শুভ্র চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা: বিভিন্ন চিটফান্ড সংস্থার প্রতারিতদের টাকা ফেরানোর ক্ষেত্রে পূর্বতন রাজ্য সরকার তাদের তৈরি করা আইনই কার্যকর করেনি। ফলে বঞ্চিত হন আমানতকারীরা। ‘দি ওয়েস্ট বেঙ্গল প্রোটেকশন অব ইন্টারেস্ট অব ডিপোজিটরস ইন ফিনান্সিয়াল এস্টাব্লিশমেন্ট অ্যাক্ট ২০১৩’ আইনে (ডব্লুবিপিআইডিফই) বেআইনি অর্থলগ্নিকারী সংস্থার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বিক্রি করে প্রতারিতদের টাকা ফেরানোর সংস্থান রয়েছে। কিন্তু সারদা, রোজভ্যালি কাণ্ড সামনে আসার পর রাজ্যের বিভিন্ন থানায় চিটফান্ড কোম্পানির বিরুদ্ধে হওয়া মামলায় এই ধারা যুক্তই করা হয়নি। এই সুযোগে চিটফান্ড কোম্পানির সম্পত্তি অনায়াসে বেহাত হয়ে গিয়েছে। এই অবস্থায় ২০১৪ সাল থেকে হওয়া চিটফান্ড মামলাগুলিতে ওই ধারা যুক্ত করে নতুন করে তদন্ত শুরুর উদ্যেগ নিয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার, যাতে প্রতারিত আমানতকারীদের টাকা ফেরানোর বিষয়ে পদক্ষেপ করা যায়। সংশ্লিষ্ট চিটফান্ড সংস্থাগুলির তালিকা তৈরি হচ্ছে বলে খবর।
২০১৩ সালে সারদা-রোজভ্যালি কাণ্ড প্রকাশ্যে আসে। এই দুই বেআইনি অর্থলগ্নি সংস্থা নিয়ম ভেঙে বাজার থেকে টাকা তোলে বলে অভিযোগ। নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও টাকা ফেরত পাননি লক্ষ লক্ষ আমানতকারী। এই দুই কোম্পানি লালবাতি জ্বালার পর আরও একাধিক চিটফান্ড সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসতে থাকে। যেসব মামলার তদন্ত সিবিআই নেয়নি, সেগুলির তদন্ত রাজ্য পুলিশের থানার হাতেই ছিল। পুরানো আইনের প্রতারণা, জালিয়াতির ধারায় মামা রুজু হয়। ওই অবস্থায় রাজ্যে চিটফান্ড কোম্পানির রমরমা ঠেকাতে ও প্রতারিতদের টাকা ফেরানোর জন্য রাজ্য সরকার ডব্লুপিআইডিএফই অ্যাক্ট চালু করে। ২০১৫ সালের মে মাস থেকে আইনটি কার্যকর হয় রাজ্যে। সেখানে বলা আছে, বেআইনি অর্থলগ্নি সংস্থার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নিলাম করতে পারবে রাজ্য। সেই টাকা প্রতারিতদের ফিরিয়ে দেওয়া যাবে। এই আইন চালু হওয়ার আগে ও পরে একাধিক চিটফান্ড কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ে। এগুলির তদন্তের জন্য তৃণমূল সরকার ‘ডাইরেক্টরেট অব ইকনমিক অফেন্সেস’ (ডিইও) তৈরি করে। নিয়মানুযায়ী তাদের হাতে সমস্ত মামলার তদন্তভার তুলে দেওয়ার কথা থানাগুলির। কিন্তু রাজ্যে পালাবদলের পর জানা যাচ্ছে, তৃণমূল সরকার প্রতারিতদের টাকা ফেরানো তো দূরের কথা, উলটে চিটফান্ড সংস্থাগুলিকে সম্পত্তি বিক্রি বা হাতবদলের সুযোগ করে দিয়েছে। এই কোম্পানিগুলির কোনো না কোনো পদে তৎকালীন শাসক দলের বড়ো মাথারা বসেছিলেন। অভিযোগ উঠছে, সংস্থার মালিকদের আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে এবং তাঁদের পালাতে সুযোগ করে দিয়েছে তৎকালীন শাসক দলের প্রভাবশালীরা। রাজ্য পুলিশ সূত্রে খবর, সরকারের নির্দেশেই থানাগুলি এই ধারা যোগ না করে সাধারণভাবে প্রতারণা, জালিয়াতির ধারায় তদন্ত করেছে। এমনকি, ডিইও-কে তদন্তভার হস্তান্তর করেনি। আর এই সুযোগে এসব কোম্পানির মালিক সম্পত্তি অন্যের নামে হস্তান্তর করেছেন বা বিক্রি করে দিয়েছেন। চিটফান্ড কোম্পানিগুলির রেজিস্ট্রি না হওয়া সম্পত্তির কোনো খোঁজই নেই আপাতত। যে কারণে তাদের সম্পত্তি বিক্রি করে টাকা ফেরানো যায়নি আমানতকারীদের। এখন নতুন অ্যাক্ট যুক্ত করে বেআইনি অর্থলগ্নি সংস্থার সম্পত্তিগুলি চিহ্নিত করার চেষ্টা হচ্ছে।