খিদিরপুরের ২৫ পল্লিতে থমকে ‘সময়’
  • ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সৌগত গঙ্গোপাধ্যায়, কলকাতা: গলির মুখেই ছোট্ট চায়ের স্টল! উনুনে বসানো কেটলি থেকে উড়ে আসছে আদা-এলাচের গন্ধ। মাটির ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে দোকানি একইসঙ্গে তিনজনের গল্প শুনছেন। বেঞ্চে পা ছড়িয়ে বসা বুড়োরা রীতিমতো তর্কে মত্ত, খিদিরপুরে এবারের সেরা পুজো কোনটা হতে চলেছে? ২৫ পল্লি, ৭৪ পল্লি, ভেনাস ক্লাব নাকি পল্লি শারদীয়া? বিস্কুট চায়ে ডুবিয়ে একজন বলে উঠলেন, ‘আমি তো সব প্যান্ডেলেই যাব। তর সইছে না। ঢাকের কাঠি আওয়াজ এখনই মনে বাজছে।’ আর অমনি সবাই চুপ। কেটলির বাষ্পে মিশে গেল একটাই অনুভূতি, মা আসছে!

Advertisement

চায়ের দোকান ছাড়িয়ে হরিসভা স্ট্রিট দিয়ে একটু হেঁটে গেলেই ২৫ পল্লির পুজো। রীতিমতো যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজে ব্যস্ত শিল্পীরা। কিন্তু প্যান্ডেলের মুখে এ কী! রামায়ণের বৃদ্ধ জটায়ু! তার পিছনে আবার উড়োজাহাজের পাখা লাগানো! সময়ের সঙ্গে এমন বিবর্তন? আরে আপনাদের তো বলতেই ভুলে গিয়েছি। খিদিরপুরের ২৫ পল্লির এবারের থিম ‘সময়।’ শিল্পী সুজিত দাসের ভাবনায়, ‘সময় না থাকলে মানুষের অস্তিত্ব, ঘটনা বা ব্রহ্মাণ্ড কিছুই থাকত না। এই চিন্তাভাবনাকেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আজ সবাই ছুটছে, তাই একটু থেমে চারপাশটা দেখার ডাক দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাখা হয়েছে প্রকৃতি ও বিল্ডিং, আগের ধীর সময় ও এখনকার দ্রুত সময়।’ সতিই ২৫ পল্লির প্যান্ডেলে ঢুকলে আপনার সময় থমকে যেতে বাধ্য। একদিকে চোখে পড়বে মাইগ্রেশনের বড় পেন্টিং, মহাভারতের ১২০০ পাতার অ্যানিমেটেড স্ক্রল। অন্যদিকে, রয়েছে ঝুলন্ত গাড়ি-প্লেন। সময়ের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ একেবারে মিলেমিশে একাকার। যুগ্ম-সম্পাদক কাজল ব্যানার্জির কথায়, ‘৮২ বছরে পা দিল আমাদের পুজো। নব পালের প্রতিমা অন্যতম চমক। পুজোপ্রেমীদের জন্য রইল সাদর আমন্ত্রণ।’
খিদিরপুরে শারদোৎসব মানেই বিবিধ ভাবনার সমাহার। তাই এক জায়গায় থেমে থাকলে হবে না, গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসুন ৭৪ পল্লিতে। সেখানে এবারের থিম ‘কলমকারি।’ অন্ধ্রপ্রদেশ-তেলেঙ্গানার বিখ্যাত হস্তশিল্প এবং বস্ত্রচিত্রশিল্পকে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী অভিক সেন। মায়ের প্রতিমাতেও থাকছে বিশেষ চমক। শিল্পী পল্লব শেখর দাস ফুটিয়ে তুলেছেন, অকালবোধনে শ্রী রামচন্দ্রের পুজো পেয়ে পাথর থেকে বেরিয়ে আসছেন মা দুর্গা। তবে খিদিরপুরের অকালবোধন বিখ্যাত ভেনাস ক্লাবে। এবার ৮১ তম বছরে রয়েছে থিমেরও ছোঁয়া, ‘এক গুচ্ছ চাবি’।— হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন, সলিল চৌধুরির বিখ্যাত কবিতা, ‘এক গুচ্ছ চাবি’ থেকেই অনুপ্রাণিত। প্যান্ডেলের দেওয়ালে চোখে পড়বে চাবি লাগানো পুরানো দিনের দরজার ছবি। ক্লাবের সম্পাদক হিমাদ্রি শেখর দাঁ বললেন, ‘উত্তরাধিকার সূত্রেই চাবির গোছা পায় পরের প্রজন্ম। এই প্রবাহমান ধারাই আমরা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছি। এবার আমাদের প্রতিমায় রূপদান করেছেন মূক-বধির শিল্পী শুভজিৎ সাউ।
শারদোৎসবের রং মাখতে এবার ‘চল যাব তোকে নিয়ে’ পল্লি শারদীয়ায়। আরে আপনাকে বলছি না! পল্লি শারদীয়ার এবারের থিমই ‘চল যাব তোকে নিয়ে।’ কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ট্রামকে প্যান্ডেলে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী দেবজ্যোতি জানা। কারণ, কলকাতা তো বটেই, খিদিরপুরের সঙ্গে ট্রামের সম্পর্ক বেশ গভীর। ১৯০২ সালে ভারতের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম চলেছিল খিদিরপুর থেকে এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত। ট্রামের থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মায়ের মূর্তি গড়েছেন শিল্পী সৌমেন পাল।  ৭৪ পল্লির প্রতিমা। নিজস্ব চিত্র