


সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: রানিগঞ্জের এক স্বঘোষিত তৃণমূল শিক্ষক নেতার দাবি, রানিগঞ্জের ভূমিপুত্রকেই প্রার্থী করতে হবে। তাঁর হাতেই নাকি রয়েছে জয়ের চাবিকাঠি। ওই নেতা আবার রানিগঞ্জ শহরের উন্নয়ন নিয়েও ভোটের আগে কটাক্ষ করছেন। আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভা এলাকার অন্তর্গত রানিগঞ্জ গ্রামীণ এলাকা। সেখানকার কয়েকজন পঞ্চায়েতস্তরের জনপ্রতিনিধি, অঞ্চল সভাপতি দাবি তুলছেন তাঁদের পছন্দের ‘দাদা’কে প্রার্থী করতে হবে। আর তাঁকে প্রার্থী করা হলেই জয় সুনিশ্চিত। অন্য কেউ প্রার্থী হলে তাঁরা যে জয়ে গ্যারান্টি দিতে পারবেন, সেটাও বলে বেড়াচ্ছেন।
এভাবেই শিল্পাঞ্চলে বিধানসভা ভোটের ঠিক আগেই অনুগামীদের দিয়ে নিজেদের ‘গুণকীর্তন’ করাতে ব্যস্ত তৃণমূলের ‘দাদা’রা। কারও ‘দাদা’ এলাকায় কয়লা ব্যবসায়ী। কেউ আবার শাসক দলের দয়ায় কাউন্সিলার হয়েছেন। তিনি এখন বিধায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। ঘরোয়া আলোচনায় বলছেন, ‘দল কেন আমার কথা ভাবছে না।’ তাঁর আবদার যাতে দলের শীর্ষ নেতাদের কানে পৌঁছয়, তার জন্য অনুগামীদের মাঠে নামিয়ে দিয়েছেন ওই ‘দাদা’। কোনও কাউন্সিলার এখন থেকেই গলায় উত্তরীয় চড়িয়ে পাজামা, পাঞ্জাবী পরে জোরদার প্রচারেও নেমে পড়েছেন। তাঁর অনুগামীরা বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি পোস্ট করে তাঁকেই প্রার্থী হিসাবে এগিয়ে দেখানোর মরিয়া প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। পাণ্ডবেশ্বর ও রানিগঞ্জ ব্লকের কয়েকজন নেতাদের দামী গাড়ি করে ঘোরা-ফেরা করা ছবি অনুগামীরা দেদার দিচ্ছেন ফেসবুকে। এআইয়ের কারসাজিতে কাউকে ‘বাঘ’, কাউকে ‘সিংহ’ দেখানো হচ্ছে। যেন বিরোধী প্রার্থীদের একাই হারিয়ে দেবেন! কোনও কোনও স্বঘোষিত নেতার ফেসবুক পেজ ভরে উঠছে বিয়ে বাড়ি, জন্মদিনের পার্টির অনুষ্ঠানে হাজির হওয়া ছবিতে। পঞ্চায়েত প্রধান থেকে ব্লকের নেতারা শুধু দামী গাড়ি নিয়েই ঘুরছেন না, নিজেদের টিকিটের দাবিদার প্রমাণে সঙ্গে রাখছেন ‘মিডিয়া ম্যানেজার’দের। যাঁরা বিভিন্ন পোজে দাদার ছবি তুলে তা পোস্ট করছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার নির্দেশ দিয়েছেন ভোটকে পাখির চোখ করে মাঠে পড়ে থেকে কাজ করতে। নাওয়া খাওয়া ভুলে দলের কাজ করতে হবে। কিন্তু, শিল্পাঞ্চলের শাসক দলের নেতাদের একটি বড় অংশই এখনও ব্যক্তি প্রচারেই মগ্ন। বিশেষ করে যে সব নেতা লোকসভা ভোটে নিজের ওয়ার্ডে দলকে লিড দিতে পারেননি, নিজের বুথেই বিজেপির থেকে পিছিয়ে রয়েছেন তাঁরাই অনুগামীদের নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘জননেতা’ সাজছেন। কিছু কিছু অনুগামী নিজেদের নেতাদের সন্তুষ্ট করতে দেওয়ালে প্রার্থীর নামও লিখে দিয়েছিলেন। যা নিয়ে দলের পক্ষ থেকে কড়া নির্দেশ গেলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘দাদা’ বন্দনা থামাননি। যা নিয়ে দলের নিচুর তলার কর্মী থেকে সাধারণ মানুষ তিতিবিরক্ত। এসআইআর নিয়ে মানুষের হয়রানি তুলে ধরা বা কেন্দ্র সরকারের বিভিন্ন জনবিরোধী নীতির বিরোধীতা না করা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এনিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়েছেন বার্নপুরে তৃণমূল নেতা অমিত সেন। তাঁর পোস্টকে বিভিন্ন মানুষ সমর্থনও করেছেন। তিনি আক্ষেপের সঙ্গে লিখেছেন, ‘বিজেপি কয়লা মাফিয়া জয়দেব খাঁকে দলের বড় পদ দিয়েছে। কেন এই ইস্যুতে স্থানীয় তৃণমূল নেতারা সরব হচ্ছেন না। সবাই কেন টিকিটের দিকে তাকিয়ে?’
অনেকের দাবি, শিল্পাঞ্চলে কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রম নীতির জেরে লাগামছাড়া শ্রমিক শোষণ চলছে। তা নিয়ে ধারাবাহিক আন্দোলন কোথায়? রেল, ইসিএলের কোয়াটারগুলির বেহাল দশা, কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ে মানুষের ক্ষোভ আছে। কিন্তু শাসক নেতারা সেই ক্ষোভকে পুঞ্জীভূত করার জায়গায় নিজের প্রচার নিয়েই ব্যস্ত। তৃণমূল রাজ্য সম্পাদক ভি শিবদাসন দাসু বলেন, ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দল ক্ষমতায় আসার পর যাঁরা দলে যুক্ত হয়েছেন, তাঁরাই এসব করাচ্ছেন। দল সবকিছুই নজর রাখছে।’