


ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: ১৩২৫। বাবা গিয়াসুদ্দিন তুঘলকের মৃত্যুর পর তাঁর সুযোগ্য পুত্র হিসাবে দিল্লির মসনদে বসেন জৌনা খান। চিকিৎসা শাস্ত্রে সীমাহীন উৎসাহ, একইসঙ্গে পারসি, হিন্দি, আরবি, তুর্কি এমনকি সংস্কৃত ভাষার উপর তাঁর দখল মানুষের কাছে যুবরাজ জৌনা খানকে শিক্ষিত এবং গুণী সুলতানের তকমা দিয়েছিল। সর্বধর্ম সমন্বয়ের লক্ষ্যে তিনি হিন্দু ধর্মের নানা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন। ভালোবাসতেন হোলির রঙে মাততে। লক্ষ্য ছিল, দেশের সব মানুষকে রক্তের সম্পর্কে বাঁধবেন। সেখানে ধর্ম, আচার বা ঈশ্বরের বিচারে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। যুবরাজ জৌনা খান মসনদে বসে সুলতান হওয়ার পর শাসনের শুরুটা ঠিক এরকমই ছিল। শুধু যে পুঁথিগত বিদ্যার উপরই তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল তা নয়, যুদ্ধশাস্ত্রেও ছিলেন পারদর্শী। তাঁর বীরত্বের প্রমাণ প্রথম মেলে দক্ষিণের ওয়ারাঙ্গলে। ১৩২১ সালে বাবার নির্দেশে দিল্লি থেকে দক্ষিণ জয়ের জন্য কাকতীয় সাম্রাজ্যে হানা দেন জৌনা খান। সেসময় কাকতীয়দের রাজধানী ওয়ারাঙ্গলে প্রতাপরুদ্রর শাসন। গোটা দক্ষিণ ভারতে তাঁর প্রভাব প্রায় সকল স্তরেই কায়েম ছিল। তবে যুবরাজ জৌনার বীরত্বের কাছে তিনি পরাস্ত হন। গিয়াসুদ্দিন যে লক্ষ্যে বড়ো ছেলে জৌনাকে দক্ষিণে পাঠিয়েছিলেন, তা যথার্থভাবে পূরণ হয়। ওয়ারাঙ্গল জয় করে দিল্লিতে ফেরেন যুবরাজ। পরবর্তীতে তেলেঙ্গানা, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু মিলিয়ে দক্ষিণ ভারতের সিংহভাগ প্রদেশেই শাসনক্ষমতা কায়েম করে দিল্লির মসনদ। সবটাই জৌনা খানের দৌলতে। একদিকে জ্ঞানের ভাণ্ডার তো অন্যদিকে বীরত্বের সাতকাহন — সব মিলিয়ে দেশবাসীর কাছে তুঘলক সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় সম্রাটকে নিয়ে আশা-আকাঙ্ক্ষা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। সকলের প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন এই জৌনা খান। অথচ ধীরে ধীরে এহেন মানুষই পরবর্তীকালে ইতিহাসের পাতায় হয়ে যান ‘পাগলা রাজা’মহম্মদ বিন তুঘলক। দিল্লির তুঘলক সাম্রাজ্যের অন্যতম এই সম্রাট জৌনা খানকে আমরা এই নামেই চিনেছি। যাঁর খামখেয়ালিপনায় জর্জরিত হয়ে দেশবাসী বিদ্রোহের রাস্তায় নেমে আসেন। নানা জায়গায় বিক্ষোভ, প্রতিবাদ আর কোথাও বা তুঘলকি ফরমানের জেরে দুর্ভিক্ষ।
মহম্মদ বিন তুঘলকের এই হঠকারী সিদ্ধান্তের প্রথম উদাহরণ দিল্লি থেকে দৌলতাবাদে রাজধানী স্থানান্তর। প্রায় ১৫০০ কিলোমিটার দূরে রাজধানী স্থানান্তর করে প্যাঁচে পড়ে যান সম্রাট। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে লাগাতার নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়। যদিও সব কাটিয়ে উঠে যখন ধীরে ধীরে দৌলতাবাদ থেকে রাজকর্ম পরিচালনা হতে শুরু করেছে, সেই সময়েই আবার তিনি দিল্লিতে পুনরায় রাজধানী স্থানান্তর করে আনেন। স্বাভাবিকভাবেই এর জেরে কতটা সমস্যা এবং সংকট তাঁর মন্ত্রী-সান্ত্রি এবং দেশের মানুষকে পোহাতে হয়েছিল তা সহজেই অনুমেয়। তার পরের আর এক খামখেয়ালিপনা হল সোনা ও রুপোর কয়েনের পরিবর্তে, তামা ও ব্রোঞ্জের মুদ্রা প্রচলন। রাজভাণ্ডারের খরচ কমাতেই যে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে মুদ্রা প্রচলনের পর অবশ্যম্ভাবী যে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল, তার কিছুই সম্রাটের মাথায় আসেনি। কাজেই প্রশাসনের ফাঁকফোকরের সুযোগে চলতে থাকে অবাধে জাল কারবার। শেষে ফের সেই মুদ্রা ব্যবস্থা বাতিল করতে বাধ্য হন তুঘলক।
