জগৎ
  • ১২ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সেবক: এই একই জগৎকে যোগী ব্রহ্মময় দেখেন, বিবেকীর কাছে দুঃখময়, আবার ভোগীর চোখে জগৎ ভোগের বস্তু। এরকম তফাত কেন?

Advertisement

মহারাজ: দেখ, আমরা যা-কিছু দেখি, তাতে জিনিসটা দেখি না—process-টা দেখি। process-টাকেই জিনিস বলে ভাবি এবং তার জন্য কারোর চোখে যা সত্য, আরেক জনের কাছে তা মিথ্যা। হৃষীকেশে দেখেছি, এক মিস্ত্রি পাথর ভাঙছে। বিরাট লোহার হাতুড়ি দিয়ে মারছে। প্রথম পাঁচ বারে কিছুই হলো না, ষষ্ঠবারে ফাটল দেখা গেল। অর্থাৎ, আগে বাইরে কিছু বোঝা না গেলেও ক্রিয়া চলছিল, তারই ফল ষষ্ঠবারে। সপ্তমবারে সেটা ভাঙল। তেমনি সংসারে ঘা খেতে খেতে যখন আর ঘা সহ্য হবে না—ঘায়ের আঘাতে ভেঙে পড়ব, তখন ঈশ্বরের দিকে মন যাবে। তাই সংসারে কোনো জীবকেই ঘৃণা করা উচিত নয়। আজ যে ঈশ্বরকে বুঝতে পারছে না, তার জন্য সে হেয় নয়—হয়তো ধীরে ধীরে তার action চলছে। কখন ভেঙে যাবে।
এক গ্রামের ডাক্তার মাঝে মাঝে আশ্রমে আসেন। কখনো কখনো খেজুরের রস ও গুড় এবং ক্ষেতের পটোল প্রভৃতি পাঠান। একজন তাঁর নিন্দা করছিল। মহারাজ বললেন, “দেখ, তার এইটি শুভ ইচ্ছার stage, ধীরে ধীরে এরই মাধ্যমে ঈশ্বরের ওপর ভালোবাসা আসবে। আমরা লোকের দোষ দেখি, কিন্তু এটা ঠিক নয়। Statement of fact নিতে হবে। দোষ দেখার অর্থ এই নয় যে, লোকটাকে ছোট করে দেখা। অর্থ এই যে, আমাকে শিক্ষা নিতে হবে, নিজেকে সাবধান হতে হবে।”
এক বৃদ্ধ একবার মহারাজকে বলেন যে, যদি হরিনামে সব হয়, তো ইন্দ্রিয়সংগম করা কেন? মহারাজ এই কথাটা নিয়ে অনেকদিন হাসিঠাট্টা করেন। আজ সেই বৃদ্ধ এসেছেন। তাঁকে দেখামাত্র মহারাজ ডাকলেন, কাছে বসতে বললেন, তাঁর নানান খবর নিলেন।
সেবক: ঈশ্বর তো কোনো ব্যক্তি নন, তাঁর ইচ্ছাও নেই নিশ্চয়ই, তাহলে জীবের দুঃখ দেখে তাঁর কাতর হওয়া বা অবতীর্ণ হওয়া—এ কীরকম?
মহারাজ: ঈশ্বর বাস্তবিক অবতীর্ণ হন না, যেন মনে হয় অবতীর্ণ হলেন। যতক্ষণ ‘কাঁচা আমি’ যাবে না, ততক্ষণ নিজের ‘greater self’-কে অবতীর্ণ প্রভৃতি বুঝতেই হবে। এটা একটা Statement of fact। এই দেহের মধ্যে ঢুকলেই তো নিজের স্বরূপ ভুলে যাই, তখন মনে হয়—ঈশ্বর অবতীর্ণ হন। যতক্ষণ দেহবুদ্ধি থাকবে ততক্ষণ ঈশ্বরের অবতরণও সত্য।
সেবক: শ্রীরামকৃষ্ণ ঈশ্বর কেন?
মহারাজ: সব প্রাণীই তো ঈশ্বর, তবে শ্রীরামকৃষ্ণ ঈশ্বর বলে পূজিত এই জন্য যে, তিনি নিজেকে বেশি বুঝেছিলেন। যে যত বেশি নিজেকে জানতে পারবে, সে তত বেশি ঈশ্বরত্ব পাবে। শ্রীরামকৃষ্ণ সবটুকু বুঝেছিলেন।
সেবক: গোপালের মায়ের কি জ্ঞানযোগ ছিল?
মহারাজ: নিশ্চয়ই, গোপালের মায়ের এই জ্ঞান ছিল যে, দুনিয়ার সবই rejectable, একমাত্র গোপালই acceptable। এই যে অনুভব হওয়া, বোধে বোধ হওয়া—এরই নাম জ্ঞান। জ্ঞান মানে শুধু এই নয় যে, ‘গোপাল কী’ তা জানা। তবে আমরা তো আর গোপালের মায়ের মতো উচ্চাধিকারী নই, তাই আমাদের জানতে হবে ঈশ্বর কী; তবে তো তাঁর ওপর ভালবাসা হবে, তাঁর প্রীতির উদ্দেশ্যে কাজ করতে ইচ্ছা হবে, তাঁর সঙ্গে সর্বদা যোগ থাকবে। রামকৃষ্ণলোক আর কোথায়? যেখানে সর্বদা শ্রীরামকৃষ্ণের কথা হয়, সেই তো রামকৃষ্ণলোক।    
স্বামী সুহিতানন্দ সম্পাদিত ‘সারগাছির স্মৃতি’ থেকে