


সুদীপ্ত কুণ্ডু, হাওড়া: হাওড়া-আমতা পিচের সড়ক ধরে শহর ছাড়িয়ে প্রায় ২৬ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এগলেই কৌশিকী নদীর তীর ঘেঁষে ধরা দেয় জগৎবল্লভপুর। ইতিহাস আর সম্ভাবনার মিশেলে গড়া এ এক প্রাচীন জনপদ। গ্রামের অলিগলি জুড়ে এখনও ছড়িয়ে থাকা পৌরাণিক স্থাপত্য ও শিল্প নিদর্শন যেন নীরবে সাক্ষ্য দেয় ভুরশুট রাজ্য ও বর্ধমানের জমিদারি আমলের ঐশ্বর্যের। এক সময় রেশম, সূতিবস্ত্র, জরি, তালাচাবি, শোলা কিংবা পাটের নকল চুলের মতো শিল্পে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত খ্যাতি ছিল এই অঞ্চলের। সেই ঐতিহ্যের কিছু রেশ আজও বেঁচে আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র কারখানাগুলিতে। এই ঐতিহ্যকে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে উদ্যোগী জগৎবল্লভপুরের তৃণমূল প্রার্থী সুবীর চট্টোপাধ্যায় ওরফে টিঙ্কাই। তাঁর লক্ষ্য, বিচ্ছিন্নভাবে থাকা এই ক্ষুদ্র শিল্পকে এক ছাতার তলায় এনে সংগঠিত রূপ দেওয়া। পাশাপাশি কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নেও জোর দিতে চান তিনি। প্রার্থীর এই দ্বিমুখী পরিকল্পনাই রাজনৈতিক সমীকরণে ঘাসফুল শিবিরকে এগিয়ে রেখেছে বলে মনে করছে স্থানীয় মহল।
রাজ্যে ক্ষমতায় আসার আগেই জগৎবল্লভপুরে বামফ্রন্টের দীর্ঘদিনের প্রভাব ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে তৃণমূল। ২০০১ সালে প্রথম এই কেন্দ্রে ঘাসফুলের জয়যাত্রা শুরু। আর ২০১১ সালের পর থেকে সেই ধারা আরও মজবুত হয়েছে। এবারের নির্বাচনে প্রথমবার প্রার্থী হয়েছেন দীর্ঘদিনের ব্লক সভাপতি সুবীর চট্টোপাধ্যায়। তৃণমূলের দাবি, গত পাঁচ বছরের ধারাবাহিক উন্নয়নই তাঁকে রেকর্ড ব্যবধানে জয়ের পথে নিয়ে যাবে। বাস্তব চিত্রও সেই দাবিকে অস্বীকার করে না। বর্ষায় ফুলেফেঁপে ওঠা কৌশিকী নদীর বন্যায় ভেঙে পড়ত এক গ্রামের সঙ্গে অন্য গ্রামের যোগাযোগ। সেই সমস্যা কাটাতে নাইকুলি, চাঁদোল, খাড়াপাড়া সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তৈরি হচ্ছে পাকা সেতু। পথশ্রী প্রকল্পে নবীকরণ হয়েছে গ্রামীণ রাস্তাঘাট, বসেছে আলো। উন্নত হয়েছে জগৎবল্লভপুর গ্রামীণ হাসপাতালের পরিকাঠামো। তবে বড়গাছিয়া এলাকায় বাড়তে থাকা যানজট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সুবীরের আশ্বাস, ‘পরিকল্পিত উদ্যোগে এর স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব।’
কৃষিই জগৎবল্লভপুরের প্রাণ। বড়গাছিয়া থেকে পাতিহালমুখী সড়কের ধারে সবুজ ধানের খেতে কথা হচ্ছিল ব্যস্ত চাষিদের সঙ্গে। তাঁদেরই একজন চাঁদু পণ্ডিত বলেন, ‘এখন চাষের জন্য সার, বীজ থেকে আর্থিক সহায়তা, সবই সহজে পাওয়া যায়। কৃষকবন্ধু প্রকল্পে আমরা অনেকটাই উপকৃত।’ আরেক চাষি শিবু মণ্ডলের কথায়, ‘সবচেয়ে বড়ো সুবিধা হচ্ছে, সরকারের কাছে সরাসরি ধান বিক্রি করতে পারছি। ন্যায্যমূল্য মিলছে, তাই লাভও বাড়ছে।’ বলরাম মণ্ডল যোগ করেন, ‘আগে সেচের সমস্যায় ভুগতে হতো, এখন অনেকটাই উন্নতি হয়েছে। তবে নালা-খাল ঠিকঠাক রাখলে আরও ভালো হবে।’ তবে সবকিছুই নিখুঁত নয়। সেচনালা বুজিয়ে বেআইনি নির্মাণ, মাটি কাটার সমস্যা নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ রয়েছে গ্রামীণ মহলে। সেই প্রসঙ্গে সুবীরের প্রতিশ্রুতি, ‘সরকারি নিয়ম মেনে উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। নিকাশি ও সেচ ব্যবস্থার উন্নতিতে জোর দেওয়া হবে, যাতে কৃষি ও শিল্প একসঙ্গে এগিয়ে চলে।’
অন্যদিকে, জগৎবল্লভপুর কেন্দ্রে এবারের নির্বাচনি প্রচারে বিজেপি, আইএসএফ কিংবা কংগ্রেস— কোনো বিরোধী দলই তেমনভাবে প্রভাব ফেলতে পারেনি বলে দাবি স্থানীয়দের একাংশের। বরং একাধিক গ্রামে বিজেপি প্রার্থীর প্রচারকে ঘিরে ধর্মীয় মেরুকরণের অভিযোগ তুলছেন অনেকেই। সব মিলিয়ে, জনসংযোগ, উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক সমীকরণের নিরিখে এই কেন্দ্রের ভোটের হাওয়া আপাতত ঘাসফুলের দিকেই ঝুঁকে রয়েছে।