদার করছে। এই গ্যাংয়ের সদস্যদের মধ্যে কেউ কলকাতারই বাসিন্দা। পরপর দু’টি গাড়ি উদ্ধারের লোকেশন সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর বাইরে? গোটা বিষয়টা নিয়ে এখনও পুলিশ অন্ধকারে।
বুধবার ট্যাংরায় অ্যাপ ক্যাবের মধ্যে থেকে উদ্ধার হয় ভগবান প্রসাদ গুপ্তার দেহ। তিনিই ছিলেন গাড়ির মালিক তথা চালক। পা তাঁর বাঁধা ছিল। শ্বাসরোধ করে খুন করা হয় তাঁকে। কে বা কারা খুন করল, তার তদন্তে নেমে এন্টালি থানা ও লালবাজার ওই এলাকা সহ শহরের বিভিন্ন রাস্তার ট্রাফিক সিগন্যালের ফুটেজ নেয়। দেখা যায়, গাড়িটি পার্ক করার পর তিন যুবক ভাবলেশহীনভাবে হেঁটে চলে যাচ্ছে। ব্যাস, ওই পর্যন্তই। তাদের পরিচয় জানতে পারেনি পুলিশ। তদন্তকারীদের কাছে খবর আসে, চলতি মাসের ৫ অক্টোবর ডানকুনি থানার দিল্লি রোড সংলগ্ন ভাদুয়া মোড়ে এক অ্যাপ ক্যাব চালকের দেহ মিলেছে। রামজাস কৌরি নামে ওই ড্রাইভারেরও পা বাঁধা ছিল। খুন শ্বাসরোধ করেই। এয়ারপোর্ট থানা এলাকার বাসিন্দা রামজাস ৪ অক্টোবর গাড়ি নিয়ে বের হন। রাতে ফেরেননি। সকালে ভাদুয়াতে মিলেছিল দেহ। ঘটনাস্থল থেকে তাঁর ক্যাব মেলেনি। গাড়িটি উদ্ধার হয় পার্ক স্ট্রিট ও মল্লিকবাজারের সংযোগস্থলের কাছেই একটি নামি রেস্তরাঁর সামনে থেকে।
তদন্তকারীদের সন্দেহ, দু’টি খুনে একই গ্যাং জড়িত। প্যাটার্ন এক। মল্লিকবাজারের কাছে গাড়িটি যেখানে মিলেছিল, সেখান থেকে নেওয়া হয় ফুটেজ। সেই ফুটেজ ও ট্যাংরার ছবি মিলিয়ে দেখতেই তদন্তকারীদের চোখ কপালে ওঠে। দেখা যায়, দু’টি জায়গাতেই অভিযুক্তরা এক। ডানকুনির ঘটনায় শুধু একজন মহিলাও ছিল। এখান থেকেই অফিসাররা নিশ্চিত হন, একই গ্যাং দু’টি খুনে জড়িত। তাদের পরিচয় জানতে প্রযুক্তির আশ্রয় নেওয়া শুরু হয়। কিন্তু দেখা যায়, সিম ও মোবাইল দু’টি ঘটনার পরই নষ্ট করা হয়েছে। অন্যের নামে একাধিক সিম তুলে ব্যবহার করেছে তারা। তবে দু’টি গাড়িই যেহেতু পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে, তাই ওই গ্যাংয়ের কলকাতা সূত্র খুঁজছেন তদন্তকারীরা। আর একটি সূত্র হল, রামজসের বাড়ি বিরাটি, আর ভগবানের বাড়ি মধ্যমগ্রাম। এক্ষেত্রে দূরত্ব মেরেকেটে ১০ কিমি। ট্যাংরায় ভাবলেশহীনভাবে তাদের হেঁটে যাওয়া দেখে মনে হচ্ছে, এলাকা পরিচিত। তবে গ্যাংয়ে বাইরের রাজ্যের কেউ থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না পুলিশ।
তদন্তে নেমে অফিসাররা বুঝতে পারছেন, গাড়ি চুরি তাদের উদ্দেশ্য নয়। যাত্রী সেজে গাড়িতে উঠে লুটপাটই তাদের কাজ। তারপর খুন। তদন্তকারীদের ধারণা, দু’জনকেই গাড়ি থামিয়ে খুন করা হয়েছে। কিন্তু চালককে খুন করে বেশি কিছু মিলবে না। তাহলে তাঁরাই টার্গেট কেন? এক্ষেত্রে তদন্তকারীদের ধারণা, দলে কোনও সাইকো কিলার থাকতে পারে। বিরাটি, মধ্যমগ্রামের দুই অ্যাপ ক্যাব চালক খুন হওয়ায় অনুমান, অপরাধীরা এয়ারপোর্ট, মধ্যমগ্রাম চত্বরে অপারেট করছে। কারণ এখান থেকে অনায়াসে গাড়ি নিয়ে যে কোনো দিকে পালানো সম্ভব।