বিধানচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়, দুর্গাপুর: কোথাও ব্রিটিশ শাসন ও জমিদারি প্রথার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, কোথাও কৃষিনির্ভর বাংলার ঐতিহ্যে সোনার দিনের স্বপ্ন। আবার কোথাও সমুদ্রের অতলে হারিয়ে যাওয়া পৌরাণিক দ্বারকার রহস্য, কিংবা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের আত্মপরিচয় ও সামাজিক অধিকার। দুর্গাপুরের দুর্গোৎসবে এবার মণ্ডপসজ্জায় উঠে এসেছে ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, ধর্মীয় স্থাপত্য ও সমাজচেতনার নানা অনুষঙ্গ। দর্শনার্থীদের ভিড় টানতে একে অপরের প্রতিযোগিতা চলছে।
এবার বিধাননগর ক্লাব স্যান্টোসের ৫৬তম বর্ষের পুজোর ভাবনা ‘নির্বাণ’। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের প্রেরণায় ব্রিটিশ শাসন ও জমিদারি প্রথার দাসত্ব থেকে মুক্তির বার্তা ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে মণ্ডপে। লোহার রড, ফাইবার, কাঠ, ধানের বস্তা, ৫০০টি চরকা, দু’হাজার বাজারের ব্যাগের পাশাপাশি লেপ-বালিশ, তোষক ও খাট ব্যবহার করে নির্মিত হচ্ছে মণ্ডপ। ভাবনাকে জীবন্ত করে তুলতে কলকাতা থেকে আসবেন মূকাভিনয় শিল্পীরা। মণ্ডপ উদ্বোধনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এলাকার সাফাইকর্মীদের। ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক সমব্রত চক্রবর্তী বলেন, মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা মেনে আমরা সরকারি অনুদান নেব না। পুজোর আয়োজনে যেসব ক্লাবের আর্থিক সাহায্য দরকার তাদেরই দেওয়া হোক।
ফুলঝোড় সর্বজনীনের ৩৫তম বর্ষের নিবেদন ‘সোনার বাংলা’। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্ন ও প্রধানমন্ত্রীর সোনার বাংলা গড়ার অঙ্গীকার সামনে রেখে সাজছে মণ্ডপ। মেদিনীপুরের শিল্পীরা ধান-গমের শিস, ভুট্টা, কোদাল, কাস্তে, লাঙল, মাটির হাঁড়ি, কলসি, খড় ও গাছের ছাল দিয়ে ফুটিয়ে তুলছেন বাংলার গ্রামীণ জীবন। কৃষি ও শিল্পের অগ্রগতি, বিশ্বশান্তি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তাও থাকবে এই মণ্ডপে। বাজেট প্রায় ৪৫লক্ষ টাকা। পুজো কমিটির সম্পাদক বুদ্ধদেব মণ্ডল বলেন, প্রতি বছর আমাদের মণ্ডপ ও পুজো দেখতে বহু মানুষ ভিড় জমান। এবার মুখ্যমন্ত্রী আমাদের পুজোর উদ্বোধন করবেন।
শংকরপুর সর্বজনীনের আকর্ষণ পৌরাণিক ‘দ্বারকানগরী’। সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত দ্বারকার কল্পিত রূপকে দর্শনার্থীদের সামনে মেলে ধরতে প্লাইউড, ফাইবার, থার্মোকল ও মনোগ্রাহী চিত্রকলায় নির্মিত হচ্ছে মণ্ডপ। উদ্যোক্তাদের তরফে সিদেন পাল বলেন, গত বেশ কয়েক বছর ধরে আমরা থিমের মণ্ডপ করছি। এবারও দর্শনার্থীদের ভাল লাগবে।
মার্কনি দক্ষিণপল্লিতে আবুধাবির বিখ্যাত স্বামীনারায়ণ মন্দিরের আদলে তৈরি হচ্ছে পুজোমণ্ডপ। মন্দিরের ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে পুজো কমিটির এক সদস্যকে আবুধাবিতে পাঠানো হয়েছিল। তাঁর অভিজ্ঞতাকে অবলম্বন করে স্থানীয় ডেকোরেটার্সের সহযোগিতায় চলছে প্যান্ডেলের নির্মাণকাজ চলছে। বাজেট প্রায় ৪০লক্ষ টাকা। ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক গোপাল চৌধুরী বলেন, স্বামীরারায়ণ মন্দিরের আদলে মণ্ডপ গড়া হচ্ছে। রাজ্যের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় আমাদের পুজোর উদ্বোধন করবেন। সি-জোন বুদ্ধবিহার সর্বজনীনের থিম ‘নয় ঈশ্বরী, নয় সামান্য নারী’। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সামাজিক বঞ্চনা, আত্মপরিচয় ও মর্যাদার লড়াই নিয়েই এই ভাবনা। রামায়ণের প্রচলিত আখ্যান অনুসারে, রামচন্দ্রের বনবাস থেকে প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের নিষ্ঠার কাহিনি তুলে ধরা হবে মণ্ডপে। প্রায় ৯ লক্ষ টাকার বাজেটের এই পুজোয় স্থানীয় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সংবর্ধনা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি মণ্ডপসজ্জায় খেজুরের ছাল, বেগুন গাছ সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করে পরিবেশ দূষণ রোধের বার্তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, মণ্ডপ উদ্বোধনের দিন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সংবর্ধনা দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে পুজো উদ্যোক্তাদের।
দ্বারকা দেখার ইচ্ছাকে মণ্ডপের মাধ্যমে বাস্তবে ফুটিয়ে তুলছে শংকরপুর সর্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটি।-নিজস্ব চিত্র



