


নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটন: ইউক্রেন হোক বা ইরান— যে-কোনো সংকটকালেই কি ডোনাল্ড ট্রাম্পের পছন্দের টার্গেট ভারত? আরও স্পষ্ট করে বললে, ‘বন্ধু’ নরেন্দ্র মোদির সরকার! মার্কিন প্রেসিডেন্টের নয়া ইরান নীতি সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। কারণ, নির্বিচারে বিক্ষোভকারীদের হত্যালীলা চালানো ইরানের খামেনেই সরকারকে হাতের বদলে আপাতত ভাতে মারার কৌশল নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। সেই সূত্রেই মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্টের নতুন হুমকি, ইরানের বাণিজ্যিক সহযোগীদের উপর বসছে ২৫ শতাংশ শুল্ক। ইরানের পঞ্চম বৃহত্তম বাণিজ্যিক সহযোগী ভারত। ফলে নয়াদিল্লির উপর ফের ট্রাম্পের এই নয়া ট্যারিফের আঁচ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর আগে রাশিয়া থেকে তেল কেনার ‘জরিমানা’ (২৫ শতাংশ) ও পালটা শুল্ক মিলিয়ে ভারতীয় পণ্যের উপর বিশ্বের সবচেয়ে বেশি, মোট ৫০ শতাংশ কর চাপিয়েছিল আমেরিকা। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের অজুহাতে আরও ২৫ শতাংশের বোঝা চাপলে, শুল্কের পরিমাণ বেড়ে হবে ৭৫ শতাংশ। ঘটনাচক্রে, সোমবার নয়াদিল্লির নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর বলেছিলেন, ভারত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। সেই মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের দোহাই দিয়ে ভারতের উপর নতুন করে শুল্ক চাপানোর আশঙ্কা ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
খামেনেই বিরোধী বিক্ষোভে বর্তমানে উত্তাল ইরান। সরকারি বাহিনীর হামলায় এখনও পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার আন্দোলনকারীর মৃত্যুর খবর মিলছে। বন্দি ও কয়েক হাজার। এই হত্যালীলা রুখতে খামেনেই সরকারের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। তাহলে কি ভেনেজুলেয়ার মতো ইরানেও সামরিক অভিযান চালাবে আমেরিকা? ট্রাম্প প্রশাসনের অন্দরের খবর, মার্কিন বাহিনী এখনই ইরানে সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে নয়। সেই কারণেই তেহরানকে ‘ভাতে মারার’ দোয়াই দিয়ে ইরানের বাণিজ্যিক সহযোগীদের উপর ২৫ শতাংশ কর চাপানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এর ফলেই আমেরিকাগামী ভারতীয় পণ্যে করের পরিমাণ বেড়ে ৭৫ শতাংশ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ, ইরান শুধুমাত্র নয়াদিল্লির গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সহযোগীই নয়। কৌশলগত কারণে সেদেশের চাবাহার বন্দরটিও গড়ে তুলেছে ভারত। ওই বন্দরের মাধ্যমে পাকিস্তানকে এড়িয়েই আফগানিস্তান সহ মধ্য এশিয়ার বাজার সরাসরি নয়াদিল্লির নাগালে আসছে।
রাশিয়া থেকে তেল কেনার বাড়তি ‘শাস্তি’ হিসেবে ইতিমধ্যে ৫০০ শতাংশ কর চাপানোর হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এবার ইরান ইস্যুতে নতুন করে ২৫ শতাংশ শুল্কের এই পদক্ষেপকে ভারতের উপর চাপ সৃষ্টির কৌশল বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল। কারণ, আমেরিকা চাইছে শেষপর্যন্ত তাদের চাপানো শর্তেই ঝুলে থাকা বাণিজ্য চুক্তিতে রাজি হোক প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার। সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ সালে ভারতের সঙ্গে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে ইরানের। তার মধ্যে ভারতের রপ্তানির পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকার। তবে এটাও মাথায় রাখতে হবে, ট্রাম্পের নিধেষাজ্ঞার কারণেই ২০১৯ সাল থেকে ইরানের তেল আমদানি বন্ধ রেখেছে ভারত। সেই ধাক্কার আগে তেহরানের সঙ্গে নয়াদিল্লির বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় দেড় লক্ষ কোটি টাকা। এবার ট্রাম্প ঘোষিত নয়া ২৫ শতাংশ শুল্কের ধাক্কা কতটা, তা নিয়েও জল্পনা তুঙ্গে। ইরানে মূলত জৈব রসায়ন, বাসমতী চাল, চা, চিনি, ফল, ডাল, ওষুধ রপ্তানি করে ভারত। দেশের সর্বোচ্চ রপ্তানিকারী সংগঠন এফআইইও অবশ্য এদিন জানিয়েছে, ট্রাম্প ঘোষিত এই নয়া ২৫ শতাংশ শুল্কের ধাক্কা ভারতের উপর বিশেষ পড়বে না।