


সংবাদদাতা, হলদিয়া: ‘গেমচেঞ্জার’ তাপসী মণ্ডলের জয়ের হ্যাট্রিক করে দেড়দশক পর তৃণমূলকে জয়ের স্বাদ দেবে, না ‘হেরো’ প্রদীপ বিজলি বিজেপির তুরুপের তাস, তা নিয়েই এখন জোর ভোট চর্চা চলছে বন্দর শহরে। এবার হলদিয়ার ভোট ময়দানে দুই মূল প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল ও বিজেপি প্রার্থী ভোট প্রচারের সময় ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছেন। বিদায়ী বিধায়ক হলদিয়ার তৃণমূল প্রার্থী তাপসী মণ্ডলের কাছে সেবার গোহারা হেরেছিলেন পদ্ম প্রার্থী প্রদীপ বিজলি। মাত্র ৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন তিনি। ভোট প্রচারের সময় তৃণমূলের তাপসীকে যখন ‹দলবদলু› বলে আক্রমণ শানাচ্ছেন পদ্মের প্রদীপ, তখন পাল্টা ‹হেরোভূত› খোঁচা শুনতে হচ্ছে তাঁকেও। ‹দলবদলু› বনাম ‹হেরোভূত›-র তরজা হলদিয়া বিধানসভার শহর থেকে গ্রামের পথে, হাটেবাজারে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে। সেজন্য এবারের ভোট যুদ্ধ হলদিয়ার দুই মূল প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল ও বিজেপির কাছে সম্মান রক্ষার লড়াই। তবে পুরনো নেতাকর্মীদের গোঁসা ভাঙাতে গিয়ে দুই দলের প্রার্থীরই রীতিমতো কালঘাম ছুটছে। গেমচেঞ্জার তাপসী এবার হলদিয়ায় তৃণমূলের কপালে জয়টিকা পরাবেন, সেই আশায় বুথে বুথে ঘাম ঝরাচ্ছেন দলীয় কর্মীরা। অন্যদিকে, হলদিয়া বিধানসভা আসন ধরে রাখাই এবারের নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী প্রদীপ বিজলির কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রাক্তন পুর ইঞ্জিনিয়ার অশোক পাত্রকে প্রার্থী করে ২০১৬ সালের মতো ফের মিরাকেল ঘটানোর স্বপ্ন দেখছে সিপিএম।
রামনবমীর ছুটির দিন সকালে তৃণমূল ও বিজেপির দুই প্রার্থীর দেখা মিলল বিধানসভার দু›জায়গায়। তৃণমূলের তাপসী মণ্ডল বেছে নিয়েছিলেন সুতাহাটা ব্লকের গুয়াবেড়িয়ার গ্রামীণ এলাকা। সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ গুয়াবেড়িয়ার গোড়াদোরো, আগাদোরো গ্রামে তৃণমূল প্রার্থী পৌঁছতেই মহিলাদের কী উচ্ছ্বাস! শাঁখ বাজিয়ে, রজনীগন্ধার মালা দিয়ে তাঁকে বরণ করে নিচ্ছেন নানা বয়সের মহিলারা। হাত জড়ো করে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় মহিলারা এসে অনেকে আবেগে জড়িয়ে ধরছেন তাঁকে। বয়স্করা আশীর্বাদ করছেন ফুল ছড়িয়ে। গোড়াদোরোর সুদীপ পণ্ডা ও শেফালী পণ্ডা বলেন, তাপসী মণ্ডল এবার জয়ের হ্যাট্রিক করতে পারেন বলে মনে হচ্ছে। আপ্লুত তাপসী তাঁদের উদ্দেশে বলেন, আমি আপনাদের বোন, আমার পাশে থাকবেন। খোঁজ নিলেন সবাই লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাচ্ছেন