সুকমল দালাল, বোলপুর: দশভুজা নন। হাতে নেই অস্ত্র। দু’ হাতেই বরাভয়। পাশে মহাদেব। এই বিশেষ রূপেই প্রায় ৩০০ বছর ধরে পূজিত হয়ে আসছেন বোলপুরের রায়পুর গ্রামের রায় পরিবারের দুর্গা।
সুকমল দালাল, বোলপুর: দশভুজা নন। হাতে নেই অস্ত্র। দু’ হাতেই বরাভয়। পাশে মহাদেব। এই বিশেষ রূপেই প্রায় ৩০০ বছর ধরে পূজিত হয়ে আসছেন বোলপুরের রায়পুর গ্রামের রায় পরিবারের দুর্গা।
এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে গ্রামের ইতিহাসও। পরিবার সূত্রে জানা যায়, কয়েক শতক আগে রায়পুরে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস ছিল। তাঁদের মধ্যে বণিক সম্প্রদায়ের সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁদের উদ্যোগেই শুরু হয় হর-পার্বতীর আরাধনা। পরবর্তীকালে নানা কারণে বণিক সম্প্রদায়ের পক্ষে পুজো চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তখন রায় পরিবারের সদস্যরা পুজোর দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দেন। সেই থেকেই রায় পরিবার করে চলেছে এই পুজো। পরিবারের বর্তমান সদস্যরা নিষ্ঠাভরে সেই দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
পুজোর রীতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। এখনও একই মণ্ডপে শিব ও দুর্গার আরাধনা হয়। চারদিন ধরে দেবীর সঙ্গে পূজিত হন দক্ষরাজ ও নারদও। সেই কারণেই স্থানীয় মানুষের কাছে এই পুজো এখনও ‘হর-পার্বতীর পুজো’ নামে পরিচিত। এই পুজোর ভোগেও রয়েছে বৈশিষ্ট্য। দেবীকে নিবেদন করা হয় ন’ রকম ভাজা। থাকে ন’ রকম তরি-তরকারিও। পুরনো দিনের রীতি মেনেই ভোগ রান্নার এই পরম্পরা এখনও বজায় রয়েছে।
এক সময়রায় পরিবারের সদস্যরাই নিজেদের হাতে প্রতিমা তৈরি করতেন। তবে সময়ের সঙ্গে পরিবারের সদস্যসংখ্যা কমেছে। তাই কয়েক বছর ধরে বাইরে থেকে মৃৎশিল্পী এনে প্রতিমা তৈরি করা হচ্ছে। তবে প্রতিমার রূপে বদল আনা হয়নি। বৈষ্ণব রীতিতেই পুজোহয় এখানে। অষ্টমীর দিন রয়েছে বিশেষ একটি প্রথা। দীর্ঘদিনেররীতিমেনে ওই দিন মাসকলাই বলি দেওয়া হয়। প্রাচীন সেই রীতি এখনও ধরে রেখেছে রায় পরিবার। এই পুজো দেখতে দূরদূরান্ত থেকেও বহু মানুষ আসেন। গ্রামের এই পুরনো পুজোঘিরে এখনও তৈরি হয় আলাদা আগ্রহ। সময়বদলেছে। বদলেছে গ্রামের অনেক কিছু। কিন্তু রায় পরিবারের দুর্গাপুজোর মূল রীতিতে সেই পরিবর্তনের ছাপ পড়েনি। এবারও পুরনো প্রথা মেনেই পুজোরআয়োজন করা হয়েছে। পরিবারের অন্যতম সদস্য সঞ্জয়রায় বলেন, এই পুজোর সঙ্গে আমাদের পরিবারের বহু প্রজন্মের স্মৃতি জড়িয়ে। পূর্বপুরুষরা যে রীতি শুরু করেছিলেন, এখনও সেই পরম্পরাই মেনে চলছি। সময়ের সঙ্গে কিছুটা পরিবর্তন হলেও পুজোর মূল আচার-বিধি একই রয়েছে। আগামী প্রজন্মও যাতে এই ঐতিহ্য ধরে রাখে, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। রায়পুর গ্রামে দুর্গাপূজা।