শ্যামল চক্রবর্তী: এক কলসি জল খেয়ে আগের রাতে ন’টায় ঘুমোতে গেলেন বামনদাস ভট্টাচার্য। প্রকৃতির ডাকে ঘুম ভাঙল রাত একটায়। তাড়াতাড়ি স্নান সেরে পরনে হেটো ধুতি, গলায় নামাবলী, কাঁধের ঝোলায় তিল। খালি পায়ে দৌড়াচ্ছেন নদীর দিকে। মধ্য যামিনীতে গঙ্গার পারে পুরোহিত মশাই। খদ্দের আসা শুরু করা মাত্র, হাতে হাতে সামান্য তিল গুঁজে দিচ্ছেন। এবার গঙ্গার জলে। থমকে গেলেন। পন্ডিত মশাইয়ের পূর্ব অভিজ্ঞতা তিক্ত। অনেকেই তর্পণ সেরে দক্ষিণা দিতে ভুলে গিয়ে ভ্যানিশ হয়ে যান! এবার তাই অভিনব ব্যবস্থা। জলে নামার আগেই অগ্রিম দক্ষিণা। ফেলো কড়ি, নাও তিল! দক্ষিণা আর তিলের অর্থপূর্ণ হস্তান্তর! জনাদশেক মানুষ জুটে গেলেই অন্ধকার গঙ্গার ঘাটে ব্যাগ হাতড়ে টর্চ বের করে সাবধানে পা ফেলতে ফেলতে জলে। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ফার্স্ট ব্যাচকে পূর্বপুরুষদের জন্য তিল ও জল উৎসর্গ করবার শাস্ত্রীয় বিধির মন্ত্রারম্ভ!
ওদিকে, পুরোহিত নিতাই গোস্বামী দেরি করে নদীর ঘাটে এসে কাঁদতে কাঁদতে মাথা চাপড়াচ্ছেন! বামনদাসের তখন থার্ড ব্যাচ চলছে! ঝড়ের বেগে মন্ত্র পড়ে তাড়াতাড়ি এই ব্যাচটাকে ছেড়ে দিয়ে, অগ্রিম দক্ষিণা নেওয়া চতুর্থ ব্যাচের গ্রাহকদের হাত নেড়ে ডাকছেন। গৌরব তর্কালঙ্কার, মাধব চক্কোত্তি, মোহিনী বাগচিরা গঙ্গার ঘাটে এসে আশাভঙ্গের যন্ত্রণায় ঠাস ঠাস করে নিজেদের কপালে নিজেরাই চপেটাঘাত করছেন! গৌর ভট্টাচার্যর মাথাভরা বিশাল টাক। ভুল করে কপালের বদলে টাকে চাপড় মারতে শুরু করেছেন! সূর্যদেব দেখা দিতেই ধূর্ত পন্ডিত বামনদাসের সপ্তম ব্যাচ মন্ত্র পড়া শেষ করে গঙ্গার জলে ডুব দিলেন। ঝড়তি পড়তি সামান্য কয়েকজনকে নিয়ে আমসি-বদনে বাকি পুরোহিতরা জলে নামছেন। যজমান প্রতি এক টাকা হারে সাড়ে তিনশো টাকা ট্যাঁকে গুঁজে ভেজা কাপড়ে আহ্লাদিত চিত্তে বাড়ির রাস্তা ধরছেন মগজাস্ত্রধারী বামনদাস ভট্টাচার্য! ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে!’ মনে মনে একটানা জপ করে চলেছেন মা দুর্গার নাম। নামকরা এক বারোয়ারি পুজোর দায়িত্ব পেয়েছেন পুজো কমিটির সেক্রেটারিকে কিঞ্চিৎ টঙ্কাদান করে। বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে দিবাস্বপ্ন।
‘তর্পণ’ শব্দটা এসেছে সংস্কৃত ‘তৃপ’ থেকে। তর্পণ বলতে আক্ষরিক অর্থে ‘তুষ্ট করা’। আসল অর্থে ‘স্মরণ’। পুরাণের শরণ নিলে, পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে প্রথম তর্পণ করেছিলেন দশরথ-তনয় রামচন্দ্র। ‘পিতৃপক্ষ’ শব্দের উৎপত্তি সম্ভবত সেখান থেকেই। পিতৃপক্ষ না হয়ে পিতৃ-মাতৃপক্ষ বা মাতৃপক্ষ হল না কেন? উত্তরটা সহজ। আমাদের দেশে যুগ যুগ ধরে চলে আসা পুরুষতন্ত্রের দাপটের সুবাদে। গুগলজেঠুকে নারী-পুরুষের সমানাধিকার শেখাতে কেউ একটা পিতৃ শব্দটার পর মাতৃ যোগ করে দিয়েছেন। ‘সংগৃহীত’ ও ‘এডিট’-এর জমানায় সবই সম্ভব!
