শুভদীপ রায়, কলকাতা: কর্মসূত্রে দিল্লিতে থাকেন অশোকনগরের সব্যসাচী অধিকারী। পঞ্চমীর ভোরেই বাড়ি ফিরেছেন। ষষ্টীর সকালেই কলকাতা। উদ্দেশ্য ঠাকুর দেখা। সঙ্গী একমাত্র ভাগনে কৌশিক। শিয়ালদহ থেকে হাঁটতে হাঁটতে কলেজ স্ট্রিট, সেখান থেকে বাসে করে গিরিশপার্ক। বিকেলে আর হাঁটার ক্ষমতা নেই। কিন্তু বাগবাজারের ঠাকুরই যে দেখা হয়নি এখনও!
আসলে বাগবাজার এমনই। প্রতিবার রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন এখানে। অথচ থিমের বাহার নেই। মণ্ডপের সাজসজ্জায় বিশেষ চমকও নেই। তাহলে কীসের টানে এত ভিড়? উত্তরটা হল মাতৃপ্রতিমা। এমন রাজকীয় রূপ হলে ভিড় হওয়াই স্বাভাবিক। প্রতিমার সামনে দাঁড়ালে আপনা থেকেই ভক্তিতে দুহাত জড়ো হয়ে আসে। ঝলমলে সাজ, বিশাল একচালার প্রতিমা। প্রকৃতই অতসীপুষ্পবর্ণাভাং সুপ্রতিষ্ঠাং সুলোচনাম্, নবযৌবনসম্পন্নাং সর্ব্বাভরণ ভূষিতাম্!
বাগবাজার সর্বজনীনের পুজো এবছর ১০৮তম বর্ষে পা রাখল। মাস খানেক আগে কমিটির নির্বাচন সংক্রান্ত কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছিল। তাতে প্রশ্নের মুখে পড়ে এতদিনের পুজো। শেষমেশ সমস্যা মিটেছে। পুজো হচ্ছে আগের মতোই। আয়োজনে এতটুকু খামতি রাখেননি উদ্যোক্তারা। বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসব ও প্রদর্শনী-র সাধারণ সম্পাদক গৌতম নিয়োগী জানালেন, এবছর মণ্ডপ তৈরি হচ্ছে নিউজার্সির স্বামীনারায়ণ মন্দিরের আদলে। দুধসাদা রঙের মণ্ডপে রাজকীয় আলোর বাহার। অন্যান্যবারের মতোই মণ্ডপের ভিতরে সুবিশাল ঝাড়বাতি। পুজোপ্রাঙ্গণে মেলাও বসেছে। ঠাকুরের সামনে গিয়ে হাত জোড় করে প্রণামই লক্ষ্য সকলের।
বাগবাজারের সবথেকে কাছে বড়ো পুজো বলতে কুমোরটুলি সর্বজনীন। ৯৬তম বর্ষে এই মণ্ডপের থিম ডাচ শিল্পী পিয়েট মন্দ্রিয়ানের জ্যামিতিক শিল্পরীতি ‘নিউপ্লাস্টিসিজম’। শিল্পী মানস রায়ের পরিকল্পনায় সরলরেখা, সমকোণ এবং লাল, নীল, হলুদের মতো প্রাথমিক রঙের সমন্বয়ে সেজেছে মণ্ডপ। থিমের বিষয়ে উদ্যোক্তারা জানালেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অস্থিরতার মধ্যে মন্দ্রিয়ান তাঁর শিল্পে শৃঙ্খলা ও ভারসাম্যের সন্ধান করেছিলেন। সেই ভাবনাকে দুর্গাপুজোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তাদের লক্ষ্য। মণ্ডপজুড়ে সাদা-কালো জ্যামিতিক চিত্র। এর মধ্যে কালো ও ধূসর রং নেতিবাচকতা ও মানসিক জটিলতার প্রতীক হিসাবে ব্যবহৃত। বাকি লাল, নীল হলুদের মতো রং প্রকাশ করছে আনন্দ, আশা, সৃষ্টিশীলতা ও শুভশক্তিকে। বিশেষ আকর্ষণ হিসাবে মণ্ডপে রাখা সাদা-কালো খোপের ক্যানভাস। তাতে রং ভরতে পারবেন দর্শনার্থীরাও। ফলে মন্দ্রিয়ানের শিল্পভাবনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন তাঁরা।
কিছুটা এগোলেই কুমোরটুলি পার্ক। বিশাল এলাকাজুড়ে মণ্ডপ। থিম, গঙ্গা তুমি বইছ কেন। তবে এই মণ্ডপে ঢোকার রাস্তার আলোকসজ্জা আলাদাভাবে নজর কাড়ছে। কুমোরটুলি পেরিয়ে রাজবল্লভপাড়া মোড়ে গলির মুখে চোখে পড়বে বিশেষ এক মণ্ডপ। বিশেষ বলার কারণ, ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় এই মণ্ডপের ছবি বা ভিডিয়ো অনেকেই দেখে ফেলেছেন। ষড়ঙ্গ দুর্গোৎসব সমিতির এই পুজোর থিম ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’। ৪৯তম বর্ষে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলতে চেয়েছে এই ক্লাব। মণ্ডপে ঢোকার মুখেই দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের দৃশ্য। তার পিছনে একইসঙ্গে পাঁচ মহারথীর ছবি। যারা চোখের সামনে দ্রৌপদীর লাঞ্ছনা দেখেও কিছু করেননি। মণ্ডপের ভিতরেও বিভিন্ন ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নারী নির্যাতনের দৃশ্য। তার পাশে একটা করে প্যাঁচার প্রতিকৃতি। যে সব দেখছে। আর একদম ভিতরে দুর্গা প্রতিমার সামনে শোয়ানো এক নারী মূর্তি। যার চেহারায় অত্যাচারের ছাপ স্পষ্ট। নারীমূর্তির কপালে থাকা ত্রিনয়ন বিশেষ প্রতীকী অর্থ বহন করছে। উদ্যোক্তাদের কথায়, এখানে প্যাঁচা শুধু দর্শক নয়, সমাজের সেই তথাকথিত জ্ঞানী ও মান্যজনের প্রতীক, যাঁরা সব দেখেও নীরব। আর দেবী দুর্গা স্বয়ং সেই নীরবতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলছেন। আলো-ছায়ার খেলায় মায়াবী আবহ মণ্ডপজুড়ে। যা শুধু রিলস নয়, সামনে থেকেও দর্শকদের শিহরিত করবে।