কি না? দু›-একজন এগিয়ে এসে সমস্যার কথাও বললেন। বিজেপি প্রার্থী প্রদীপ বিজলির সঙ্গে দেখা পুরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডে। কংক্রিট ইট বাঁধানো রাস্তায় হাত জড়ো করে হাঁটছেন। সামনে উৎসাহী কর্মীরা বাজনা বাজিয়ে চলেছেন প্রার্থীকে নিয়ে। প্রদীপ বলেন, মানুষের আবেগ দেখেছেন? হলদিয়ায় বিজেপিকে এবার ঢেলে ভোট দেবে মানুষ। তৃণমূলের প্রার্থী দলবদলু। ২০১৬ সালে সিপিএম, ২০২১ সালে বিজেপি এবং ২০২৬ সালে তৃণমূল। ভোট এলেই উনি নিজের আখের গোছাতে দলবদল করেন। এই বিষয়টিকে হলদিয়ার মানুষ ঘৃণা করছে।
বিজেপি প্রার্থীর মতো হলদিয়ার বহু তৃণমূল ভোটারের প্রশ্ন, দলের নেতৃত্ব আর কোনো প্রার্থী খুঁজে পায়নি? শেষমেশ একজন দলবদলুকে হলদিয়ার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। দলবদলু প্রশ্নেই কার্যত জেরবার প্রার্থী তাপসী মণ্ডল ও তৃণমূল নেতৃত্ব। সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়াল থেকে ইটের দেওয়াল সর্বত্র ‹বহুরূপী গিরগিটি›র ছবি দিয়ে তাপসীর নাম লিখে ভাইরাল হয়েছে। ভোট ময়দানে এর পাল্টা জবাব দিচ্ছেন তাপসী। তিনি বলেন, দলবদল যদি মানুষের স্বার্থে হয় সেখানে অন্যায় কোথায়। নিশ্চিতভাবে আমি দলবদল করেছি। এখানে আমার কোনো কষ্ট নেই। হলদিয়ার মানুষকে বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য দলবদল করেছি। বিজেপির এক নেতা বলেন, প্রদীপবাবু তো একসময় আরএসএসের ট্রেড ইউনিয়ন বিএমএস করতেন, বিজেপিকে এড়িয়ে চলতেন। উনি বলতেন বিএমএস ও বিজেপি সম্পূর্ণ আলাদা। বিজেপির মঞ্চে থাকতেন না। ওঁর মুখে দলবদলু আক্রমণ শোভা পায় না। হলদিয়া শিল্পাঞ্চলের ভোটে বরাবরই শ্রমিকরা নির্ণায়ক শক্তি। তাদের দাবিদাওয়া, বেতনচুক্তি ভোটে প্রভাব ফেলে। বন্দরের ঠিকা শ্রমিকরা বলেন, আমাদের কাজ নিয়ে অনিশ্চয়তা চলছে। এজন্য অবস্থান করছে শ্রমিকরা। এক্ষেত্রে শ্রমিক ইউনিয়নের ভূমিকার উপর ভোট নির্ভর করছে। হলদিয়া পুরসভার ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ব্যবসায়ী সুশান্ত দাস বলেন, এবার তৃণমূলের সংগঠন বনাম বিজেপির আবেগের লড়াই হচ্ছে হলদিয়ায়। তৃণমূলের প্রার্থী এগিয়ে রয়েছেন তাঁর পরিচিতির দিক থেকে। বিজেপি প্রার্থীকে বন্দর এলাকার বাইরে সেভাবে কেউ চেনেই না। হলদিয়ার ভোট ময়দানে বামেদের সিপিএম প্রার্থীকে ‹ভোটকাটুয়া› হিসেবে কটাক্ষ করছে তৃণমূল ও বিজেপি। তবে সিপিএম প্রার্থী অশোক পাত্র বলেন, দুই প্রার্থীর সঙ্গে ব্যক্তিগত বিরোধ নেই, বামেরা হলদিয়ায় নীতির লড়াইয়ে নেমেছে। হলদিয়ায় শ্রমিকদের দুরাবস্থা চলছে, বামেরা জিতলে তাদের পাশে থাকবে। প্রচারে তৃণমূল প্রার্থী তাপসী মণ্ডল।-নিজস্ব চিত্র