‘মহালয়’-এর অর্থ মহান আলয় বা নিবাস। পৌরাণিক বিশ্বাস, দুর্গাপুজোর আগের অমাবস্যায় পূর্বপুরুষদের আত্মারা নেমে আসেন পূর্ব নিবাসে। সংস্কৃতে অমাবস্যা স্ত্রীলিঙ্গ। তাই ‘মহালয়’ নয়। ‘মহালয়া’।
মহালয়া মানেই ভোররাতে উঠে রেডিয়োতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের অনবদ্য কণ্ঠে বাণীকুমারের লেখা ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনা। ছেলেবেলায় আধো ঘুম আধো জাগরণে এই অনুষ্ঠান পুরোটা কোনোদিন শুনেছেন, এমন মানুষ কেউ থাকলে একটা পোস্টকার্ডে লিখে জানাবেন! নাহলে ঘুম ভাঙাতে হঠাৎ করে ‘জাগো, তুমি জাগো’ বেজে উঠত না! এই ব্যাখ্যাটা অবশ্য সুরসিক বন্ধু রসময়ের। আমাদের পাড়ার অচিন্ত্য ঘুম ভেঙে লাফ মেরে উঠে বসত ‘তব অচিন্ত্য’ গানটা শুরু হলে। ভোর হলেই গোটা পাড়ায় লাফাতে লাফাতে বলে বেড়াত ‘রেডিয়োতে আমার নাম বলেছে, তোদের কারো নাম রেডিয়োতে বলে!’ আমরা তখন শিউলিতলায়। একটা একটা করে শিউলি ফুল মাটি থেকে কুড়িয়ে রাখছি করতলে। শিউলি ফুলের অপার্থিব গন্ধে নেচে উঠছে মন। পুজো এসে গেল।
কপাল খারাপ বামনদাস ভট্টাচার্যের। পরের বছর থেকে অন্য সমস্ত পুরোহিতরা এককাট্টা হয়ে ‘পুরোহিত সংঘ’ তৈরি করে ফেললেন। বামনদাসের বুদ্ধির খেল খতম! আগের দিন রাত ন’টা থেকেই গঙ্গার ধারে হাতে হ্যারিকেন আর থলেতে খাতা-পেন্সিল নিয়ে বসে আছে ঝন্টু-মন্টু-বান্টুদের দল। যিনি যখনই তর্পণ করতে আসুন, খাতায় নাম লিখিয়ে নম্বর লেখা একটুকরো কাগজ নিতে হবে পুরোহিত-দক্ষিণা অগ্রিম জমা দিয়ে। এগারোজন পুরোহিতকে, তর্পণ করতে আসা লোকেদের সমানভাবে ভাগ করে দিচ্ছে ‘তর্পণ সহায়ক সমিতি’র মাথা ঝন্টু আর তাঁর সাগরেদরা। ভুলেও ভাববেন না, সারারাত গঙ্গার ধারে মশার কামড় খেয়ে ওদের এই কাজটা অবৈতনিক সমাজসেবা। শর্ত মেনে মোট দক্ষিণার পঁচিশ শতাংশ পেল তর্পণ সহায়করা! পাঁচজনের পকেটে গোটা পঞ্চাশ করে টাকা ঢুকে গেল অবলীলায়। সৎপথে!
