


ক্ষমতা চায় তাঁবেদার। কিন্তু এমন গুণধর যে সকলে হতে পারে না। তার জন্য উদ্দিষ্ট ব্যক্তির কিছু বিশেষ ‘যোগ্যতা’ অর্জন আবশ্যক। সকলে জানে, সেটা হল—শিক্ষার ন্যূনতা, মেরুদণ্ডের দুর্বলতা, অনৈতিক উপায়ে ব্যক্তিস্বার্থসিদ্ধির ঝোঁক এবং অবশ্যই সৎসাহসের অভাব। উপর্যুক্ত গুণাবলির অধিকারী ব্যক্তির পক্ষে কখনো ঋজুশির হওয়া সম্ভব নয়। সে ভক্তিভাবে ক্ষমতার পায়ে নতজানু হয়ে থাকে সতত। পারিপার্শ্বিক কুপ্রভাবসমূহ তাকে কোনোভাবে বিচলিত করতে পারে না। তাঁবেদারিতে এমন অবিচল শুধু ব্যক্তি নয়, ছোটো বড়ো বহু প্রতিষ্ঠানও হতে পারে। কারণ প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির ঊর্ধ্বে হলেও তা ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের গোষ্ঠীর দ্বারা পরিচালিত। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের পরিচালকের আসনে নরেন্দ্র মোদি। বিজেপি নামক কেন্দ্রীয় শাসক দলেরও প্রকারান্তরে সর্বেসর্বা তিনি। বিজেপি হল আরএসএসের রাজনৈতিক শাখা, অর্থাৎ সংঘের চেলা। দলটির আরো একটি পরিচয় হল, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জনসংঘের (তারও পরে ভারতীয় জনসংঘ) উত্তরসূরি। এই সংগঠনটি ভারতের সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধতা মেনে নিয়েও চেতনা-চৈতন্যে উগ্র দক্ষিণপন্থী। আরো খোলসা করে বলা যায়, উগ্র হিন্দুত্ববাদী। উত্তরসূরি হিসাবে বিজেপিও জনসংঘের ঐতিহ্য ধারণ ও রক্ষায় প্রশ্নাতীতভাবেই অবিচল।
এমন একটি সংগঠনের কাছে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, স্বতন্ত্রতা ও সাম্যের নীতি প্রত্যাশা করা মূর্খামিমাত্র। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি যে নেতৃত্বের জন্ম দেয় তারা বশংবদ গোষ্ঠী চায়, তাদের লালন পোষণ করে থাকে সযত্নে। গণতন্ত্রের উদার পরিসরে পা রেখে স্বৈরতন্ত্রের জাল বিস্তারের জন্য এর চেয়ে উত্তম কৌশল ভূভারতে আর কী আছে? নরম হিন্দুত্বকে সামনে রেখে ভারতে ক্ষমতার অলিন্দে পা রেখেছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। বাজপেয়ীজির প্রতি ভারতবাসীর মুগ্ধতাকে হাতিয়ার করে ২০১৪ সালে সূচনা হয়েছে মোদিযুগের। মোদিযুগের খিদে শুধু দিল্লির কুর্সিতে মেটে না, তা সর্বগ্রাসী। তারা একচ্ছত্র ক্ষমতা চায় রাজ্যে রাজ্যেও। সম্ভব হলে সংবিধানও লেখে নতুন করে এবং নবীন ভাষায়! তার জন্য ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির সার্বিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করাও জরুরি। বলা বাহুল্য, টানা বারো বছরের শাসনকালে নরেন্দ্র মোদি এই লক্ষ্য পূরণে অনেকটা সফল হয়েছেন। তবে বাকি এখনো অনেকখানি। এই উদ্যোগে মোদি সরকারের হাতিয়ার জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ বা এনইপি ২০২০। হাজার দোষত্রুটি এবং বিরুদ্ধ সমালোচনা সত্ত্বেও যেসব রাজ্য এই অবৈজ্ঞানিক ফতোয়া ভক্তিভরে মেনে নিয়েছে, সেখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি দিল্লির চোখে ‘ভেরি গুড বয়’!
পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরল প্রভৃতি সচেতন রাজ্যের পক্ষে গড্ডলিকায় ভেসে যাওয়া সম্ভব হয়নি। স্বভাবতই, তারা পড়েছে মোদিবাবুর রোষানলে। একদিকে, মোদি সরকারের শিক্ষানীতি ক্ষতিকর ও জনবিরোধী এবং অন্যদিকে, জারি রয়েছে বাংলাসহ সমস্ত ‘সিঙ্গল ইঞ্জিন’ রাজ্যের প্রতি বেনজির বঞ্চনার নষ্টামি। এমন অনাচারের বিরুদ্ধে বাঙালি প্রতিবাদে গর্জে উঠবে না তা হয় নাকি? স্বাধীনতা আন্দোলনের শিক্ষায় স্নাত অনুপ্রাণিত পশ্চিমবঙ্গের প্রায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিবাদে মুখর সর্বক্ষণ। এই ব্যাপারে নেতৃত্বে রয়েছে যাদবপুর এবং প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়। তাহলে মোদিবাবুরা এদের সহ্য করেন কোন যুক্তিতে? দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেও, সেই অসহিষ্ণুতা তিনি প্রকাশ করে ফেলেছেন কলকাতায় দাঁড়িয়ে, নির্বাচনের নির্বাচিত ময়দানে। এজন্য তাঁর পদমর্যাদার পাশাপাশি নরেন্দ্র মোদি ভুলে গিয়েছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বর্তমান গর্ব। পরে তাঁর সঙ্গে যোগ্য সংগত করেছেন বিতর্কিত গেরুয়া নেতা দিলীপ ঘোষ। আসলে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার সঙ্গে দেশবিরোধিতাকে গুলিয়ে দিতে চাইছে ঘোলা জলে মাছ ধরে অভ্যস্ত মতলববাজরা। ভোট আসবে ভোট যাবে। কিন্তু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলি থাকবে বহুকাল। তারা দেশ ও জাতিকে আলো দিয়ে যাবে। জগৎসভায় ভারতের জন্য শ্রেষ্ঠ আসন সংরক্ষণের গুরুদায়িত্ব পালন করবে তারাই, কুসংস্কার ও স্বৈরতন্ত্রের প্রোমোটাররা নয়। অঞ্চল ও রাজনীতি নিরপেক্ষ অখণ্ড শিক্ষিত ও শিক্ষানুরাগী সমাজের সকলের উচিত, মোদিজির কুমন্তব্যের সমুচিত জবাব দেওয়া এবং যথাস্থানেই।