সুব্রত ধর, ডাবগ্রাম (শিলিগুড়ি): ভোরের মহানন্দা নদী। ‘ধোঁয়া’ ওঠা বাষ্প। কুয়াশা ঘেরা পাহাড়। সূর্যের ঝলক। এহেন মাঝুয়ার ঘুম ভাঙে মোরগের ডাকে। এবার এখানেই দুর্গাপুজোর সূচনা করছেন তিস্তা নদীর থাবায় নিশ্চিহ্ন চমকডাঙি ও লালটং গ্রামের বাসিন্দারা। এক বছর আগে তাঁরা সর্বস্ব হারিয়ে মাঝুয়ায় আস্তানা গাড়েন। বদলে যায় পেশা। কোনোরকমে ঘুরে দাঁড়িয়ে তাঁরা দশভূজার আরাধনায় মেতেছেন। আনন্দময়ীর কাছে তাঁদের প্রার্থনা- পর্যটনের মানচিত্রে এই গ্রামকে জোড়া হোক। গ্রামের জেন-জি’দের কর্মসংস্থান দিশা হোক এই গ্রামই।
তিন বছর আগে সিকিমে ভয়াবহ ‘হ্রদ বিস্ফোরণে’ রুদ্র রূপ ধারণ করেছিল তিস্তা। তাতেই জলপাইগুড়ি জেলার ডাবগ্রাম-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের চমকডাঙি ও লালটং গ্রাম দু’টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই ঘটনার দুই বছরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দু’টি গ্রাম গ্রাস করে তিস্তা। নদী ভাঙনে উদ্বাস্তু গ্রামবাসীরা ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নেন।
বিগত তৃণমূল কংগ্রেস সরকার শিলিগুড়ি শহর সংলগ্ন মাঝুয়াবস্তির পাশে মহানন্দা নদীর পাড়ে উদ্বাস্তু গ্রামবাসীদের পুনর্বাসন দেয়। গ্রামবাসীরা পান জমির পাট্টা। রাজ্য সরকারের কাছ থেকে গৃহ নির্মাণের প্রথম কিস্তির টাকাও পেয়েছেন। বাঁশ, কাঠ, টিন, পাকা পিলার দিয়ে তৈরি হয়েছে সারি সারি প্ল্যাংকিনের ঘর। দু’টি বাঁধের মাঝে থাকা গ্রামটিতে ঢুকেছে বিদ্যুতের লাইন। রাস্তা তৈরি হচ্ছে। এবার পুজোয় মেতেছেন গ্রামবাসীরা। মণ্ডপ তৈরি করে প্রতিমা বসানো হয়েছে।
পুজো পরিচালনা করছে মাঝুয়া-চমকডাঙি-লালটং সর্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটি। এর সম্পাদক গৌতম ছেত্রী বলেন, চমকডাঙি, লালটংয়ের ১৩২টি পরিবারের ৪০০জন সদস্য উদ্বাস্তু হয়ে এখানে এসেছি। চাষাবাদ, মাছ ধরা, গোপালন প্রভৃতি পেশাও হারিয়ে গিয়েছে। এখন কেউ দিনমজুর, আবার কেউ অন্যের দোকানে, কেউ আবার বেসরকারি সংস্থায় কাজ করছেন। অনেক কষ্টে ঘুরে দাঁড়াচ্ছি।
পুজো কমিটির সভাপতি সঞ্জিত শৈব বলেন, একদা ঢেকি, সামগাইন, মই, হাল, লাঙল এগুলি আমাদের কর্মসংস্থানের হাতিয়ার ছিল। নতুন প্রজন্ম তা দেখেনি। তাই পুজোয় সেগুলি প্রদর্শীত হবে। সপ্তমীতে আমরা ট্রাডিশনাল নেপালি পোশাক পরে ফুলপাতি উৎসব করব। পদযাত্রাও হবে। পুজো কমিটির হিসাব রক্ষক বিষ্ণু টুডু বলেন, নেপালিদের পাশাপাশি অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষও এখানে রয়েছে। পুজোর ক’দিন সকলে মিলে এখানে খিচুড়ি, ঘন্ট, চাটনি, পায়েস, সেল রুটি ভোগ খাওয়া হবে।
পুজোর সূচনা করলেন কেন? গ্রামবাসীরা বলেন, বহু আগে পুজোর ক’দিন গ্রামেই থাকতাম। এখানে আসার পর থেকে জীবন গতিময় হয়ে উঠেছে। পাহাড়, নদী বেষ্টিত গ্রামের পরিবেশটাও মায়াবি। এখান থেকে ঢিলছোঁড়া দূরত্বে বেঙ্গল সাফারি, সেভক, তরিবাড়ি গ্রাম। তাই আমাদের এই গ্রামটিকেও পর্যটন মানচিত্রে তুলে ধরতে চাই। আগামীতে এখানে সাপ্তাহিক হাটও বসবে। এজন্যই পুজোর সূচনা করা হল। বর্তমানে গ্রামের নাম তিস্তাপল্লি। তা পরিবর্তন করে মাঝুয়া-চমকডাঙি-লালটং রাখতে চাই। • নিজস্ব চিত্র।