এখনকার দিন হলে আর দেখতে হত না! ‘কাটমানি, কাটমানি, চোর, চোর’ বলে দিকে দিকে চিৎকার চেঁচামেচি হল্লাবোল। ‘ডিমথেরাপি’। খবরের কাগজের সাংবাদিকরা ভালো খবর পেতেন। তর্পণ-সহায়তার টাকা পেয়ে অবশ্য ভালোই হয়েছে ঝন্টুবাহিনীর। পুজোর ক’দিন একের পর এক ঠাকুর দেখতে দেখতে পা টনটন করলে বা নতুন জুতো পড়ে পায়ে ফোসকা পড়লে কোনো খাবারের স্টলের তক্তায় বসে ঘুগনি, পাউরুটি- আলুর দম।
মহালয়া মানে খাদ্যরসের হরমুজ প্রণালী। আর মা দুগ্গার সঙ্গে গণেশের আগমনবার্তা মানেই রসনার কষে-কষা মৌতাত। কী নেই সেই তালিকায়। আইসক্রিম, চমচম, সন্দেশ, কমলাভোগ, পান্তুয়া, দরবেশ, লেডিকেনি থেকে নাড়ু, তক্তি, মোয়া, বোঁদে, নিমকি, খাজা-গজা ইত্যাদি। ফলে পুজোর মরশুমে হাতে কিছু টাকা আসায় নানাবিধ পদ ও মিষ্টান্ন চেখে দেখতে সুবিধাই হয়েছে ঝন্টু-মন্টু-বান্টুদের।
মহালয়াতে পূর্বপুরুষদের জলের সঙ্গে তিল উৎসর্গ কেন? প্রাচীনকাল থেকে আমাদের দেশে তিল একটি অতি পুষ্টিকর খাদ্য। পুষ্টিগুণ বিচার করতে গেলে তিলে রয়েছে অবারিত ক্যালসিয়াম, তিলের তেল গায়ে মাখালে ছোটো বাচ্চাদের ওজন বাড়ে। তর্পণে তাই ধান, যব বা ডালের মতো চিরাচরিত খাদ্যশস্যের বদলে জলের সঙ্গে তিল নিবেদন করে চতুর্দশ প্রজন্মকে তৃপ্ত করাই রীতি।
বামনদাস ভট্টাচার্যদের দিন আর নেই। পৃথিবী বদলে গিয়েছে। তবু ‘সেই ট্র্যাডিশান আজও সমানে চলেছে’। মহালয়ায় ভোর হতে না হতেই নদীর হাজার হাজার ঘাটে জলে নেমে লক্ষ লক্ষ মানুষ পূর্বপুরুষদের পানীয় ও খাদ্য উৎসর্গ করছেন। শয়ে শয়ে পুরোহিত। ফোন নম্বর সহ সাতদিন আগে থাকতেই পুরোহিতদের ফেসবুক পোস্ট! অনলাইন বুকিং! তর্পণের আগেই অনলাইনে তর্পণ-দক্ষিণা! পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে, এআই-এর তাণ্ডবে ‘ডিজিটাল তর্পণ’ শুরু হল বলে!
বহুকাল বাদে এক সকালে কেষ্টজ্যাঠার সঙ্গে দেখা। থলে হাতে বাজারে যাচ্ছেন। জিজ্ঞাসা করলাম,
—‘শরীর খারাপ নাকি জেঠু?’
—‘শরীল না, মনখান ঠিক নাই।’
—‘চলুন ঘণ্টার দিলখুশা টি স্টলে একটু চা খাওয়া যাক।’
—‘কইলা যখন,চলো।’
বেঞ্চে মুখোমুখি বসে চায়ের গেলাসে প্রথম চুমুকটা দিয়ে বিক্রমপুরের বাঙাল উদাস চোখে চেয়ে আছেন দূরের পানে। কিন্তু মুখে রা কাড়ছেন না। একটু অধৈর্য হয়ে বললাম,
—‘কী হয়েছে বলবেন তো?’
—‘আমাগো পাশের বাড়ির তরুণবাবুরে পুলিশ অফিসার পোলায় বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাইয়া দিল। এতকালের বাড়ি ছাইড়া যাওনের সময় আমারে জড়াইয়া ধইরা সেই কি কান্না!’
—‘সে কি!’