এরপর গঙ্গা-যমুনা তীরবর্তী দোয়াব অঞ্চলে অন্তত ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত কর চালু। সেই সময় গোটা এশিয়ায় নিজের সাম্রাজ্য স্থাপন করার ভূত চাপে তুঘলকের মাথায়। দরকার প্রচুর সৈন্যবাহিনীর। কিন্তু সেই বাহিনী গড়ে তোলার মতো টাকা অর্থভাণ্ডারে নেই। তাই দেশের অন্য প্রান্তের থেকে তুলনামূলকভাবে সবুজ-শ্যামল শস্যভাণ্ডারে ঘেরা গঙ্গা ও যমুনা তীরবর্তী দোয়াব অঞ্চলে বাড়তি কর চালু করা হয়। আর এর জেরে তুঘলককে নিয়ে দেশবাসীর মধ্যে যেটুকু আশা ছিল, সবটাই জলাঞ্জলি যায়। বাড়তি কর দিতে নারাজ দোয়াববাসী প্রতিবাদের রাস্তায় হাঁটে। আর প্রশাসনিক আধিকারিকরা সেই কর আদায়ের জন্য মানুষের উপর চরম অত্যাচার শুরু করে। ফলত, দোয়াবের বহু বাসিন্দা জমি ছেড়েছুড়ে জঙ্গলে পালিয়ে যান। না খেতে পেয়ে শয়ে শয়ে মানুষকে পরিবার সমেত অনাহারে মৃত্যুবরণ করতে হয়। দেশজুড়ে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। তুঘলকের বিরুদ্ধে জনরোষ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। কর আদায়ের জোরাজুরি ও তার বিরোধিতায় দেশের নানা প্রান্তেই শুরু হয় বিদ্রোহ। এহেন অচলাবস্থা মহম্মদ বিন তুঘলকের শাসনকালকে ইতিহাসের পাতায় কটাক্ষের বাণ ও চরম ব্যর্থতা হিসাবেই তুলে ধরেছে। এগুলি ছাড়াও প্রায় ২৬ বছরের শাসনে তিনি এমন বহু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যার জেরে তাঁর প্রশাসনিক ব্যর্থতা চরম রূপ নেয়।
এ তো গেল মহম্মদ বিন তুঘলকের কথা। যিনি সুযোগ্য, জ্ঞানী এবং বীর হয়েও মানুষের আদরের পাত্র থেকে অনাদরের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাঁর এই রাজনৈতিক ব্যর্থতাকে পরবর্তীতে কটাক্ষ করতে ‘তুঘলকি ফরমান’ বলে অভিহিত করা হয়। যা আজকের রাজনীতিতেও একইভাবে সচল। কেন্দ্রীয় সরকার হোক বা দেশের যেকোনো প্রান্ত। শাসকের খামখেয়ালি সিদ্ধান্তকে বিরোধীরা তুঘলকি ফরমান বলেই প্রতিবাদ করেন। এমন বহু নজির আমাদের দেশেও আছে।
সাম্প্রতিক সময়ে তুঘলকি ফরমান বলতে সবচেয়ে বেশি যার কথা বলতে হয়, সেটি নির্বাচন কমিশন। এসআইআরে মানুষকে আরও একবার লাইনে দাঁড় করানো থেকে শুরু করে, ভোট ঘোষণার পর তুঘলকি কায়দায় পশ্চিমবঙ্গের শীর্ষস্থানীয় প্রশাসনিক অফিসার মুখ্যসচিব, পুলিশ কমিশনার থেকে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক স্তরে এক রাতের মধ্যেই আমূল রদবদল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম প্রতিক্রিয়াই ছিল ‘কমিশনের তুঘলকি কার্যকলাপ।’সাম্প্রতিক সময়ে কমিশনের অতিসক্রিয়তার সঙ্গে তুঘলকের খামখেয়ালিপনার সবচেয়ে মিল। আর যার হাত ধরে কমিশন এতটা উদ্যত সেই কেন্দ্রের বিজেপি সরকার তো অনেক আগে থেকেই তুঘলককে অনুসরণ শুরু করেছে। যার প্রথম পদক্ষেপই ছিল নোট বাতিল। কেন্দ্রের শাসন ক্ষমতায় বসার মাত্র দু’বছরের মধ্যেই ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর ঘোষণা করা হল নোট বাতিল। হঠাৎ করেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাত আটটার জনভাষণে বাতিল হয়ে গেল পুরানো ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট। বছর দশেক আগের সেই ঘটনাকে আম আদমি পার্টি তো বটেই তার সঙ্গে বহু রাজনৈতিক দলই তুঘলকি কারবার বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন। শুরু হয়ে যায় দেশজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ। তার সামাল দিতে এল দু’হাজার টাকার নোট। তার ভাঙানি করতে গিয়ে আবার আর এক ব্যয়রাম। যাই হোক, বছর দুয়েক এভাবে চলতে চলতে আমাদের যা হয় তাই হল। গা-সওয়া। তারপর বলতে হয় কোভিডবিধির কথা। এটা ঠিক যে, সেই কোভিডকালে সমাবেশ থেকে শুরু করে একসঙ্গে বহু মানুষের সমাগম অবশ্যই বাতিল করারই ছিল। তবে অপরিকল্পিতভাবে দিনের পর দিন লকডাউন করে, পরিবহণ ব্যবস্থা বন্ধ করে, মানুষকে ঘরবন্দি করে রাখার প্রয়াসে কী হল? আলো নিভিয়ে, থালা বাজিয়ে লাভ কী হল? সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলের একাংশ তো বটেই, এমনকি নাগরিক মহলের অনেকেও একে ‘তুঘলকি ফরমান’ বলে দাবি করেছিলেন। বহু মানুষের চাকরি গিয়েছে, বহু ছোটো ব্যবসায়ী কাজ হারিয়ে আত্মঘাতী হতে বাধ্য হয়েছেন। কোভিডে মৃত্যু না হলেও তাঁরা কোভিডকালের বিধিনিষেধের শিকার হয়ে নিজেদের জীবনটাকেই বাজি রেখেছিলেন।
তুঘলকি কাণ্ডকারখানার প্রশ্নে অন্য একটি প্রসঙ্গে আসা যাক। ঝাড়খণ্ডে সাধারণ জলাশয়ে ছটপুজো পালনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল সে রাজ্যের জেএমএম সরকার। এই নির্দেশকে তুঘলকের রায়ের সঙ্গে তুলনা করে বিজেপি। আবার দিল্লিতে ১৫ বছরের পুরানো গাড়ি বাতিলের সিদ্ধান্তকেও বিরোধীরা তুঘলকি সিদ্ধান্ত বলে ব্যাখ্যা করেছে। অভিযোগ ওঠে, গাড়ি প্রস্তুতকারীদের সুবিধা পাইয়ে দিতে আর সাধারণ মানুষের উপর আরও বোঝা চাপাতে এই উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আবার এই তালিকায় আরও একটি সংযোজন হতে পারে বিহারে মদ বাতিলের নীতিও। শুনতে খারাপ লাগলেও দেশের কোনো রাজ্যেই বোধহয় সম্পূর্ণভাবে মদ বাতিল করা সম্ভব নয়। সেখানে বিহারে সরকারিভাবে মদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। অনেকে ধন্য ধন্য করল। ভালো উদ্যোগ। কিন্তু আখেরে হলটা কী? রেজিস্টার্ড দোকান থেকে কিনে যেখানে মানুষ মদ্যপান করতে পারতেন, সেখানে মদ বাতিল হওয়ার পরে শুরু হয়ে গেল কালোবাজারি। হয়তো বেশি দাম দিয়ে উলটোপথে কিনতে হচ্ছে চোলাই মদ! যা মানুষের জন্য এক ধরনের বিষ। আর বিহারে মদ বাতিল হওয়ার পর থেকেই সংবাদমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি প্রকাশিত হয়েছে বিষমদে মৃত্যুর খবর। সোশ্যাল মিডিয়া হোক বা সাধারণ মানুষ। অনেকেই মদ বাতিলের এই সিদ্ধান্তকে ‘তুঘলকি রায়’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
মহম্মদ বিন তুঘলক নয়। বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নানা সিদ্ধান্তই হঠকারিতার জেরে মানুষের উপর চাপ বাড়িয়ে চলেছে। তুঘলক চলে গিয়েছেন প্রায় সাতশো বছর আগে। অথচ তাঁর তুঘলকিয়ানার শেষ এখনও হয়নি। এই ধরুন না, চলতি বছরেই নির্বাচন কমিশনের কথা। ভোটের আগে যে পদ্ধতিতে এসআইআর চালু করে ফের মানুষকে লাইনে দাঁড় করানো হল, তা তুঘলকি ফরমানের থেকে কম কীসে। দেশবাসী হয়েও নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে আরও একবার মাথায় বিপুল চিন্তা নিয়ে নথিপত্র ঘেঁটে খুঁজে বের করে লাইনে গিয়ে দাঁড়ানো। দিল্লির সুলতান চেয়েছিলেন রাজকোষ এবং রাজ প্রশাসনকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে। কিন্তু তা করতে গিয়ে বার বার তিনি দেশের মানুষেরই স্বার্থে বড়োসড়ো আঘাত দিয়ে ফেলেছিলেন। আজকের দিনেও প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের এমন বহু সিদ্ধান্ত রাজভার সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে গিয়ে মানুষের ঘাড়েই বড়োসড়ো বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যে মানুষের জন্য সবকিছু, তাঁদেরকেই চাপে ফেলে কখনোই প্রশাসন সুস্থ হতে পারে না। যাঁরা এখনো ক্ষমতার মায়ায় সাধারণের অসুবিধা বুঝতে অক্ষম, তাঁদের এটা বুঝতে হবে। না হলে আরও কয়েকশো বছর পেরিয়ে যাবে। কিন্তু তুঘলকিয়ানার শেষ কোনোদিনই হবে না।