—‘নিউজপ্যাপারে দেখ না, চাইরদিকে বৃদ্ধাশ্রমের বিজ্ঞাপন দিন দিন ক্যামনে বাড়তাছে!’
—‘বাপ মা বুড়া হইলে হয় বৃদ্ধাশ্রম, না হইলে সরকারি হাসপাতালে দালাল ধইরা ভরতি করাইয়া দ্যায়! তরুণবাবুর স্ত্রী কম বয়সে মইরা বাইচা গেছেন। আমার আর তুমার জ্যাঠাইমার কপালে যে কি আছে, কে জানে!’
—‘এত ভাববেন না জ্যাঠা। ঋতম সোনার টুকরো ছেলে।’
—‘সুনা পিতল হইতে কতক্ষণ! কই রে ঘণ্টা, আর একখান কইরা ইস্পেশাল চা দে।’ চায়ের অর্ডার দিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছেন জেঠু।
—‘বাইচা থাকতে বুড়া বাপ মায়ের দিকে ফিইরা তাকাইবো না! মইরা গেলে এয়ারকন্ডিশন ‘স্বর্গরথ’-এ চাপাইয়া শ্মশানযাত্রা! হাজার লুক খাওয়াইয়া পাপ ঢাকন! পরের বছর থেইকা মহালয়ার ভুরবেলায় তর্পণ!’
—‘উত্তেজিত হবেন না জেঠু। আপনার প্রেশার বেশি।’
—‘স্ট্রোক হইয়া মরলে বাইচা যাই। এত ভন্ডামি আর সইহ্য করতে পারি না।’ চা শেষ করে গ্লাসটা বেঞ্চের উপরে রেখে উঠে পড়লেন কৃষ্ণচন্দ্র দাস। গম্ভীর মুখে বাজারের থলে হাতে হনহন করে হাঁটতে শুরু করলেন।
মহালয়া এলেই সন্ধ্যায় বাড়ির বারান্দায় বসে বাগানের শিউলির গন্ধে মন আনচান। শৈশব ঝাঁপিয়ে পড়ে বুকে। পাড়ার পুজোর ছোট্ট মণ্ডপে বাঁশের খাঁচা ধরে ঝুলোঝুলি। বাটার জুতোর সঙ্গে পাওয়া রঙিন চশমা পড়ে রঙিন পৃথিবী দেখা। আর মহালয়ার পর থেকেই হিটলারি মেজাজি বাবার সকাল-সন্ধ্যা ঘড়ির কাঁটা ধরে জোরে জোরে পাড়া মাত করে পড়বার আবশ্যিক কর্তব্য থেকে মুক্তি। ইস্কুলে টানা ছুটি। মা স্নানে গেলে খাটের তলায় ঢুকে নাড়ু আর মোয়া চুরির ঝটিতি অভিযান। আগের বারের বন্দুকটা খারাপ হয়ে গিয়েছে। নতুন বন্দুক আর কয়েক বাক্স ক্যাপের জন্য বাবার হাত ধরে ঝুলোঝুলি। আমাদের শৈশবে আনন্দের উপকরণ ছিল খুব কম। ওটুকু থেকেই পুরোটা নিংড়ে নিতে শিখে নিতাম সব্বাই।
অনেক হারিয়েও আজও সবটুকু হারায়নি শৈশব। আজও অসংখ্য শিশু স্কুলের ছুটি পড়লেই ডুব দেয় বাচ্চাদের শারদ সংখ্যার পাতায়। পুজোয় ছবি আঁকে, কবিতা আবৃত্তি করে, গান গায়। প্রতিবেশীর ন’বছরের কন্যা রূপসা পুজোয় পাওয়া অনেকগুলি জামা থেকে একটা সুন্দর জামা উপহার দিয়েছে বাড়ির কাজের মাসির মেয়েকে। অনাথ বাচ্চাদের পুজোয় পেটপুরে খাওয়ানোর উদ্যোগে ভাঁড়ে জমানো টাকা দিয়েছে রিয়ান। শৈশবের কোমল হৃদয়বৃত্তি হারাবে না কোনোদিন। পরিচর্যার দায়, হে পাঠক, আপনার-আমার।
অপৌরাণিক সব নাম কাল্পনিক
ঋণ—নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি



